কিন্তু তাবিজ-পানি-পড়াওয়ালাদের ব্যবসা নিছক চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকে না। আরোগ্যের জন্য তাবিজ দিতে দিতে এঁরা শেষ পর্যন্ত আখেরাতের জন্যও তাবিজ দিতে শুরু করেন। স্বাস্থ্য বিক্রয়ের ব্যবসা হইতে প্রমোশন পাইয়া এরা ক্রমে বেহেশত বিক্রয়ের ব্যবসা আরম্ভ করেন। এঁরা নিজেরা বদমায়েশি বুদ্ধি হইতেই যে এই ব্যবসা শুরু করেন, তা নয়। বিশ্বাসপ্রবণ জনসাধারণই এঁদের পীর-ফকির বানাইয়া থাকে। ঘুষখোরদের সম্বন্ধে কথা আছে যে গোড়াতে এরা ভাল মানুষ ছিল। পাবলিকই প্রথমে এটা-ওটা শেষে টাকাপয়সা দিয়া এদেরে খারাপ করিয়াছে। প্রথমে পয়সা সাধিলে প্রথম প্রথম যারা চটিয়া যাইত, পরে তারাই পয়সা দাবি করিয়াছে। না দিলে কাজ করে নাই। কোনও কোনও পীর সম্বন্ধেও এই কথা সত্য। সাধারণ একটা প্রক্রিয়া বা মুষ্টিযোগে দুই-একজন লোক রোগমুক্ত হওয়ার পর হৈচৈ পড়িয়া গিয়াছে লোকটা গায়েবি ঔষধ বা দোওয়া পাইয়াছে। লোকের ভিড় হইয়াছে। সে লোক শাহ-সাব হইয়া গিয়াছে। মানুষ ত মানুষ, গাছ-বৃক্ষ ও নদী পুকুরের পানি পর্যন্ত বুযুৰ্গি হাসিল করিয়া ফেলিয়াছে। পা-ভাঙ্গা একটা গরু গড়াইয়া এক পুকুরে পড়িয়াছিল। গরুটা যখন সাঁতরাইয়া পাড়ে উঠিল তখন দেখা গেল গরুটার পা ভাল হইয়া গিয়াছে। আর যায় কোথায়? ঐ পুকুরের পানি নিবার জন্য লোকের ভিড় হইল। মেলা বসিল। পুকুরের পানি কাদা হইয়া গেল। তবু বুযুৰ্গি কমিল না।
কাজেই আমার দোওয়া-তাবিজের বরকত ঐ ‘ঝড়ে বক মরার থনে একটুকুও বেশি ছিল না। তবু আমার কেরামত বাড়িল। দুই-একজন শুধু তাবিজ, পানি-পড়া নিয়াই সন্তুষ্ট থাকিল না। আমার মুরিদ হইতে চাহিল। পীরগিরি শুরু করিতে উৎসাহ দিল। আমি আঁতকাইয়া উঠিলাম। নিজের জনপ্রিয়তাকে আমি ডরাইলাম। পীরগিরিকে আমি ভণ্ডামি বলি। পীরদেরে আমি ঘৃণা করি। সেই আমিই পীরগিরি করিব? ঘটনাচক্রে এই সময় আমি নিজের গ্রাম ও জিলা ছাড়িয়া কলিকাতা গেলাম। একটা আসন্ন আত্মিক পতনের হাত হইতে বাঁচিয়া গেলাম।
.
৫. নূতন পরিবেশ
কলিকাতা গিয়া দেখিলাম শুধু আমি একার নয়, মুসলিম তরুণ মাত্রেরই মধ্যে একটা চিন্তার বিপ্লব চলিতেছে। যাদের চিন্তার সাথে নিজের চিন্তার ঐক্য দেখিলাম, তাঁদের মধ্যে বিশেষ করিয়া ইয়াকুব আলী চৌধুরী, ডা. লুত্যর রহমান, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মি. এস ওয়াজেদ আলী, আব্দুল মতিন চৌধুরী, মি. আয়েনূল হক খাঁ প্রভৃতির নাম না করিয়া পারিতেছি না। আমার বাল্যবন্ধু শামসুদ্দীন ত ছিলই। মুসলমান সমাজে নবজাগরণ আনা সকলেরই উদ্দেশ্য। কিন্তু তা করা যায় কেমন করিয়া? এককালে বিশ্ব-শাসক মুসলমান কেন আজ অধঃপতিত? জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, কৃষ্টি-সভ্যতায়, শিল্পে-বাণিজ্যে মুসলমানেরা আজ দুনিয়ার সবার পিছনে পড়িয়া কেন? কেন দুনিয়ার চল্লিশ পঞ্চাশ কোটি মুসলমানের মধ্যে একটি শিল্পী, একটি বিজ্ঞানী, একটি আবিষ্কারক নাই? কেন মুসলমানরা সকল ব্যাপারে এমনকি তাদের মাথার টুপি ও জায়নামাজ তৈরির ব্যাপারেও অমুসলমানের উপর নির্ভরশীল? বস্তুত দরিদ্র মেসের ভাঙ্গা চৌকির ময়লা-ছেঁড়া বিছানায় শুইয়া-বসিয়া এমনি ভাবে দুনিয়ার মুসলমানদের ভাগ্য আলোচনা করিতাম। সে আলোচনায় সিদ্ধান্ত এই হইল যে মুসলমানদের বুদ্ধি আড়ষ্ট ও চিন্তা অবরুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। ইসলামের ভাল আদর্শ ত্যাগ করিয়া মুসলমানরা শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই ধর্ম সাধনাকে সীমাবদ্ধ করিয়াছে। নামাজ-রোযাকেই তারা একমাত্র ধর্মকার্য মনে করে। ফলে তারা জ্ঞান লাভের চেয়ে সওয়াব হাসিলের দিকে মন দিয়াছে বেশি। স্কুল-কলেজ স্থাপনের চেয়ে মসজিদ নির্মাণকেই বেশি দরকারি কাজ মনে করিতেছে।
