আমিও চেয়ারম্যান সাহেবের দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া দেখিলাম, খানিক দূর দিয়া মধুবাবু যাইতেছেন। বলিলাম : মধুবাবুই বটে।
চেয়ারম্যান : আপনার সাথে ত মধুবাবুর খুব খাতির, একটু ডাকুন না। তার সাথে আমার কথা আছে।
আমি অমনি জোরে চিল্লাইয়া উঠিলাম : সূদনবাবু ও সূদনবাবু।
মধুবাবু একবার ঘাড় ফিরাইয়া এদিক-ওদিক তাকি-তুকি করিয়া আবার পথ চলিতে লাগিলেন। দেখিলাম, চেয়ারম্যান সাহেব আমার ভুল সংশোধনের জন্য কী বলিতে যাইতেছেন। আমি তাকে কোনও কথা বলিতে না দিয়া গলার সুর আরো উঁচা করিয়া চিৎকার করিলাম : ও সূদনবাবু ও চারু মিহির, চেয়ারম্যান সাহেব আপনার সাথে একটা কথা কইতে চান।
এবার মধুবাবু আমাদের দিকে ফিরিয়া চাহিলেন। আমার পাশে চেয়ারম্যান সাহেবকে দাঁড়ান দেখিয়া আমাদের দিকে রওয়ানা হইলেন। তিনি ঘন-ঘন পা ফেলিয়া আমাদের নিকটবর্তী হইয়াই আমার দিকে চোখ পাকাইয়া বলিলেন : মানুষের নাম নিয়া মশকরা করেন কেন?
আমি বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলিয়া বলিলাম : কী কইতেছেন? আপনি মুরুব্বি মানুষ। আপনার নাম নিয়া মশকরা করব আমি?
মধুবাবু জেংরা মারিয়া বলিলেন :বাকি রাখলেন আর কী? আমারে সূদনবাবু বইলা ডাকলেন কেন? আপনি ত জানেন আমার নাম শ্রী মধুসূদন সরকার।
আমি হাসিয়া বলিলাম : আপনার নামের মধ্যে সূদন’ ত আছে। তবে ভুলটা কী করলাম? যাহা মধু তাহা সূদন। নাম সম্বন্ধে আপনি অত ফ্যাসটিডিয়াস কেন? এ ত দেখতেছি ‘তৈলাধার পাত্র ও পাত্ৰাধার তৈল’ অথবা টুইডলডাম’ ‘টুইডলডি’র ব্যাপার।
এতক্ষণে মধুবাবুর চৈতন্য হইল। তিনি আমার কাঁধে একটা থাপ্পড় মারিয়া বলিলেন : আপনে বড় বজ্জাত।
আমি তখন চেয়ারম্যান ও অন্যান্য মেম্বারদের ব্যাপারটা বলিলাম। সকলে অনেকক্ষণ ধরিয়া হাসিয়া মধুবাবুকে একদম তুলাধুনা করিলেন।
আমি এইরূপে একদিকে মুসলমানদের চাল-চলন, কৃষ্টি-তমদুন ও পোশাক-পাতি লইয়া অমুসলমানদের, বিশেষত, প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে অহরহ ঝগড়া করিয়া বেড়াইতাম। অপরদিকে মুসলমান সমাজের, বিশেষত, বাংলার মুসলমান সমাজের দুঃখ-দুর্দশা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অনাচার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দিন-রাত খিচ্-খি করিতাম।
মুসলমানদের এই সার্বিক অধঃপতনের জন্য আমি তাদের অহেতুক ধর্মীয় গোঁড়ামি, শরা-শরিয়তের নামে তাদের বাড়াবাড়ি ইত্যাদিকেই দায়ী করিতাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মঘাতী মনে হইত মুসলমানদের পর্দা প্রথা ও ভিক্ষা-প্রথা।
.
