.
১১. ধর্মত্যাগ অসম্মানসূচক
ধর্মত্যাগ অপমানজনক ও আত্মমর্যাদাবিরোধী বটে। আমি যেমন ইচ্ছা করিলেই বাপ-মা বদলাইতে পারি না, তেমনি ইচ্ছা করিলেই ধর্মও বদলাইতে পারি না। পিতা-মাতা, দেশ ও ধর্ম আমার ইচ্ছাধীন নির্ধারিত জিনিস নয়। এটা অ্যাকসিডেন্ট-অব-বার্থ। যারা আল্লায় বিশ্বাস করে, তারা স্বীকার করিবে যে, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায়ই এটা হইয়াছে। মঙ্গলময় সৃষ্টিকর্তা জানিয়া-শুনিয়াই বিশেষ উদ্দেশ্যে সকলের মঙ্গলের জন্যই আমাকে এই। পিতা-মাতার ঘরে, এই দেশে, এই ধর্মে, এই সমাজে জন্ম দিয়াছেন। আমার বাপ-মার প্রতি যেমন আমার কর্তব্য আছে, আমার দেশ, সমাজ ও ধর্মের প্রতিও আমার তেমনি কর্তব্য আছে। আমার বাপ-মা যেমন লোকই হউন, তাঁদেরে ভক্তি করিতে, তাঁদেরে সেবা করিতে, তাঁদেরে প্রতিপালন করিতে হইবে। তারা যদি দরিদ্র হন, তাঁদের অভাব দূর করিতে হইবে; তাঁরা। যদি মূর্খ-জ্ঞানহীন হন তাঁদেরে জ্ঞান দান করিতে হইবে। তারা যদি দুষ্ট লোক হন, তাঁদেরে সৎপথে আনিতে হইবে। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই তাঁদেরে ত্যাগ করা চলিবে না। সেটা হইবে চরম ঘৃণ্য স্বার্থপর অকৃতজ্ঞতা এবং পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য-জ্ঞানহীনতা। সমাজ, দেশ ও ধর্ম সম্বন্ধেও আমার কর্তব্য তাই। এ অবস্থায় ভাল ধর্মের সন্ধানে যদি পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করিতে হয়, তবে ভাল সমাজের সন্ধানে আমার সমাজ, ভাল দেশের তালাশে আমার দেশ ও ভাল পিতা-মাতার তালাশে বর্তমান বাপ-মাও ত্যাগ করিতে হয়। এই যুক্তিতেই আমি ধর্ম প্রচার ও প্রসলিটাইজিং-এরও বিরোধী হইলাম। আমি বলিতাম : আমাকে আমার ধর্ম ত্যাগ করিয়া তোমার ধর্ম গ্রহণ করার, দাওয়াত করার অর্থ আমার বাবাকে বাবা ডাকা ছাড়িয়া দিয়া তোমার বাবাকে বাবা বলার দাওয়াত করা। আমার এই যুক্তি শুনিয়া আমার বহু বন্ধু-বান্ধব হাসিত, অনেকে রাগ করিত। কিন্তু যুক্তি হিসাবে আমার কথা কেউ খণ্ডন করিতে পারিত না, অর্থাৎ আমি মনে করিতাম, পারিত না। কাজেই আমার মতে আমি দৃঢ় ছিলাম।
.
১২. ধর্মে-ধর্মে টলারেন্স
নিজে ঐ যুক্তির ফাঁদে পড়িয়াই এই সময় আমি সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ ও প্রচার করিতে লাগিলাম। যে ব্যক্তি নিজের বাপ-মাকে ভক্তি করে, সে অপরের বাপ-মাকে ভক্তি-শ্রদ্ধা না করিয়া পারে না। যে ব্যক্তি নিজের দেশকে ভালবাসে, সে ব্যক্তি অপরের দেশ-প্রেমকে শ্রদ্ধা না করিয়া পারে না। ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি নিজের ধর্মকে ভালবাসে, সে অপরের স্বধর্মপ্রীতিকে শ্রদ্ধার চোখে না দেখিয়া পারে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অপরের বাপ-মাকে গাল দেয়, সে ব্যক্তি নিশ্চয়ই নিজের বাবা-মাকেও গাল দেয়। যে ব্যক্তি অপরের দেশ-প্রেমকে অশ্রদ্ধা করে, তার নিজের দেশ-প্রেমটা নিশ্চয়ই ভণ্ডামিমাত্র। ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি অপরের ধর্মের নিন্দা করে, নিজের ধর্মের প্রতি তার কোনও শ্রদ্ধা নাই।
আমার এই মতবাদ ক্রমেই এতদূর গেল যে, আমি ধর্মে-ধর্মে টলারেন্স বা পরধর্ম-সহিষ্ণুতা ও খুব জোরের সঙ্গে প্রচার করিতে লাগিলাম। আমি বলিতে লাগিলাম : এই টলারেন্স যে ধর্মের মধ্যে যত বেশি, সে ধর্ম তত বেশি মানব-কল্যাণমুখী। আমি এই সময় কোরআন শরিফের ‘লা-ইকরাহফিদ্দিন, ধর্মের ব্যাপারে জোর-যবরদস্তি নাই’, ‘লাকুম দিনুকুম ওলিয়া দিন, তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার’; উদউ ইলাসসাবিল,… মিষ্ট ভাষায় ধর্মের দাওয়াত কর’–এই সব কথার উল্লেখ করিয়া ইসলামের কল্যাণমুখিতা প্রচার করিতাম। আমি বলিতাম, মুসলমানরা যদি কোথাও ইসলামের মূল শিক্ষা হইতে বিচ্যুত হইয়া থাকিয়া থাকে, তা এইখানে। এই ব্যাপারে হিন্দু ধর্মের শিক্ষার দিকে আমি অতিশয় আকৃষ্ট হইয়া পড়ি। হিন্দুশাস্ত্রের শিক্ষা এবং সাধারণ হিন্দুরও বিশ্বাস এই : ভগবান মহাসাগর; বিভিন্ন ধর্মমত নদী-উপনদী মাত্র। সব নদীর পানিই যেমন শেষ পর্যন্ত মহাসাগরে গিয়া পড়ে, তেমনি সব ধর্মই মানুষকে ভগবানের সান্নিধ্যে লইয়া যায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যেদিন দুনিয়ার সব ধর্ম-মতের লোকেরা এই মহাশিক্ষা গ্রহণ করিবে, সেদিন ধর্ম সত্য-সত্যই মানুষের কল্যাণ সাধন করিবে।
.