মুসলমানদের এই সার্বিক অধঃপতনের জন্য দায়ী মোল্লারা। তারাই ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া মুসলমান জনসাধারণকে অজ্ঞান ও দারিদ্র্যের মধ্যে ডুবাইয়া রাখিয়াছে। দুনিয়ার ধন-দৌলত কাফেরদের জন্য মুসলমানদের জন্য বেহেশতে বালাখানা ও হুর গিলমান অপেক্ষা করিতেছে, ইত্যাদি কু-প্রচারণা করিয়াই মুসলমানদেরে বিপথগামী করিয়াছে। ও সব ব্যাপারে আমরা প্রায় সবাই একমত ছিলাম। কাজেই সবাই মোগ্লাবিরোধী লেখা চালাইতাম। ডা. লুৎফর রহমান, এস ওয়াজেদ আলী, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আবদুল ওদুদ, হুমায়ুন কবির, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও আমি চুটাইয়া মোল্লাবিরোধী অভিযান শুরু করিলাম। এটাই আমার আয়নার যুগ। সওগাত-এর সম্পাদক মৌ, নাসির উদ্দীন আমাদের পুরা সমর্থক ছিলেন। অতএব সওগাতকে কেন্দ্র করিয়া আমরা একটি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু করিলাম। আমাদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকিলেও ঢাকা হইতে একই সময়ে অধ্যাপক আবুল হোসেন ও কাজী আবদুল ওদুদের নেতৃত্বে শিখা সম্প্রদায় একই আন্দোলন শুরু করিলেন।
আমি কিন্তু শুধু লেখাতেই এই সংস্কার প্রয়াস সীমাবদ্ধ রাখিলাম না। পোশাক-পাতিতে, চালে-চলনেও এই সংস্কার প্রবর্তন করিলাম। দাঁড়িয়ে কেঁচি লাগাইলাম। কোর্তা খাট করিয়া পাঞ্জাবি বানাইলাম। তহবন্দ ফেলিয়া। পায়জামা ধরিলাম। বাবরি কাটিয়া আলবার্ট ফ্যাশন করিলাম।
.
৬. মোল্লাকি-বিরোধী লীগ
কিন্তু তাতেও তৃপ্ত হইলাম না। কতিপয় বন্ধুতে মিলিয়া ‘এন্টি মোল্লা লীগ’ গঠনের সংকল্প করিলাম। এই সময়ে আমি আমার রাজনৈতিক ও সাংবাদিক গুরু মৌ, মুজিবর রহমান সাহেবের দি মুসলমান-এর সহকারী সম্পাদক। স্বনামধন্য মৌ, আবুল কাসেমের কনিষ্ঠ ভ্রাতা মৌ, আবুল হায়াত, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও আবুল কালাম শামসুদ্দিন তখন আমার সহকর্মী। আমরা সকলে মিলিয়া ঐ সংকল্প করিয়া মৌ. মুজিবর রহমান সাহেবকে উহার সভাপতি হইবার অনুরোধ জানাইলাম। আমাদের আদর্শ ও কর্মপন্থার সমর্থন করিয়াও প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত নামে আপত্তি করিলেন। তিনি তখন নিষ্ঠাবান গান্ধীবাদী কংগ্রেসী। কাজে ও চিন্তায় তিনি অহিংসায় বিশ্বাসী। তিনি আমাদেরে বুঝাইলেন, ঐ নামে হিংসা আছে। মোল্লারা ব্যক্তিগতভাবে সমাজের শত্রু নয়; তাদের মোল্লাকিটাই সমাজের শত্রু। যেমন বৃটিশ জাতি আমাদের শত্রু নয়, তাদের সাম্রাজ্যবাদই আমাদের শত্রু। আমরা ইংরাজ জাতকে খতম করিতে চাই না, ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদকেই খতম করিতে চাই। তেমনি আমরা মোল্লাদেরে খতম করিতে চাই না। মোল্লাকি খতম করিতে চাই। আমরা মৌলবী সাহেবের যুক্তির কাছে হার মানিলাম। তাঁর কথামত প্রতিষ্ঠানের নাম রাখিলাম : লীগ এগেনস্ট মোল্লাইযম’। তিনি সভাপতিত্ব গ্রহণ করিলেন। অতঃপর এই নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী সভার আয়োজন করিলাম আলবার্ট হলে।
