আমি বলিলাম: দেন।
হাশিম সাহেব প্রতি কথায় জোর দিয়া বলিলেন : আমি যে শুধু মুসলমানদের ভালবাসি না তা নয়, আমি তাঁদেরে ঘৃণা করি।
আমি হাশিম সাহেবের উষ্ণতায় হাসিয়া বলিলাম : তা হইলে দাঁড়াইতেছে। এই যে, আপনি ঔষধটাকেই ভালবাসেন, রোগীকে আপনি ঘৃণা করেন।
হাশিম সাহেব অসাধারণ প্রত্যুৎপন্নমতির লোক। তিনি আমার উপমা গ্রহণ করিয়া বলিলেন : যে রোগী ইসলামের মত এমন মূল্যবান ঔষধ নষ্ট করিয়াছে, তাকে ঘৃণা করিব না ত কী করিব?
আমি নিশ্চিত জয়ের আশায় বলিলাম : ঔষধ-মূল্যবান কি না, তার, পরিচয় রোগ নিরাময়ে।
কিছুমাত্র না দমিয়া হাশিম সাহেব বলিলেন : যে উন্মাদ রোগী ঔষধে ভেজাল দিয়া খায়, তার রোগ না সারিলে কি ঔষধের দোষ?
হাশিম সাহেবকে তর্কে হারান খুব শক্ত কাজ। কাজেই সেদিন আমিই হারিলাম।
.
১০. ধর্ম ও ঔষধ
কিন্তু হাশিম সাহেবের কথা ঠিক নয়। তাঁর ঐ কথা লা-জবাব নয়। কারণ রোগী যে ঔষধে ভেজাল মিশাইয়া ডাক্তারকে ফাঁকি দেয়, এটাও তার একটা রোগ। এ রোগও সারাইতে হইবে ঔষধ দিয়াই। রোগীর দোষ দিয়া ঔষধের তারিফ করিতে পারে কেবলমাত্র ঔষধ-ব্যবসায়ী। ঠিক তেমনি যে ধর্ম যত বেশি মানুষের যত বেশি কল্যাণ করিতে পারিল, আমার বিবেচনায় এবং নিরপেক্ষ সকলের বিবেচনায়, সেই ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। কিন্তু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব-নিকৃষ্টত্ব বিচার আমার কাজ নয়। আমার একমাত্র চিন্তা আমার রোগী। আমার একমাত্র কামনা তার রোগ সারা। যে ঔষধ খাওয়াইলে আমার রোগী ভাল হয়, সেই ঔষধই খাওয়াইব। যদি ওভার মেডিক্যাটেড হইয়া যাওয়ার দরুন রোগ জটিল হইয়া থাকে, তবে ঔষধ খাওয়ান বন্ধ করিব। ঔষধের জন্য রোগী নয়, রোগীর জন্যই ঔষধ। ঠিক তেমনি, এ কথাও সর্বজনস্বীকৃত। যে ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই ধর্ম। যে ঔষধ রোগীর কাজে লাগিল না, তা যেমন বর্জনীয়; তেমনি, যে ধর্ম মানুষের কল্যাণ করিল না, তা বর্জনীয়।
.
