ঠিক তেমনি বড় বড় সব ধর্মের উম্মতেরাই নিজেদেরে আল্লাহর বডিগার্ড মনে করিয়া থাকে। বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম এই চারটি ধর্মই বিশ্বের বড় ধর্ম। এই সব ধর্মের শাস্ত্রেই লেখা আছে : ‘ধর্মে যবরদস্তি নাই; ‘তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার। অথচ এই উচ্চস্তরের নৈতিক শিক্ষা সত্ত্বেও ধর্মে-ধর্মে যুদ্ধ-বিগ্রহ চলিতেছে। কিন্তু এটাই এদেরে বড় দুর্বলতা নয়। এর চেয়েও বড় ত্রুটি এদের মধ্যে রহিয়াছে। সে ত্রুটি এই যে, বহু ধর্মের বিশ্বাসীরা মনে করে এদের অন্তর্ভুক্ত যারা নয়, তারা সবাই অর্ধামিক, কেবলমাত্র এরাই আল্লার রক্ষক। ভাবটা এই যে, এই সব ধর্ম না থাকিলে আল্লায় বিশ্বাসী আর কেউ থাকিবে না। বিশ্বাসী না থাকিলে কাজেই আল্লাও থাকিবে না।
.
১৩. ধর্ম বনাম আল্লাহ
কিন্তু এটা সত্য নয়। ধর্ম-বিশ্বাসের সঙ্গে আল্লা-বিশ্বাসের কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নাই। কোনও ধর্মে বিশ্বাস করিতে গেলে একজন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করিতে হয় সত্য, কিন্তু একজন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করিতে গেলেই একটি ধর্মে বিশ্বাস করিতেই হইবে, তার কোনও মানে নাই। ধর্ম ও আল্লার মধ্যে ফান্ডামেন্টাল পার্থক্য এই যে ধর্ম পরিবর্তনশীল, আল্লাহ শাশ্বত, তার কোনও পরিবর্তন নাই। সেজন্য ধর্ম অনেকগুলি, আল্লাহ এক। ধর্মকে রক্ষা করিতে হয় মানুষের, আল্লাহ নিজেকে নিজেই রক্ষা করেন। মানুষ ধ্বংস হইলে ধর্মের অবসান হইবে। কিন্তু আল্লাহ থাকিবেন। ধর্ম মনের জিনিস, আল্লাহ অন্তরের জিনিস। ধর্ম বুঝিতে হয় বুদ্ধি দিয়া, আল্লাহ অনুভব করিতে হয় অন্তর দিয়া। ধার্মিকরা যে মনে করেন, আল্লাহকে মানুষের মনে তাঁরাই জিয়াইয়া রাখিয়াছেন, এটা তাদের দেমাগ-তুকাব্বরি। এটা তাদের অহংকার। এ অহংকার নাস্তিকের অহংকারের চেয়ে কোনও অংশে কম দাম্ভিক নয়। আল্লার অস্তিত্ব এমনি একটা বস্তু যা সাধারণ মানুষ সব সময় দেখে না; শুধু বিশেষ অবস্থায় দেখিতে পায়। একটা মামুলি দৃষ্টান্ত দেই। সাহসী মানুষ ভয় কাকে বলে জানে না। কিন্তু ভয় বলিয়া কোনও বস্তু নাই, এ কথা সেও বলিতে পারে না। অবস্থা-বিশেষে খুব সাহসী মানুষও ভয় পায়। সাধারণ মানুষও শুধু অবস্থা-বিশেষেই আল্লাহকে দেখিয়া থাকে। আল্লাহ অরূপ, নিরঞ্জন, নিরাকার। কাজেই এই রূপহীন আল্লাকে মানুষ যার-তার অন্তরের ব্যাপ্তি দিয়াই অনুভব করিবে। যার-তার অন্তরের ব্যাপ্তির পরিধির সাথে মিল রাখিয়াই সেই অরূপ রতন রূপবিশেষে ধরা দিবেন। সে রূপ আসলে আল্লার রূপ নয়, দর্শকের সসীম অন্তদৃষ্টির ‘গোস্পদে বিম্বিত যথা অনন্ত আকাশ। আল্লাহ দার্শনিক জালালুদ্দিন রুমীর বিশাল অন্তরেও ধরা দিতে পারেন, তাঁর কল্পিত নাপিতের ছোট্ট অন্তরেও ধরা দিতে পারেন। এটাই আল্লার কুদরত, তার অপূর্ব মহিমা। এই মহিমার জোরেই তিনি সকল মানুষের মনে জাগ্রত আছেন। কোনো ধর্মের অনুগ্রহে বা প্রচার-বলে নয়।
