.
১৪. ‘ইসলাম-হিতৈষী’ বনাম ‘মুসলিম-হিতৈষী’
সুতরাং ইসলামের উপর আমি ঘোরতর খাফা হইলেও মুসলমানদের কল্যাণের জন্য ইসলাম ত্যাগ করা প্রয়োজন মনে করিলাম না। আমার উদ্দেশ্য মুসলমানদের কল্যাণ করা। আল্লাহ যখন আমাকে মুসলমান সমাজে মুসলমান পিতা-মাতার ঘরে পয়দা করিয়াছেন, তখন আমার পিতা-মাতা তথা সমাজের প্রতি একটা কর্তব্য দিয়াই আমাকে পয়দা করিয়াছেন। মুসলমানদের প্রতি এই কর্তব্য করিতে গিয়া ইসলাম ধর্মকে যদি আমি প্রতিবন্ধক মনে করি, এই প্রতিবন্ধক দূর করিবার জন্য যদি মুসলমানদেরে একযোগে ইসলাম ত্যাগ করিয়া খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করিবার উপদেশ দেই, মুসলমানরা আমার উপদেশ গ্রহণ করিয়া যদি একযোগে খৃষ্টান হইয়া যায় এবং তার ফলে তাদের যদি উন্নতি হয়, তবে সে উন্নতি মুসলমানদের হইল না, হইল খৃষ্টানদের। কারণ তখন তারা আর মুসলমান নাই, খৃষ্টান-ধর্মী হইয়া গিয়াছে। কিন্তু গোড়ায় আমার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের উন্নতি করা, খৃষ্টানদের উন্নতি করা নয়। তাদের প্রতি আমার জন্মগত কোনও দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল না।
অতএব মুসলমানদিগকে মুসলমান রাখিয়াই তাদের কল্যাণ করিতে হইবে। মুসলমান সমাজে, ইসলাম ধর্মে ও মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে পয়দা করিয়া সৃষ্টিকর্তা আমার উপর এই কর্তব্য আরোপ করিয়াছেন। আমি যদি মুসলমান বাপ-মার ঘরে পয়দা না হইয়া হিন্দু বাপ-মার ঘরে জন্মাইতাম, তবে হিন্দু ধর্ম ও সমাজের প্রতি আমার অবিকল এই কর্তব্য হইত। এই কথাটাই আমি গোঁড়া মুসলমান বন্ধুদেরে উত্ত্যক্ত করিবার জন্য বারে বারে বলিতাম। তারা যখন ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় মুখে খই ফুটাইত তখনই আমি বলিতাম : তুমি যদি হিন্দু বাপ-মার ঘরে পয়দা হইতে, তবে খুব গোঁড়া হিন্দু হইতে; হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় ও ইসলামের কুৎসায় তোমার মুখে এমনি খই ফুটিত।
অধ্যায় দশ – ‘অনিসলামি মুসলমান’
১. স্পর্শকাতর মুসলমান
আগেই বলিয়াছি আমি যতই মোল্লা-বিরোধী, গোঁড়ামি-বিরোধী হইয়া উঠিতে লাগিলাম, মুসলমানদের প্রতি দরদ ও টান আমার ততই বাড়িতে লাগিল। বাড়িতে লাগিল বলিলাম এই জন্য যে মুসলমানি চেতনা আমার ছেলেবেলা হইতেই ছিল। আভাসে-ইঙ্গিতেও যদি কেউ মুসলমানের নিন্দাসূচক কথা বলিতেন, তবে আমি ক্ষেপিয়া উঠিতাম। আমি যখন ধানীখোলা পাঠশালার ছাত্র, সেই সময় বৈলরের জমিদারের ম্যানেজার বাবু কেশব চন্দ্র চক্রবর্তী একবার আমাদের পাঠশালার বার্ষিক সভায় সভাপতিত্ব করিয়াছিলেন। কেশব বাবু দয়ালু উদার-হৃদয় অসাম্প্রদায়িক লোক বলিয়া পরিচিত ছিলেন কিন্তু সভাপতির অভিভাষণের এক জায়গায় তিনি বলিলেন : ‘ভদ্রলোকদের দেখাদেখি আজকাল মুসলমানরাও বিদ্যাশিক্ষার দিকে মন দিয়াছে দেখিয়া আমি যারপরনাই আনন্দিত হইয়াছি।’ এতে মুসলমানদিগকে ভদ্রলোক বলা হইল না বলিয়া সাত-আট বছরের শিশু আমি ক্ষেপিয়া গিয়াছিলাম এবং সভাশেষে ম্যানেজার বাবুর সাথে তর্ক করিতে গিয়াছিলাম। আমাদের শিক্ষক ও মুরুব্বিরা আমাকে নিরস্ত করিয়াছিলেন। তৎকালের শ্রেষ্ঠ সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বঙ্গবাসীতে একবার এক সভার খবর এই রূপে বাহির হইয়াছিল : সভায় কতিপয় ভদ্রলোক ও অনেক মুসলমান যোগ দিয়াছিলেন। আমি উক্ত সংবাদপত্রে ইহার প্রতিবাদ পাঠাইয়াছিলাম। ছাপা হয় নাই বলিয়া উক্ত পত্রিকার গ্রাহক আমার মুরুব্বিকে ঐ কাগজ না কিনিতে উপদেশ দিয়াছিলাম। তিনি হাসিয়াছিলেন এবং ভবিষ্যতে আর টাকা দিবেন না বলিয়া আমাকে শান্ত করিয়াছিলেন। মুসলমান মাতব্বর প্রজাদেরেও জমিদারের কাঁচারিতে বসিতে দেওয়া হয় না বলিয়া আমি শৈশবেই জমিদারদের বিরুদ্ধে। মুরুব্বিদের উস্কাইতাম। ময়মনসিংহ শহরে পড়িতে আসিয়া যখন দেখিলাম, হিন্দু মিঠাইর দোকানে মুসলমান খরিদ্দারকে ঢুকিতে দেওয়া হয় না, তখন মিঠাই খাওয়ার লোভ অতি কষ্টে নিবারণ করিলাম। এসবই স্বাভাবিক ছিল। তখন আমি চালে-চলনে, মনে-মস্তিষ্কে পাক্কা মুসলমান।
কিন্তু আমি যখন মনের দিক দিয়া ঘোরতর নাস্তিক, পোশাকে-পরিচ্ছদে যখন আমাকে বাঙ্গালী হিন্দু যুবক হইতে আলাদা করিয়া চিনিবার কোনও উপায় ছিল না, তখন আমি কথাবার্তায় মুসলমান যবান যাহির করিয়া গৌরব বোধ করিতাম। ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান জাতিকে নিন্দা করিলে আমি সঙ্গে সঙ্গে নিন্দুকের সঙ্গে ঝগড়া বাধাইয়া দিতাম। আমি নিজের ঘরে বসিয়া ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান সমাজের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করিতাম। কিন্তু কোনও অমুসলমান সে কাজ করিলে তার দিকে মুষ্টি উঁচাইয়া যাইতাম। আমি যখন ঘোরতর নাস্তিক সেই সময় যদি কোনও ইউরোপীয় পণ্ডিতের বইয়ে ইসলাম ধর্ম ও পয়গম্বর সাহেবের নিন্দা করিতাম তবে ঐ পণ্ডিতকে মূর্খ আখ্যা দিয়া তার বই ছুড়িয়া ফেলিয়া দিতাম। এমনকি যদি কোনো দর্শনের বইয়ে ধর্ম প্রবর্তকদের নামের মধ্যে যিশুখৃষ্ট ও বুদ্ধের নামের পাশে মোহাম্মদের নাম অথবা বড়-বড় ধর্মের নামের মধ্যে বৌদ্ধ, হিন্দু ও খৃষ্টধর্মের সাথে ইসলামের নাম না দেখিতাম, তবে ঐ দার্শনিকের প্রতি আমি এক মুহূর্তে শ্রদ্ধা হারাইতাম। ঘোরতর নাস্তিক্যের অবস্থায়ও আমি বরাবরের অভ্যাস-মত উঠিতে-বসিতে, রাস্তায় বাহির হইতে, খাইবার সময় প্রথম নওলা মুখে দিতে, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়িতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলিতাম। খানা শেষ করিয়া, কোনও আনন্দসংবাদ পাইয়া ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলিতাম। কাকেও উৎসাহ দিতে গিয়া ‘মাশা আল্লাহ’ বলিতাম। কাছে বসিয়া কেউ হাঁচি মারিলে ‘আরহামাকুমুল্লাহ’, বিস্ময় প্রকাশে ‘সোবহানাল্লাহ’, ঘৃণা প্রকাশে নাউযুবিল্লাহ’ বলিতাম। আমার এই পাক্কা মুসলমানি ব্যবহার দেখিয়া অনেক বন্ধু আমার নাস্তিক্য বা মুক্ত-বুদ্ধি অথবা র্যাশনালিযম সম্বন্ধে, এমনকি আমার অসাম্প্রদায়িক উদারতা সম্বন্ধেও সন্দিহান ছিল। অনেক বন্ধু আড়ালে আমার নিন্দা করিয়া বলিত : আরে, কে বলে আহমদ নাস্তিক? ও আসলে একটা মোল্লা। নিজেকে একজন ফ্রি-থিংকার প্রমাণ করার জন্যই সে নাস্তিক্যের ভণ্ডামি করিয়া থাকে।
