পর্দা সম্বন্ধে যা, ভিক্ষা সম্বন্ধেও তাই। দান-খয়রাত-চ্যারিটি-দক্ষিণা সব দেশে সব জাতির মধ্যেই আছে। কিন্তু মুসলমান সমাজে ঐ সব প্রথা ভিক্ষাবৃত্তি যে কুৎসিত কার্যের আত্মঘাতী রূপ ধারণ করিয়াছে, এমনটি দুনিয়ার আর কোথাও দেখা যাইবে না। এক পয়সা দান করিলে পরকালে সত্তর পয়সা পাওয়া যায়, ‘সায়েলকে কদাচ না বলিও না’, ‘ভিক্ষুক ভিক্ষা চাওয়ামাত্র তোমার ধন-সম্পদ ক্রোক হইয়া গেল, তাকে কিছু দিয়া সন্তুষ্ট না করা পর্যন্ত ঐ ক্রোক ছুটিবে না : দিনরাত এই ধরনের ওয়াস-নসিহতই মুসলমান সমাজের এই দুর্গতি ঘটাইয়াছে। গোড়াতে মোল্লারা নিজেদের অর্জিত জীবিকা নিশ্চিত করিবার জন্যই ভিক্ষাদানের উপকারিতার এই চমৎকার ও মনোহারিণী রূপ বর্ণনা করিয়াছিলেন। তখন তাঁদের আশা ছিল, তারা একাই এর ফল ভোগ করিবেন। কিন্তু পরিণামে তাঁদের এত শরিক জুটিয়া গিয়াছে যে বিপুল ভিড়ে তারা দাঁড়াইতে পারিতেছেন না। ফলে মুসলমান জাতির জন-বলের এক বিরাট অংশ নিষ্কর্মা, গলগ্রহ হইয়া গিয়াছে। এর জন্যও দায়ী মোল্লাদের বিকৃত ইসলাম।
এ অবস্থায় সকল বুদ্ধিমান মুসলমানই ইসলামকে এই সব আবর্জনা মুক্ত করিবার চেষ্টা করিবেন ইহাই স্বাভাবিক। এই শ্রেণীর লোককে ধর্ম সংস্কারক বলা হইয়া থাকে। খৃষ্টানদের মধ্যে মার্টিন লুথার, হিন্দুদের মধ্যে রামমোহন রায় ও স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, মুসলমানদের মধ্যে স্যার সৈয়দ আহমদ, মওলানা সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, সৈয়দ আমির আলী ও মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। উহাদের মোকাবিলা আমি ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র নগণ্য ব্যক্তি। সে কারণেই হউক, অথবা মত-বিভিন্নতার দরুনই হউক, আমার চিন্তা ওদিকে গেল না। আমার মন ও চিন্তা ঘুরিয়া ফিরিয়া ইসলামের চেয়ে মুসলমানদের দিকেই বেশি ঝুঁকিয়া পড়িল। এর অর্থ শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়াইল যে আমি মুসলমানদের পরকালের ভাবনার চেয়ে ইহকালের ভাবনাই বেশি ভাবিতে লাগিলাম।
.
