.
৯. আচার-সর্বস্বতার কুফল
চৌধুরী সাহেবের এই যুক্তি একা চৌধুরী সাহেবের নয়। অনেক মুসলমানেরই ধারণা তাই। কিন্তু যুক্তিটা ত্রুটিপূর্ণ। শতকরা কতজন মুসলমান নামাজ পড়িল, আর কতজন পড়িল না, প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্নটা হইল ঈমানের দিক হইতে প্রায় সব মুসলমানই নামাজকেই ধর্মকাজ মনে করিয়া থাকে। যারা পড়িল তারা পুণ্যবান, যারা পড়িল না তারা আত্মস্বীকৃত অপরাধী। নামাজি বেনামাজি কেউই নামাজ ছাড়া অন্য কাজকে বড় ধর্মকাজ ও পুণ্যের কাজ মনে করে না। কাজেই জ্ঞান ও কর্মে তাদের উৎসাহ নাই। নামাজ পড়িলে আর কোনও ভাল কাজ করার দরকার নাই, বরঞ্চ ঠিকমত নামাজ পড়িয়া। আপনি একশ একটা পাপ করিতে পারেন। মোল্লারা হাদিস-কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া হাজার হাজার বই-পুস্তক প্রকাশ করিয়া মুসলমানদের মাথায় ঢুকাইয়াছে যে প্রতি ওয়াকত নামাজেই নামাজিদের আগিলা-পিছিলা সব গোনা-খাতা মাফ হইয়া যাইতেছে। বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ ধরনের নফল নামাজ পড়িলে আগিলা-পিছিলা সত্তর বছরের পাপ ধুইয়া-মুছিয়া যায়। হজ, পীরের কবর যিয়ারত, বিশেষ ধরনের তসবিহ তেলাওত, ‘দোওয়া হাবিবী’, ‘দোয়া গাঞ্জল আরশ’ বলিয়া কথিত বিশেষ বিশেষ দোয়ার বরকত ও ফজিলত সম্বন্ধে মোল্লারা এত সব অদ্ভুত চিত্রাকর্ষক বর্ণনা দিয়া থাকেন যে, ওর যে কোনও একটা কাজ করিয়াই জীবনের সমস্ত অন্যায় ও পাপের শাস্তি হইতে রেহাই পাওয়া ও বেহেশতের হকদার হওয়া যায়। সব ধর্মেই বোধ হয় কম-বেশি আচার-উপাসনার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মুসলমানদের তুলনায় নিশ্চয়ই আর সকলেরটা নিতান্ত নগণ্য।
কাজেই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমার মন যত বেশি রুষ্ট হইতে লাগিল, মুসলমানদের প্রতি আমার দরদ-সহানুভূতি তত বাড়িতে লাগিল। আমার মনে হইতে লাগিল, মোল্লা-মৌলবী, শরা-শরিয়ত, পীর পয়গম্বর ও কথিত লৌকিক ধর্ম হইতেছে যালেম, আর মুসলমানরা হইতেছে। মযলুম। যালেমের প্রতি ছেলেবেলা হইতেই আমার মন বিরূপ ছিল। মযলুমের প্রতি আমার মমত্ববোধ ছিল একেবারে ইনসুটিংকটিভ উৎপ্রেরণাজাত। জমিদার ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীর বিরুদ্ধে যে কারণে আমি রুষ্ট ছিলাম, সেই কারণেই আমি আনুষ্ঠানিক ধর্ম বা শরিয়তের উপর রুষ্ট হইলাম। ভাবিলাম, জমিদারের যুলুম হইতে কৃষক-প্রজাদেরে, বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীর কবল হইতে ভারতবাসীকে মুক্ত করার মতই এবং সঙ্গে সঙ্গেই মুসলমান সমাজকেও শরিয়তের যুলুম হইতে লিবারেট করিতে হইবে। মুসলমানদিগকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, শিল্পে-সাহিত্যে দুনিয়ার অন্যান্য সভ্য জাতির সমকক্ষ করিতে হইলে ঐটা করিতেই হইবে।
.