১৩. সর্বধর্ম-সমন্বয় বনাম সর্বধর্ম-পরিচয়
এই সময় ইউরোপের কোনও কোনও চিন্তানায়ক মানব-প্রেমিক দুনিয়ার সমস্ত ধর্মের সার-নির্যাস লইয়া একটা কমন-ফেথ’ প্রতিষ্ঠার কথা বলিতে শুরু করেন। এ ধরনের চেষ্টা এই ভারতবর্ষের আকবর বাদশাহ, গুরুনানক ও কবির করিয়াছিলেন। কিন্তু সে চেষ্টার ফলে এক একটা নূতন ধর্মের সৃষ্টি হইয়াছে মাত্র। এ সম্পর্কে লর্ড এভারবেরী, ডা. স্মাইলস ও আরো কোনও কোনও মনীষীর কথা এইরূপ : ‘এভরি অ্যাটেম্পট অ্যাট ইউনিফিকেশন অব-রিলিজিয়নস হ্যাঁজ অনলি অ্যাডেড টু দেয়ার নাম্বার।’ অর্থাৎ ধর্মসমূহকে এক করিবার প্রত্যেক চেষ্টাই ধর্মের সংখ্যা বাড়াইয়াছে মাত্র। কাজেই ‘কমন-ফেথ’ প্রতিষ্ঠার নয়া স্লোগানে আমি খুব বেশি উৎসাহ পাইতাম না। বরঞ্চ ধর্মে-ধর্মে টলারেন্স স্থাপন এবং সব ধর্মকেই বাস্তবপন্থী করার মধ্যেই মানবকল্যাণ নিহিত রহিয়াছে বলিয়া আমি দৃঢ় মত পোষণ করিতাম।
প্রিন্সিপাল জে আর ব্যানার্জীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই সময় কলিকাতায় এবং বাংলায় অনেক জিলাতেই সর্বধর্ম-সমন্বয় সম্পর্কে বছরে বছরে একটি আলোচনা সভা হইত। তাতে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ও ব্রাহ্মসমাজের বিভিন্ন বক্তা নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে বক্তৃতা করিতেন। এই সভার উদ্যোক্তারা একবার আমাকে ঐ সভায় বক্তৃতা করিতে বলেন। আমি এই শর্তে বক্তৃতা করিতে রাজি হই যে, বক্তারা যার-তার ধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা না করিয়া অপর যে কোনও ধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা করিবেন। আমি হিন্দু ধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা করিতে রাজি হই। সভায় সে রকম ব্যবস্থা হয়। আমি হিন্দু ধর্ম সম্বন্ধে বক্তৃতা করি। হিন্দু ধর্ম পলিথিস্ট বা বহু ঈশ্বরবাদী পৌত্তলিক ধর্ম, আমার বক্তৃতায়। আমি ঐ অভিযোগ খণ্ডন করি। হিন্দু ধর্মে এক খোদার বদলে তেত্রিশ কোটি খোদা মানা হয়, এটাকে উচ্চস্তরের দার্শনিক মতবাদ বলিয়া ব্যাখ্যা করি। আমি বলি : এই মতবাদের অর্থ এই যে, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রত্যেক ব্যক্তির বিবেকই তার খোদা। একজনের বিবেকের কাছে যা পাপ, অপরের বিবেকের কাছে তাই পুণ্য। দৃষ্টান্ত : মুসলমান ডাকাতেরা আল্লাহু আকবর’ বলিয়া হিন্দু বাড়ি এবং হিন্দু ডাকাতেরা কালী মাই কি জয়’ বলিয়া মুসলমানের বাড়ি লুট করে। গত মহাযুদ্ধে জার্মান কায়সর ও মিত্র পক্ষের উইলসন-লয়েড জর্জ উভয় পক্ষই যুদ্ধ জয়ের জন্য বাইবেল হাতে গির্জায় প্রার্থনা করিয়াছিলেন।
