এই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করিবার জন্য আমরা মওলানা আজাদ সাহেবকে অনুরোধ করিলাম। মওলানা সাহেব ঐ সময় বিশেষ কাজে অনেকদিন দিল্লি থাকিবেন বলিয়া নিজে সভাপতিত্ব করিতে পারিবেন না বলিলেন। কিন্তু তার প্রিয় সহচর ও প্রাইভেট সেক্রেটারি মওলানা আবদুর রাজ্জাক মলিহাবাদীকে সভাপতি করিতে উপদেশ দিলেন। মওলানা মলিহাবাদী মাত্র কিছুদিন আগে মিসরের জামেউল-আযহার হইতে কৃতিত্বের সঙ্গে ফাইনাল ডিগ্রি লইয়া দেশে ফিরিয়া আসিয়াছেন। তাঁর বিদ্যাবত্তার প্রশংসা দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছে। কাজেই মওলানা আজাদকে না পাওয়ার নৈরাশ্য আমাদিগকে খুব বেশি ব্যথিত করিতে পারিল না।
.
৭. মওলানা মলিহাবাদী
আমরা মওলানা মলিহাবাদীর সাথে দেখা করিলাম। মওলানা আজাদ আগেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন। অতএব তিনি আমাদের সভাপতিত্ব করিতে রাজি হইলেন। দেখিলাম, মওলানা মহিলাবাদী ফুটফুটে গৌরবর্ণ খুব-সুরত সুপুরুষ। মুখ ও বুকভরা লম্বা চাপদাড়ি। চোখ-মুখ হইতে প্রতিভা ও জ্ঞানের নূর ফাটিয়া পড়িতেছে। খুশি হইলাম। ভাবিলাম, হ! তারিফের চেহারা বটে। এমন সুরতি-সিরতি পাক্কা মুসলমান আলেম দিয়াই আমাদের মোল্লাবিরোধী জেহাদ ভালরূপ চলিবে।
সভায় বিপুল জনসমাগম হইল। মওলানা মলিহাবাদী মুদ্রিত উর্দু অভিভাষণ দিলেন। উহা যেমন সুলিখিত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও যুক্তিপূর্ণ হইয়াছিল, তেমনি জনপ্রিয় হইয়াছিল। তিনি সহী হাদিস ও কোরআন শরিফের বহু উক্তি উদ্ধৃত করিয়া প্রমাণ করিলেন যে, মোল্লারা সকল ব্যাপারে ইসলামের কদর্থ করিয়া ইসলামের বদনাম ও বেইজজত করিয়াছে এবং মুসলমানদের অধঃপতন ঘটাইয়াছে। মওলানা সাহেবের অভিভাষণের যে অংশটি সভাস্থলে সবচেয়ে বেশি অভিনন্দিত হইয়াছিল, তা ছিল এই : তিনি সহী হাদিস হইতে পয়গম্বর সাহেবের উক্তি উদ্ধৃত করিয়া প্রমাণ করিলেন যে, দাড়ি-মোচ মুড়ান। বর্তমানে মুসলমানদের জন্য সুন্নতে মোয়াক্কেদা। কারণ পোশাক-পাতি ও চেহারা-ছবিতে তৎকালীন সভ্য জাতি রোমানদের অনুসরণ করিতে উপদেশ দিতে গিয়াই পয়গম্বর সাহেব মুসলমানদিগকে দাড়ি রাখিতে এবং চৌগা পরিতে নির্দেশ দিয়াছিলেন। পোশাক-পাতিতে সর্বস্বীকৃত সভ্য জাতির অনুকরণ না করিলে অমুসলমানেরা মুসলমানদিগকে অসভ্য জাতি মনে করিবে এবং ইসলামের সৌন্দর্য বুঝিবার চেষ্টা না করিয়াই আগে হইতে ইসলামের প্রতি বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণ করিয়া বসিয়া থাকিবে। তারা বলিবে ঐ অসভ্য ও নোংরা আরবদের আবার একটা ধর্ম কী? ফলে ইসলাম প্রচারে ও প্রসারে বিঘ্ন হইবে। শুধু প্রচারকের পোশাকের দোষে ইসলামের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য সম্বন্ধে মানুষ অজ্ঞ থাকুক, এটা যাতে না ঘটে, সেই উদ্দেশ্যেই পয়গম্বর সাহেব চেহারা ও পোশাকে তৎকালীন সভ্য জাতির অনুকরণে মুসলমানদেরে দাড়ি রাখিতে নির্দেশ দিয়াছিলেন। অতএব, মওলানা মলিহাবাদীর যুক্তি এই : বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য জাতিসমূহ সর্বস্বীকৃত মতে শ্রেষ্ঠতম সভ্য জাতি, মুসলমানের পোশাকে-পাতিতে তাদেরে অনুকরণ না করিলে ইসলামের প্রতি বিশ্ববাসীর হেকারত-নফরত ডাকিয়া আনা হইবে। এই কারণে মুসলমানদেরও দাড়ি-মোচ মুড়াইয়া চেহারা-পোশাক আধুনিক হইতে হইবে।
