.
২. চাল-চলনে গোঁড়ামি
আমার কংগ্রেসি জীবনে আমি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই হিন্দু বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে কাল কাটাইতাম। তাদের বাড়িতে চা-বিস্কুট-মিঠাই খাইতাম। হিন্দু মহিলাদের সাথে কথা বলিতাম। তাদের হাতেও খাইতাম। কিন্তু কদাচ তাঁদের কাছে ‘জল’ চাই নাই। বরাবর পানি’ চাহিয়াছি। তাঁদের বাড়িতে আমি কদাচ ‘ডিম’ ও ‘মাংস খাই নাই। বরাবর ‘আন্ডা’ ও ‘গোশত খাইয়াছি। প্রথম-প্রথম অনেক হিন্দু বন্ধু বিশেষত মহিলা আমার এই ব্যবহারে মনে মনে চটিতেন। এটাকে আমার গোঁড়ামি মনে করিতেন। কিন্তু তাতে আমার ব্যবহার বদলায় নাই। বরঞ্চ উল্টা ফল হইয়াছে। ওরা আমার এই সব শব্দ ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয় বুঝিয়া আমার মুসলমানি আদব-কায়দা আরো বাড়ায়াছিলাম। আমার নাস্তিক্যের ও ধর্মীয় উদারতার আমলে, বিশেষত কলিকাতার জীবনে, বন্ধুবর মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, বন্ধুবর আয়নুল হক খ এবং আরো অনেক মুসলমান বন্ধুর প্রভাবে একসময় তহবন্দের বদলে ধুতি পরা শুরু করিয়াছিলাম। কিন্তু তহবন্দ বা লুঙ্গি পরা নিয়াই হিন্দুরা মুসলমানদেরে অবজ্ঞা করে বুঝিয়া ধুতি ছাড়িয়া দিলাম। অতঃপর লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু পরিতামই না। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করিয়াই যে দাড়ি রাখিয়াছিলাম, তার কারণ এই যে হিন্দু কংগ্রেসি বন্ধুরা দাড়ির নিন্দা করিত।
.
৩. মিঠাই বর্জন
মফস্বলে হিন্দু মিঠাইর দোকানে মিঠাই না খাওয়া তেমন বড় ত্যাগ ছিল না। কিন্তু কলিকাতায় এটা সত্যই খুব বড় রকমের ত্যাগ ছিল। বাগ বাজারের রসগোল্লা, কলেজ স্কোয়ারের পুটিরামের মিঠাই ও বৌবাজারের ভীম নাগের সন্দেশ যে না খাইয়াছে, তার কলিকাতা-জনম বৃথা। দাড়ি-মুখে লুঙ্গি পরিয়া এইসব দোকানে মুসলমান ঢুকিতে পারে না বলিয়া আমি এমন লোভনীয় মিষ্টান্ন হইতে নিজেকে বঞ্চিত রাখিতাম। শ্রদ্ধেয় বন্ধু ইয়াকুব আলী চৌধুরী পাকা নামাজি-মোত্তাকী-পরহেযগার মুসলমান ছিলেন। তিনিও দাড়ি রাখিতেন। আচকান-পাজামা ও টুপি ছাড়া কদাচ রাস্তায় বাহির হইতেন না। তিনি পর্যন্ত ঐসব মিঠাই বর্জন করিতেন না। তিনি আমার এই আত্মসম্মানবোধের গালভরা প্রশংসা করিয়াও শেষ পর্যন্ত ঐ মিঠাই খাইতে জোর-যবরদস্তি করিতেন। তিনি বলিতেন : নিজে ঐসব দোকানে মিঠাই কিনিতে যাইও না; কিন্তু অপরে কিনিয়া আনিয়া দিলে বাড়িতে বসিয়া খাইও। অনেক দিন পরে চৌধুরী সাহেবের এই বাস্তববাদী যুক্তি গ্রহণ করিয়া তারই কিনা মিঠাই তাঁরই সিটে বসিয়া খাইয়াছিলাম।
.
৪. বেশ্যা-বর্জিত
আরেকটি মজার ব্যাপার এখানে উল্লেখ না করিয়া পারিতেছি না। বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনিতাম, কলিকাতার বেশ্যারাও মুসলমান খরিদ্দার গ্রহণ করে না। পরে এই কথার এইরূপ ব্যাখ্যা শুনিলাম যে মুসলমান খরিদ্দারদিগকেও ‘হিন্দু বেশে অর্থাৎ ধুতি পরিয়া বেশ্যাবাড়ি যাইতে হয়। প্রথমে হিন্দুদের মুসলিম বিদ্বেষের গভীরতা ও ব্যাপকতা দেখিয়া স্তম্ভিত হইলাম। হিন্দুদের মুসলিম ঘৃণা বেশ্যাদের মধ্যে পর্যন্ত প্রসারিত হইয়াছে? শ্রদ্ধেয় বন্ধু ডা. লুৎফর রহমান এই সময় পতিতা উদ্ধারিনী সমিতি’ চালাইতেছিলেন এবং এই উপলক্ষে বেশ্যাদের মধ্যে সভা করিয়া মূল্যবান সদুপদেশ দিতেছিলেন। তাঁর মুখে শুনিলাম, স্বয়ং বেশ্যাদের মধ্যেও অনেক মুসলমান মেয়ে আছে। কিন্তু তারা হিন্দু নামে ব্যবসা করিতেছে বলিয়া তাদেরে চিনিবার উপায় নাই। এর কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম মুসলমান বেশ্যার বাড়িতে কোনও হিন্দু খরিদ্দার যাইবে না; এমনকি ভদ্রবেশ্যা পল্লিতে