কিন্তু সকল অবস্থায় মনে রাখিতে হইবে, ধর্মের সবচেয়ে বড় গুণ হইতে হইবে পরমতসহিষ্ণুতা। হইতে হইবে মানে ধর্ম-বিশ্বাসীদের আচার-ব্যবহারে প্রযুক্ত ও প্রকট হইতে হইবে। আমাদের কোরআন শরিফের দুইটি সুস্পষ্ট উক্তি: ‘ধর্মে কোনও যবরদস্তি নাই’ ও ‘তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার এই বাঞ্ছিত পরমতসহিষ্ণুতার অমর বুনিয়াদ। উক্তিদ্বয়ের যে মর্মার্থই যিনি করুন না কেন, তার মধ্যেও এই পরমতসহিষ্ণুতার নীতিই বলবৎ থাকিবে। ধর্মের ব্যাপারে যে কথাটা শাশ্বত সত্য এবং যে সত্যটা অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হইয়াছে, তা এই যে পরমতসহিষ্ণুতাই ধর্মের শক্তি, অসহিষ্ণুতাই তার দুর্বলতা।
কাজেই আমার মন বলিল, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অথবা তার ত্রুটি সংশোধনের জন্য সময় ও শ্রম নষ্ট না করিয়া মুসলমানদেরে কেমন করিয়া সাধু, সৎ ও সুন্দর মানুষরূপে গড়িয়া তোলা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়াই সৎ মুসলমানের প্রধান কর্তব্য।
.
১৪. মানব বনাম মুসলমান
আমার এই মতবাদ কি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক নয়? শুধু মুসলমানদের কল্যাণ চিন্তা করার কারণ কী? অমুসলমানদের প্রতি কি আমার কোনও কর্তব্য নাই? কথাটা যে-কেউ বলিতে পারিতেন–কোনও অমুসলমান বন্ধু ত নিশ্চয়ই। কিন্তু এটা বলিলেন আমার বিশেষ অন্তরঙ্গ এক মুসলমান বন্ধুই। তিনি আমাকে কোনও জবাব দিবার সুযোগ না দিয়াই বলিয়া গেলেন : দেখ, তুমি একজন সাহিত্যিক, তুমি চিন্তাবিদ, আজীবন কৃষক-প্রজা আন্দোলন করিয়াছ। মযলুমের পক্ষে যালিমের বিরুদ্ধে জিভ ও কলম চালাইয়াছ। এই দেখিয়া আমার ধারণা হইয়াছিল, ধর্ম-সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সকল মানুষেরই তুমি খাদেম, মানবতাই তোমার ধর্ম। কিন্তু আজ একটি কথা তোমার মুখে শুনিয়াতেছি?
কিন্তু আমার বন্ধু একা ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন তিনজন। তিনজনের দুইজনই ধর্মবিরোধী। মানবপ্রেমী। ধর্মবিরোধী কথাটা ঠিক নয়। দুইজনই মানব-ধর্মী। তাদের কাছে হিউম্যানিযমই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। একজন বিপ্লবী মুসলমান।
অসুবিধা এই যে আমি বন্ধুদের নাম উল্লেখ করিতে পারিতেছি না। তাঁরা যে পজিশন ও পরিবেশে আছেন, তাতে বোধ হয় এই ধরনের কথা সহকর্মীদের বলিতে পারেন না; বলিলে বোধ হয় তাঁদের অনিষ্ট হইতে পারে। তাই বোধ হয় তাঁদের রুদ্ধগতি স্বাধীন চিন্তার স্রোত বাঁধ ভাঙ্গিয়া আমাকে ভাসাইয়া নিবার উপক্রম করিয়াছে।
