মুহূর্তে সকলের হাসি বন্ধ হইয়া গেল। আর বেশ্যা বলিয়া কথিত মেয়েটির চোখ দুইটা ছলছল করিয়া উঠিল। পলকে আমাদের দিক হইতে চোখ ফিরাইয়া সঙ্গিনীদের সাথে চলিয়া গেল।
শুধু মুসলমানদের পোশাক-পাতি নয়, তাদের নাম লইয়াও যদি কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিদ্রূপ করিত তবে আমি চটিয়া যাইতাম। নামে অশুদ্ধ উচ্চারণ বা বিকৃতিকরণকে আমি এইরূপ বিদ্রূপ মনে করিতাম। হিন্দু বন্ধুদের সাথে এই লইয়া আমার অসংখ্য ঝগড়াঝাটি হইয়াছে। এসব ক্ষেত্রেই আমি হিন্দু বন্ধুদিগকে টিট-ফর-ট্যাট বা ঢিলের বদলে পাটকেল মারিয়া প্রতিশোধ নিতাম। এখানে দুইটা মাত্র ঘটনার উল্লেখ করিব :
.
৫. ফ্যাসটিডিয়াস
ময়মনসিংহের কংগ্রেস-নেতা বাবু সূর্য কুমার সোম উদার অসাম্প্রদায়িক নেতা ছিলেন। তাকে আমি পিতার ন্যায় ভক্তি করিতাম। তিনিও আমাকে আপন ছেলের মতই স্নেহ করিতেন। কিন্তু তিনি মওলানা শওকত আলীকে মৌলানা ‘সৈকত আলী (ইংরাজি এস দিয়া) এবং আমাকে মশুর (ইংরাজি এস-এইচ দিয়া) উচ্চারণ করিতেন। এই নিয়া তার সঙ্গে প্রায়ই আমার কথা-কাটাকাটি হইত। তিনি নিজের নাম সূর্য কুমার (এস-এইচ দিয়া) ঠিকই উচ্চারণ করিতেন। কিন্তু শওকতের উচ্চারণে তিনি শুধু এস দিয়া সৈ’ উচ্চারণ করিতেন। অর্থাৎ মনসুরে’ ‘স’-এর স্থলে শ’ এবং শওকতে’ ‘শ’-এর স্থলে ‘স’ উচ্চারণ করিতেন। আমার পুনঃপুন প্রতিবাদে তিনি উত্ত্যক্ত হইয়া আমাকে ধমক দিলেন। বলিলেন : নামের উচ্চারণ লইয়া আমার অমন ফ্যাসটিডিয়াস হওয়া উচিৎ নয়। আমি এটাকেও সূর্যবাবুর সাম্প্রদায়িক মুসলিম-অবজ্ঞা মনে করিয়া দুঃখিত হইলাম। কিন্তু বেআদবি না করিয়া টিট ফর-ট্যাট মারিবার সন্ধানে থাকিলাম।
সেকালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির বৈঠক শুধু কলিকাতায় না হইয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বিভিন্ন জিলায় হইত। সেবারে ঐ বৈঠক ছিল ময়মনসিংহে। সেক্রেটারি সুভাষচন্দ্র বসু, সূর্যবাবুর মেহমান। তিনি বন্ধুবান্ধব লইয়া গল্প-গুযারি করিতেছেন। আমিও সেই বৈঠকে আছি। আলাপে আলাপে সুভাষবাবু আমার দিকে চাহিয়া হঠাৎ বলিলেন : সূর্যবাবু গেলেন। কোথায় মনসুর সাব? তাকে দেখি না কেন?
আমি আসন হইতে উঠিয়া বাড়ির ভিতরদিককার বারান্দায় দাঁড়াইয়া চিৎকার করিলাম : ‘সূর্যবাবু, ও সূর্যবাবু, সুভাষবাবু আপনারে ডাকতেছেন।’ ‘সূর্য’ ও ‘সুভাষ’ দুইটি শব্দই আমি এমন স্পষ্টভাবে ‘এস’ উচ্চারণ করিলাম, যাতে দুইটা শব্দই প্রায় ‘ছুর্য’ ও ‘ছুভাছ’ শোনা গেল।
ঘরের মধ্যে দৃষ্টিপাত করিয়া বুঝিলাম, আমার ঔষধে ক্রিয়া করিয়াছে। সুভাষবাবু ও তাঁর সঙ্গীরা বিস্ময় বা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকাইয়াছেন। বারান্দার দিকে দৃষ্টি ফিরাইয়া দেখিলাম, সূর্যবাবু প্রায় আমার কাছে আসিয়া পড়িয়াছেন এবং বলিতেছেন : তুমি আমার নাম লৈয়া ঠাট্টা করতেছ কেন?