৮. মুসলিম-হিত বনাম হিন্দু-অহিত
মুসলমানদের এই হিত-চিন্তা কার্যত আমাকে অমুসলমানদের অহিতকামী করিয়া তুলিতেছে কিনা, তার পরীক্ষা অল্পদিনের মধ্যেই শুরু হইল। রাজনীতিতে আমি কংগ্রেসি ছিলাম। কংগ্রেসি হিন্দু বন্ধুদের কাছে আমার জাতীয়তাবাদ স্বভাবতই সন্দেহের ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইল। আমার রাজনীতিক মতামত ও তার ক্রমবিবর্তনের কথা আমি অন্যত্র বলিয়াছি। এখানে শুধু এইটুকু বলিয়া রাখিতেছি যে মুসলমান সমাজের এই চরম অধঃপতিত অবস্থা আমাকে এ ব্যাপারে অতিশয় স্পর্শকাতর করিয়া ফেলিয়াছিল। ফলে প্রায়ই আমি বলিতাম : মুসলমানের এটা হইল, মুসলমানের ওটা হইল না ইত্যাদি। এতে হিন্দু বন্ধুরা খুব সংগতভাবেই মনে করিতে পারিত এবং করিত যে আমি সমস্ত রাজনৈতিক ব্যাপারও শুধু মুসলমানদের ভাল-মন্দের মাপকাঠি দিয়া বিচার করিয়া থাকি। কাজেই আমি আসলে সাম্প্রদায়িকতাবাদী, জাতীয়তাবাদী আমি নই। আমি হিন্দু বন্ধুদের এই সন্দেহের প্রতিবাদ করিতাম এবং আন্তরিকতার সাথেই করিতাম। হিন্দুর অহিত কামনা না করিয়াও মুসলমানের হিত কামনা করা যায়, সুতরাং নিজের সম্প্রদায়কে ভালবাসিয়াও জাতীয়তাবাদী হওয়া যায়, ইহাই ছিল আমার রাজনৈতিক মতবাদ। এ মতবাদ আমি জনাব মুজিবর রহমান সাহেবের নিকট শিখিয়াছিলাম। মৌলবী মুজিবর রহমান ও তার রাজনৈতিক মতবাদ সম্পর্কে আমি অন্য অধ্যায়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করিব। এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, আমার মুসলিম-প্রীতির সঙ্গে ইসলাম-প্রীতির কোনও সম্পর্ক ছিল না। বস্তুত ইসলামের প্রতি আমার কোনও প্রীতিই ছিল না। কাজেই আমি হিন্দু ধর্মের প্রতি কোনও বিরূপ। ভাবও পোষণ করিতাম না। মানুষের দৈহিক ও মানসিক পরম কল্যাণই ধর্মের মূল উদ্দেশ্য। এই হিসাবে আমি ধর্মকে ঔষধের সাথে তুলনা করিতাম। মোটামুটি এখন পর্যন্ত আমার মত তাই। মাত্র চার-পাঁচ বছর আগেকার একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করিব।
.
৯. ইসলাম বনাম মুসলমান
ইসলাম ও মুসলমান সম্বন্ধে গভীর ও গুরুতর চিন্তা যারা করিয়া থাকেন। বন্ধুবর আবুল হাশিম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর ক্ষুরধার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, বলিষ্ঠ চিন্তা ও জোরাল প্রকাশ-ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে। তাঁর চিন্তায় ও আমার চিন্তায় আশ্চর্য রকম মিল রহিয়াছে। এই কথার উল্লেখ করিয়া একদিন। আমি হাশিম সাহেবকে তর্কে-তর্কে বলিয়াছিলাম : আপনার সাথে চিন্তায় আমার পনের আনা মিল থাকা সত্ত্বেও ঐ এক আনার কোথাও এমন একটা বুনিয়াদি বিরোধ আছে, যার ফলে আপনি ও আমি এক সাথে চলিতে পারি না। সেটা কি বলিতে পারেন?
হাশিম সাহেব সরলভাবে বলিলেন : প্রশ্নটা আমারও মনে জাগিয়াছে। কিন্তু কোনও উত্তর পাই নাই।
আমি বলিলাম : আমার মনে একটা উত্তর জাগিয়াছে।
কৌতূহলের সুরে হাশিম সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন : কী বলুন ত।
আমি বলিলাম : আপনি ইসলামকে ভালবাসেন আমি মুলমানকে ভালবাসি।
হাশিম সাহেব প্রথমে একটু হতভম্ব হইয়া গেলেন। খানিকক্ষণ পরে বলিলেন : আপনি আমাকে চিন্তায় ফেলিয়াছেন। আজ এ কথার উত্তর দিতে পারিলাম না। পরে দিব, কিছুদিন পরে হাশিম সাহেব আমাকে বলেন : আপনার ঐ কথার জবাব দিবার জন্য আপনাকে কিছুদিন যাবৎ তালাশ করিতেছি। এইবার জবাবটা নিন।