মওলানা সাহেবের উদ্ধৃত হাদিসের প্রামাণ্যতা বিচারের কোনও অধিকার আমার তখনও ছিল না, এখনও নাই। কিন্তু তার মুদ্রিত অভিভাষণের কোনও নির্ভরযোগ্য প্রতিবাদ আমার নজরে পড়ে নাই। উদ্ধৃত হাদিসসমূহকে বিশ্বাসযোগ্য ধরিয়া নিলে মওলানা মলিহাবাদীর যুক্তির সারবত্তা স্বীকার না করিয়া উপায় নাই। মওলানা সাহেবের এই বিপ্লবাত্মক উক্তির সঙ্গে তিনি বিপ্লবী একটি কাজও করিয়াছেন। এই সম্মিলনী উপলক্ষে তিনি তাঁর সুন্দর লম্বা দাড়িটি শেভ করিয়া ফেলিয়াছিলেন। এই ঘটনার পরে আরো পঁচিশ বছর মওলানা সাহেবের সাথে দেখা-শোনা হইয়াছে। ঐ সময় পর্যন্ত তিনি আর দাড়ি রাখেন নাই। মওলানা আজাদের অনুসারী হইয়াও তিনি বাটোয়ার আগে পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেন নাই। বাটোয়ারার পরেও ভারতেই থাকিয়া যান। পরে তিনি কংগ্রেস বিরোধী বামপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহের সমর্থক হন। মাত্র কয়েক বছর আগে তিনি ইন্তেকাল করিয়াছেন।
আমার বন্ধুবর আবুল হায়াত সাহেবকে প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি নির্বাচন করিয়াছিলাম। তিনি খুব উৎসাহী কর্মী ছিলেন। তাঁর উদ্যোগে আমরা কিছু কিছু সাহিত্য সৃষ্টি ও কয়েকটা সভা-সমিতিও করিয়াছিলাম। তৎকালে মুসলিম শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অধিকাংশ এবং ছাত্র-সম্প্রদায়ের প্রায় সকলেই মতবাদের দিক দিয়া মোল্লাকি-বিরোধী হওয়ায় কোনও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান চালাইবার দরকার ছিল না বলিয়াই বোধ হয় আমাদের প্রতিষ্ঠান অল্পবয়সে মারা যায়।
.
৮. মোল্লা-বিরোধের প্রসারিত রূপ
কিন্তু আমার বিরোধিতা ক্রমেই প্রবল হইতে থাকিল। মোল্লা-বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত আমাকে ইসলামের তথা সমস্ত ধর্মেরই আচার-অনুষ্ঠান ও ক্রিয়াকলাপ-বিরোধী করিয়া তুলিল। আমি বুঝিলাম, খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়া আমি যে নামাজ বন্দেগি আবার ধরিয়াছিলাম, সেটা কতকটা রাজনৈতিক ঝোঁকের মাথায়, কতকটা তৎকালীন পরিবেশের সহিত সংগতি রাখার জন্য। আমি অল্পদিনেই আবার নামাজবিরোধী হইয়া উঠিলাম। নামাজবিরোধী যুক্তিগুলি অধিকতর প্রবলবেগে মাথা চাড়া দিয়া উঠে। নামাজ আচারমাত্র। আচারনিষ্ঠা শেষ পর্যন্ত মানুষকে আচার-সর্বস্ব করিয়া তোলে। ধর্মের স্পিরিট বর্জন করিয়া শুধু আচার-অনুষ্ঠান পালন করিলে মানুষ মনের দিক হইতে অধঃপতিত হইতে বাধ্য। আচার-অনুষ্ঠান নিতান্তই দৈহিক। মনের উপর তার কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব নাই। কাজেই যারা বেশি মাত্রায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, তারা আল্লা সম্পর্কে চিন্তা করিবার অবসরই পায় না। অথচ মুসলমানদের মধ্যেই নামাজ বন্দেগির বাড়াবাড়ি সবচেয়ে বেশি। একসময় আমি নিজেই দৈনিক পাঁচ ওয়াকত নামাজ, রাত্রে তাহাজ্জদ ও হরেক রকমের নফল নামাজের জন্য অমুসলমানদিগের নিকট গৌরব করিতাম। এখন আমার মনে হইতে লাগিল, অতিরিক্ত নামাজের বোঝাই মুসলমানদের বুদ্ধির ঘাড় ভাঙ্গিয়াছে। বন্ধুবর আবুল হায়াত বলিতেন : মুসলমানরা সারাদিন নামাজ পড়িতেই ব্যস্ত, কাজ করিবে কখন? আমি তার উপর আরো এক ডিগ্রি চড়াইয়া বলিতাম : মুসলমানরা দিন-রাত নামাজ পড়াতেই ব্যস্ত, খোদাকে স্মরণ করিবে কখন? শ্রদ্ধেয় বন্ধু ইয়াকুব আলী চৌধুরী আমাদের কথায় ব্যথা পাইতেন। তিনি বলিতেন : মসজিদগুলির দিকে তাকাইয়া দেখ, শতকরা পঁচিশ জন মুসলমানও নামাজ পড়ে না। নামাজে যদি অনিষ্ট হইত, তবে শুধু এই পঁচিশ জনেরই হইত। বেনামাজি বাকি পঁচাত্তর জনের তবে উন্নতি হয় না কেন?