১১. শাঁস ও খোসা
কিন্তু ঔষধের সঙ্গে ধর্মের তুলনা মাত্র একদিক হইতে সত্য। উপাদান ও অনুপান লইয়াই ঔষধ। ঐসব উপাদানের সবগুলিই ফান্ডামেন্টাল। তার কোনও একটা বাদ দিলে ঔষধ আর ঔষধ থাকিবে না। তেমনি বিশ্বাস ও ক্রিয়া-কর্ম লইয়াই ধর্ম। কিন্তু সে বিশ্বাস ও ক্রিয়া-কর্মের সবগুলি ফান্ডামেন্টাল নয়। একমাত্র সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসই ধর্মের ফান্ডামেন্টাল। বিশ্বাসের অবশিষ্ট অংশ এবং সমস্ত ক্রিয়া-কর্মই ধর্মের অনুষঙ্গ মাত্র। এগুলিকে ঔষধের অনুপানের সঙ্গে তুলনা করা যাইতে পারে। রোগী-ভেদে ও রোগীর দেশ-ভেদে এইসব অনুপান ইতর-বিশেষ করা যাইতে পারে এবং করা উচিতও। ঠিক তেমনি মানুষের দেশ ও অবস্থাভেদে ধর্মের এইসব নন ফান্ডামেন্টাল অনুপানগুলির ইতর-বিশেষ করা যাইতে পারে এবং করা উচিতও। এই দিক হইতে বিচার করিলে খোরাক, পোশাক, নাম-নিশানা, উপাসনা-প্রণালি, পার্সনাল ‘ল’, এ সমস্ত ধর্মের নন-ফান্ডামেন্টাল। ধর্মের মূল ঈমানের সাথে-সাথে এসব নন-ফান্ডামেন্টালকেও যদি সকল দেশের সকল যুগের সকল বিশ্বাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে সেটা হইবে অবাস্তব ও ইমপ্র্যাকটিক্যাল। তাতে অনাবশ্যকরূপে ঐ ধর্ম হইতে মানুষকে এবং মানুষ হইতে ধর্মকে দূরে রাখা হইবে; অনাবশ্যককে অত্যাবশ্যক ঘোষণা করিয়া ঐ ধর্মকেই লোক-চক্ষে হেয় করা হইবে। একটা ছোট দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। যদি বলা হয়, খোরমা না খাইলে বা দাড়ি না রাখিলে কেউ মুসলমান হইতে পারিবে না; অথবা যদি কেউ বলে, গলায় টাই না বাধিলে বা ক্রস না ঝুলাইলে কেউ খৃষ্টান হইতে পারিবে না; কিম্বা যদি বলা হয় টিকি না রাখিলে বা গলায় রুদ্রাক্ষের মালা না পরিলে কেউ হিন্দু হইবে না, তবে তাতে যথাক্রমে ইসলাম, খৃষ্টধর্ম ও হিন্দুধর্ম হইতে ঐ ঐ ধর্ম-বিশ্বাসীদেরে অনাবশ্যকরূপে দূরে ঠেলিয়া রাখা হইবে। এইসব পোশাক-পাতি ও আচার ব্যবহারের মতই উপাসনা-প্রণালিও ধর্মের নন-ফান্ডামেন্টাল। গির্জা, মন্দির মসজিদকে সৃষ্টিকর্তার একমাত্র উপসনাস্থল মনে করাও তেমনি অনাবশ্যককে অত্যাবশ্যক গণ্য করা। এ সব যারা করেন, তাঁরা নিজের ধর্মের মান-মর্যাদা না বাড়াইয়া হীন করিয়াই থাকেন।
আমার মনে হয়, মুসলমানদের ধর্মীয় নেতারাই এই ধরনের ভুল করিয়াছেন সবচেয়ে বেশি। এঁরা নামাজ-রোযা, অযু-গোসল ও তসবিহ তেলাওয়াতকে ধর্মের ফান্ডামেন্টাল খাড়া করিয়া ঐ সব দিয়া মুসলমানদেরে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিতে চেষ্টা করিয়াছেন। এটা করিতে গিয়া তারা নিজেদের যুক্তির ফাঁদে নিজেরাই ধরা পড়িয়াছেন। যার ফলে নামাজে বুকের উপর ও নাভির নিচে তহরিমা বাঁধা লইয়া, যানাযার নামাজে মাইয়াতের বুক বরাবর বা শির বরাবর দাঁড়ান লইয়া, বার-তকবির ছয়-তকবির লইয়া, জোরে বা আস্তে আমিন বলা লইয়া মুসলমানে-মুসলমানে খুনাখুনি ঘটাইয়াছেন। এর প্রতিকার একমাত্র টলারেন্স। কিন্তু টলারেন্সকে এরা ভয় পান এই জন্য যে, তাতে ধর্ম থাকে বটে, কিন্তু ধর্মীয় দল থাকে না।
.
১২. ধর্ম বনাম ধর্মীয় দল
অতএব দেখা যাইতেছে, মুসলমানদের মধ্যে যে ধর্মীয় কড়াকড়ি সেটা ইসলামের খাতিরে নয়, মযহাব বা ধর্মীয় দলের খাতিরে। আমার চাচাজীর মত সব খাঁটি মুসলমানরাই মনে করেন, তাঁর নিজের মযহাব না টিকিলে ইসলাম টিকিবে না। ফলে সব মযহাবের মুসলমানরাই অন্য মযহাবের মুসলমানদের মোকাবিলায় নিজেদেরই ইসলামের একমাত্র রক্ষক মনে করিয়া থাকে।