১০. ধর্মান্তর গ্রহণ অনাবশ্যক
মুসলমানদিগকে ইসলামের হাত হইতে বাঁচাইতে হইলে কি তাহাদিগকে একযোগে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করাইতে হইবে? এ নিয়াও আমি বহু চিন্তা করিয়াছি। কিন্তু দুইটা কারণে আমি মন হইতে এই চিন্তাকে দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিয়াছি। প্রথম কারণ, আমি এই সময় ছিলাম শরিয়তি ইসলামবিরোধী ঘোরতর মুসলমান। এই কথাটার ব্যাখ্যা আমি অন্যত্র দৃষ্টান্তসহ করিব। এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই হইবে যে আমি মুসলমান পরিচয় দিতে গৌরব বোধ করিতাম। দ্বিতীয় কারণ, ধর্মান্তর গ্রহণ করাকে আমি অনাবশ্যক ও আত্মসম্মানবিরোধী অপমানজনক লাঞ্ছনা-ব্যঞ্জক কাজ মনে করিতাম। এটা অনাবশ্যক এই জন্য যে, ধর্মত্যাগ না করিয়াও মানুষ তার ঈপ্সিত ভাল কাজ করিতে পারে। “আমার পৈতৃক ধর্মে এই দোষ বা অসুবিধা ছিল বলিয়া আমি ধর্মান্তর করিলাম”–এ কথা যে বলে সে হয় মূর্খ, না হয় ভণ্ড মতলববাজ। হামবাগ ত নিশ্চয়ই। কারণ পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ না করিয়াও ঐ ধর্মের দোষ সে ত্যাগ করিতে এবং নয়া ধর্মের গুণটুকু গ্রহণ করিতে পারিত। কোনও ধর্মেরই অখণ্ড একটা রূপ নাই। বিভিন্ন মতবাদ ও আচার-অনুষ্ঠান লইয়াই ধর্ম। এই মতবাদ ও আচার-অনুষ্ঠানের দুই-একটা তোমার না-পছন্দ হইলেই তুমি তোমার পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করিতে বাধ্য, এটা ঠিক নয়। তেমনি অন্য ধর্মের দুই-একটা মতবাদ ও ক্রিয়াকলাপ পছন্দ হইলেই ঐ ধর্ম তোমার গ্রহণ করিতেই হইবে, এমনও কথা নয়। ময়লার জন্য কেউ কাপড় ফেলিয়া দেয় না, ধুইয়া লয়। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। হিন্দু ধর্মে বিধবা-বিবাহ নিষিদ্ধ। তাই বলিয়া যে সব হিন্দু বিধবা-বিবাহের সমর্থক তারা কি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান বা খৃষ্টান হইবে? কোনও দরকার নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্মের এ বিধানটুকু বদলাইয়া খৃষ্টান ও মুসলমানদের বিধানটুকু গ্রহণ করিলেই এই কারণে ধর্ম ত্যাগ করার কোনও দরকার থাকে না। হিন্দুরা এখন তাই করিয়াছে। তাতে হিন্দুদের কোনও অপমান হয় নাই। হিন্দু ধর্মের কোনো অসম্মান হয় নাই। সেইরূপ, ইসলাম বলে, নারীর পর্দা করিতে হইবে; দাড়ি রাখিতে হইবে, মানুষের মূর্তি আঁকিতে পারিবে না। এখন আমি মুসলমান নারীর মুক্তির জন্য শেভ করিবার জন্য এবং ফটো তুলিবার জন্য ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করিব? কোনও দরকার নাই। আমরা মুসলমান থাকিয়াই নিজেদের ফটো তুলিতেছি; ঘরে ঘরে কায়েদে আযমের ফটো লটকাইবার সরকারি নির্দেশ দিতেছি। ভাস্কর্য ও চিত্রবিদ্যা শিখিবার জন্য স্কুল-কলেজ খুলিতেছি। সিনেমা করিতেছি, নাচিতেছি, গাইতেছি, দাড়ি কামাইয়া কোট-পাতলন-নেকটাই ধরিয়াছি। তাতে মুসলমানদের অপমান হয় নাই। ইসলামেরও অমর্যাদা হয় নাই। এটা গেল ধর্ম ত্যাগের অনাবশ্যকতার দিক।