সুভাষবাবু ব্যাপার কী জিজ্ঞাসা করিলেন। সভার মধ্যেই আমি সূর্যবাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করিলাম। সূর্যবাবুও আমার বিরুদ্ধে বলিলেন। উচ্চ হাসিয়া সুভাষবাবু বিচার করিলেন। বিচারে সূর্যবাবু অপরাধী সাব্যস্ত হইলেন। আমি বেকসুর খালাস পাইলাম। সকলে অনেকক্ষণ ধরিয়া হাসাহাসি করিলেন।
আরেক দিনের ঘটনা। ময়মনসিংহ টাউন হলে এক কংগ্রেসি সভার সভাপতি রূপে আমি নাকি খুব ভাল বক্তৃতা করিয়াছিলাম। এ জিলার প্রাচীনতম সংবাদপত্র চারু-মিহির এই প্রসঙ্গে আমার প্রশংসায় একটা সম্পাদকীয় লিখিয়া ফেলিল। তাতে আমাকে খ্যাতনামা সাহিত্যিক, জনপ্রিয় কংগ্রেস-নেতা, উদীয়মান উকিল মি. মনসুর আলী সাহেব’ বলিয়া উল্লেখ করা হইল। উক্ত পত্রিকার সম্পাদক মি. মধুসূদন সরকার ময়মনসিংহ বারের প্রবীণ উকিল। কাগজ বাহির হইবার পর দিনই তাঁর সাথে আমার দেখা। সগর্বে তিনি আমাকে বলিলেন : পড়ছেন এবারের সম্পাদকীয়টা? কেমন লাগল?
আমি হাসিয়া বলিলাম : ধন্যবাদ। আমাকে ত বাঁশ দিয়া অনেক উঁচায় তুলছেন। কিন্তু সামান্য একটু ভুল হইছে।
মধুবাবু কিছুটা বিস্মিত এবং তার চেয়ে অসন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন : আমি ভুল করছি? কী ভুল?
আমি হাসিমুখে বলিলাম : আমার নাম আবুল মনসুর, মনসুর আলী নয়।
মধুবাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া বিজ্ঞের হাসি হাসিয়া বলিলেন : ও! এই কথা! এতে ভুলটা কী হইল? নামের মধ্যে ‘মনসুর’ ত আছে।
আমি বিরক্তি গোপন করিয়া বলিলাম : তা আছে বটে, তবে নামটা আমার আবুল মনসুর আহমদ, মনসুর আলী নয়।
মধুবাবু আমার বোকামিতে কৃপা প্রদর্শন করিয়া সান্ত্বনার সুরে বলিলেন : নাম সম্বন্ধে অত ফ্যাসটিডিয়াস হইবেন না। যাহা আবুল মনসুর তাহাই মনসুর আলী। আমি ত কোনও পার্থক্য দেখি না।
এই বলিয়া মধুবাবু আমাকে পাত্ৰাধার তৈল ও তৈলাধার পাত্র এবং ‘টুইডলডাম’ ও ‘টুইডলডি’র চুলচেরা হিসাবের অন্যাবশ্যকতা বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন।
আমি আর কী করিতে পারি? অগত্যা নিরস্ত হইলাম এবং টিট-ফর ট্যাট’-এর সন্ধানে থাকিলাম। সৌভাগ্যবশত সুযোগের অপেক্ষায় আমাকে বসিয়া থাকিতে হইল না।
সেই দিনই বিকালে কোর্ট-ফেরতা ডি বি বিল্ডিংয়ের মধ্যবর্তী রাস্তা দিয়া বাসায় ফিরিতেছিলাম। সেদিন ডি বির মিটিং ছিল। মিটিং শেষে চেয়ারম্যান শরফুদ্দিন সাহেব কতিপয় মেম্বর লইয়া রাস্তায় দাঁড়াইয়া বোধ হয় মিটিং-এরই কোনও আলোচিত বিষয়ের পুনরালোচনা করিতেছিলেন। আমাকে দেখিয়া ডাকিলেন। আমিও তাদের আলাপে শামিল হইলাম। আলাপ করিতে-করিতে হঠাৎ চেয়ারম্যান সাহেব মাথা উঁচা করিয়া বলিলেন : ওটা চারু-মিহির-এর এডিটর মধুবাবু যাইতেছে না?