৬. মুসলমানদের পর্দা-প্রথা
পর্দা-প্রথার কথাটাই আগে বলিতেছি। এই পর্দা-প্রথা মুসলমান সমাজকে পঙ্গু অথর্ব, অসভ্য ও কৃষ্টিহীন করিয়া রাখিয়াছে। নারী জাতির পর্দার কড়াকড়ির সমর্থনে দিন-রাত শত হাদিস-কোরআন আওড়ান হইতেছে। যেন একমাত্র পর্দা-প্রথার উপরই ইসলামের অস্তিত্ব নির্ভর করিতেছে। অথচ কার্যত এই পর্দা-প্রথা শিক্ষিত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চাষি-শ্রমিক, কুলি-মজুর ও ভিক্ষুক যারা মুসলমান সমাজের বিপুল মেজরিটি, তাদের মধ্যে। পর্দা-প্রথা নাই। এ সম্বন্ধে আলেম সম্প্রদায়ের মনোভাব অদ্ভুত। একজন মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বা অফিসারের চৌদ্দ বছরের মেয়েকে পায় হাঁটিয়া বা রিকশায় চড়িয়া খোলামুখে স্কুলে যাইতে দেখিলে এঁরা ইসলাম গেল’ ইসলাম গেল’ বলিয়া আসমান-জমিন কাঁপাইয়া তুলিবেন। কিন্তু জুম্মাবারে বা ঈদের দিনে রাস্তা-ঘাটে হাজার হাজার আধ-ল্যাংটা ভিখারিনী মেয়েকে হৈ-হল্লা করিতে দেখিয়াও ইসলামের বিপদ সম্পর্কে এঁরা টু-শব্দটি করেন না। এঁদের ভাব গতিকের সহজ অর্থ এই যে মুসলমান মেয়েরা লাখে-লাখে রাস্তার বাহির হইয়া ভিক্ষা করিলেও ইসলাম নষ্ট হইবে না; কিন্তু দু-দশ জন মেয়ে স্কুলে-কলেজে গেলেই ইসলাম ধ্বংস হইবে। ফল হইয়াছে এই যে ইসলামি পর্দা উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীর মধ্য সীমাবদ্ধ হইয়াছে। তা-ও আবার কিশোরী ও যুবতীদের মধ্যে। কেবলমাত্র এই শ্রেণীরই ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখাইবার সংগতি আছে কৈশোর ও যৌবনই মধ্য ও উচ্চশিক্ষার সময়। কাজেই অবস্থাপন্ন মুসলমানরাও তাদের মেয়েদেরে লেখাপড়া শিখাইতে পারিতেছেন না। শিক্ষা ও অশিক্ষা দুইটাই জ্যামিতিক প্রগ্রেশনে বাড়িয়া যায়। মার শিক্ষাহীনতা এই নিয়মকে আরো জোরদার করিয়া থাকে। এই কারণে প্রতিবেশী সমাজের মোকাবিলা বাংলার মুসলমান সমাজ শিক্ষার দিকে, সুতরাং জীবনের সকল ক্ষেত্রে, জ্যামিতিক প্রগ্রেশনে তলাইয়া যাইতেছে। অথচ এত বড় সর্বনাশের হেতু যে পর্দা-প্রথা, সে পর্দার পর্দা তুলিয়া দেখা হইতেছে না ওটা কী বস্তু। পর্দা জারি করা হইতেছে যে হাদিসের নামে তাতে বয়স ও শ্ৰেণী-নির্বিশেষে সব নারীর কথাই লেখা হইতেছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাইতেছে, ওটা শুধু ধনী যুবতীর জন্য। পর্দার জন্য বাড়ির চারিদিকে উঁচা প্রাচীর তোলা হইতেছে হাজার টাকা খরচ করিয়া। কিন্তু পাঁচ সিকার কাপড় দিয়া এই পর্দানশীনকে একটি কোর্তা পরান হইতেছে না। এইরূপ যুক্তিহীন স্ববিরোধী পৰ্দাই মুসলমান সমাজের অর্ধেক মানুষকে পঙ্গু, অসহায় ও পুরুষের কাঁধের বোঝ করিয়া রাখিয়াছে। এর জন্য দায়ী মোল্লাদের বিকৃত ইসলাম।
.
৭. ভিক্ষা-বৃত্তি