তারা বাড়ি পাইবে না। তাই তারা হিন্দু নাম গ্রহণ করিয়া ব্যবসা করিতেছে। দিন-রাত পাপের মধ্যে ডুবিয়া আছে যে বেশ্যারা তারা পর্যন্ত মুসলমানকে ঘৃণা করে? কথাটা যে সত্যতার প্রমাণ নিজের চোখে দেখিতাম। যেসব মুসলমান বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত লোক কার্য বা চাকুরি উপলক্ষে দিনের বেলা কোট-প্যান্ট, পাজাম-পাঞ্জাবি পরিয়া থাকিতেন, তাঁদেরে দেখিতাম সন্ধ্যার সময়ে ফিনফিনা ধুতি ও সিল্কের পাঞ্জাবি পরিয়া অ্যাসেন্স লাগাইয়া বেড়াইতে বাহির হইতেছেন। তাঁহার অনেকের মুখেই এই স্বীকারোক্তি পাইতাম যে, পাঞ্জাবি-পাজামা পরিয়া গেলে বেশ্যারা বসিতে দিবে না বলিয়াই তারা ঐ পোশাকে যাইতেছেন।
ঘৃণা-লজ্জায় আমার তালু-জিহ্বা লাগিয়া গিয়াছিল। কিন্তু বেশ্যাদের চেয়ে আমার রাগ হইল এই সব আত্মসম্মানবোধহীন বেহায়া ও বেশরম মুসলমানদের উপরে। আমি এই সময় মেসে থাকিতাম। তার কয়েকটা ছিল খুবই বড় মেস। সেসব মেসে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন করিয়া নানা কাজের ও নানা বয়সের লোক থাকিতেন। তাঁদের মধ্যে বেশ্যাবাড়ি যাইবার অভ্যাস কারো কারো ছিল। তাঁরা অসংকোচে, অনেকে সগৌরবে, বেশ্যাবাড়ির অভিজ্ঞতা বর্ণনা করিতেন। নিজেদের মুসলমানি গোপন করিয়া বেশ্যাবাড়ি যাওয়ার সমর্থনে তারা বলিতেন : মুসলমান পুরুষরা যে মুসমানি বেশে বেশ্যাবাড়ি যায় না এবং মুসলমান মেয়েরা যে মুসলমানি নামে বেশ্যাবৃত্তি করে না, তাতে আমার দুঃখিত না হইয়া বরঞ্চ আনন্দিত হওয়া উচিৎ। কারণ দুনিয়ার লোক জানিতেছে, কলিকাতার হাজার হাজার বেশ্যার মধ্যে একজনও মুসলমান। মেয়ে নাই এবং লক্ষ-লক্ষ বেশ্যাগামীর মধ্যে একজন মুসলমান পুরুষও নাই। যতই চিন্তা করিলাম, ততই বুঝিতে পারিলাম বন্ধুদের যুক্তিটা একেবারে ফেলিয়া দিবার মত নয়। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের ঐ যুক্তিতে আমি যথেষ্ট সান্ত্বনা পাইলাম। আস্তে আস্তে আমার রাগ কমিয়া গেল। কিন্তু ঐ ব্যাপার হইতে একটা শিক্ষা গ্রহণ করিলাম এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার পাইলাম। যত দিন। অবিবাহিত অবস্থায় কলিকাতা থাকিলাম, দাড়িও ফেলিলাম না, লুঙ্গিও ছাড়িলাম না। কলিকাতার মত অসংখ্য প্রলোভনের বিশাল নগরীতে লুঙ্গি ও দাড়ি আমার চরিত্রের রক্ষাকবচ হইয়া থাকিল। বেশ্যাদিগকে বেশ্যা হিসাবে আমি ঘৃণা করিতাম বটে, কিন্তু নারী হিসাবে আমি তাদেরে সম্মান করিতাম। ডা. লুত্যর রহমানের সংশ্রবে আসিয়াই যে আমি এই মত অবলম্বন করিয়াছিলাম, তা নয়। তার অনেক আগে হইতেই আমার এই মত ছিল। ১৯২২ সালের ঘটনা। তখন ময়মনসিংহ শহরে কংগ্রেস-খেলাফত নেতাদের। অখণ্ড প্রতাপ। আমরা তখন একদলে পনের-বিশজন নেতা দল বাঁধিয়া রাস্তায় টহল দিতাম। সকল শ্রেণীর পথচারীরা আমাদেরে পথ ছাড়িয়া দিত। পথ চলিতে-চলিতেও আমরা তর্কবিতর্ক, আলাপ-আলোচনা করিতাম। এমনি একদিন তর্কের জোশে আমি বন্ধুদের দিকে ঘাড় ফিরাইয়া-ফিরাইয়া পথ চলিতেছিলাম। অপর দিক হইতে দুই-তিন জন বেশ্যা আসিতেছিল। ওরা আমাদেরে রাস্তা ছাড়িয়া এক পাশ হওয়া সত্ত্বেও আমি বেখায়ালে উহাদের। একজনের পায়ে পাড়া মারি। উহ’ শুনিয়া আমার হুঁশ হয়। আমি তার দিকে ফিরিয়া নিজের অপরাধ বুঝিতে পারি এবং মাফ করিবেন’ বলিয়া আমি মাথা ফিরাইয়া জোড় হাতে হিন্দু-মতে নমস্কার করি। কারণ আমার ধারণা ছিল সব। বেশ্যাই হিন্দু। আমার সাথীরা সকলে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। একজন বলিলেন : ‘ছি ছি, তুমি একটা বেশ্যাকে নমস্কার করিলে। বিনা-দ্বিধা সংকোচে চট করিয়া আমার মুখ হইতে বাহির হইয়া গেল : যারা বেশ্যাবাড়ি যায়, তাদের জন্যই ইনি বেশ্যা। আমার জন্য ইনি একজন মহিলা মাত্র।
