.
১৩. এ্যাগনস্টিক
উমেশ বাবুর ঐদিনকার কথায় আমার চিন্তা-স্রোতের মোড় ঘুরিয়া গেল। আমি বুঝিলাম নাস্তিক্যবাদের পক্ষে আমি এতদিন যত কথা বলিয়াছি, যত যুক্তি দিয়াছি, সব ভুল। তার একটারও ভিত্তি নাই। তা যদি না থাকে তবে কী? আল্লাহ আছেন কি নাই, তা আমরা জানি না। জানিতে পারিও না। এই মতে, মানে সন্দেহে, যখন দৃঢ় হইলাম, তখন নূতন চিন্তার সম্মুখীন হইলাম। আচ্ছা না হয়, আল্লাহ আছেন কি নাই, তা লইয়া মাথা ঘামাইলাম না; কারণ মাথা ঘামাইয়া কোনও লাভ হইবে না, বুঝিলাম। কিন্তু চিন্তা যে এখানে আসিয়াই থামিয়া যায় না। আল্লাহ থাকিলেও যখন দূরে আছেন, নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনে যখন তাঁকে পাইতেছি না, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় যখন তাঁর সাক্ষাৎ পাইতেছি না, কাজেই তার কথা না হয় নাই ভাবিলাম। যদিও চিন্তক মন এই নৈরাশ্যবাদকে মানিয়া লইতে চায় না; কোনও একটা বিষয় চিরকাল মানবমনের অগোচরে থাকিয়া যাইবে যদিও মন এটা মানিয়া নিতে চায় না; তবু না হয় ধরিয়া নিলাম, খোদার চিন্তা নাই করিলাম মনকে এ ব্যাপারে চোখ বুজিয়া থাকিতে রাজি করিলাম। কিন্তু আমার নিজের সম্বন্ধে চিন্তা না করিয়া ত পারি না। আল্লাহ নাই না হয় মানিলাম, কিন্তু আমার মন ও আত্মা নাই, এ কথাটা অত সহজে মানিয়া লওয়া যায় না। হিউমের বইয়ে পড়িয়াছি, মন বা আত্মা বলিয়া আমাদের কোনও স্বতন্ত্র সত্তা বা অস্তিত্ব নাই। ডেকার্তে বলিয়াছেন, আমাদের মন ও দেহ দুইটা স্বতন্ত্র বস্তু। দুইটার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই আমাদের জীবন। এই মত লইয়া কোনও রকমে বাঁচা যাইত। কিন্তু হিউম আসিয়া স্পষ্টই বলিয়া দিলেন যে, মন বা আত্মা বলিয়া আমাদের স্বতন্ত্র কোনও অঙ্গ নাই। আমাদের দেহে যে সব ইন্দ্রিয় বা প্রত্যঙ্গ আছে, তাদের অভিজ্ঞতার সমষ্টিকেই আমরা মন বলিয়া জানি। ডেকার্তে বলিয়াছেন : কব্জিটো আরগো সাম আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি। হিউম বলিলেন : আমি বলিয়া কোনও স্বতন্ত্র সত্তা নাই; আমি নামক দেহটির মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, হাত-পা, নাসিকা, জিভ ও চামড়ার বোধ বা অভিজ্ঞতার যোগফলকেই আমরা আমার সত্তা, আমার মন বা আমার আত্মা বলিয়া ভান করিতেছি। আমার দেহের ঐ সব অঙ্গ একটা একটা করিয়া হাঁটিয়া ফেলিলেই বুঝিতে পারিব যে ঐ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের বাইরে মন বা আত্মা বলিয়া কোনও বস্তু নাই।
এটা বড় সাংঘাতিক কথা। আমার প্রেম-হিংসা, স্নেহ-ক্রোধ, মহত্ত্ব নীচতা, দয়া-প্রতিশোধ, সুখ-দুঃখ, আশা-নৈরাশ্য সবই কি তবে ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতামাত্র। ধর্ম না থাকায় আমি বুদ্ধির মুক্তি লাভ করিয়াছিলাম, ভালই হইয়াছিল। আল্লাহ না থাকায় আমার বিশেষ কিছু আসে যায় নাই। কিন্তু এখন যে সব গেল! আমার মন, অন্তর, আত্মা, কিছু যদি না থাকিল, তবে আমার জীবনের সার্থকতা কি? আমার জ্ঞান-বিদ্যা-চৰ্চ্চার অর্থাৎ আমাদের শিল্প-সাহিত্য, দর্শন-বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য কি? এক কথায় মানুষের জীবনই ব্যর্থ ও নিরর্থক হইয়া যায়। মানুষও এক প্রকার জন্তু বটে। কিন্তু তাই বলিয়া তারা কি গরু-বকরির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়? মন-অন্তর-আত্মাই যদি মানুষের না থাকিল তবে সে শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়?
ইম্যানুয়েল কান্টের মত হইতে সান্ত্বনা পাইবার চেষ্টা করিলাম। তিনি লিখিয়াছেন, মানুষের মন ও আত্মা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু আল্লাহকে যেমন আমরা জানিতে পারি না, পারিবও না, তেমনি আমাদের মন ও আত্মাকে আমরা জানিতে পারি না।
ফলে চারি বছরের ঘোরতর নাস্তিক আমি চারি মাসের মধ্যে নাস্তিক্যকে যুক্তিহীন ও ভিত্তিহীন ডগমা বলিয়া বর্জন করিলাম। ফলে আস্তিকও থাকিলাম না। নাস্তিকও থাকিলাম না। যা হইলাম তাকে ইংরাজিতে বলা যায় এ্যাগনস্টিক। বাংলাতে তাকে অজ্ঞেয়বাদী বলা যাইতে পারে। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার বুঝাইতে হইলে বলিতে হয় চিন্তারাজ্যের ত্রিশঙ্কু অবস্থা।
অধ্যায় নয় – প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া
১. খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলন
কিন্তু চিন্তারাজ্যের এই ত্রিশঙ্কু অবস্থা আমার বেশি দিন বরদাশত হইল না। জানি না’ এবং জানা সম্ভব নয় এই ধরনের কথাই আমার ধাতে সহিত না। শৈশবে যখন মুরুব্বিদের কাছে কোনও ব্যাপারে এই ধরনের কথা শুনিতাম, তখন আমি। মনে মনে উহা অগ্রাহ্য করিতাম। তমিয-লেহাযের খাতিরে মুখে মুখে কিছু না বলিলেও মনে মনে জিদ করিতাম, ওটা আমাকে জানিতেই হইবে।
কাজেই আমার শ্রদ্ধেয় গুরুদেব অধ্যাপক ভট্টাচার্যের এবং আমাদের উভয়ের গুরু ইম্যানুয়েল কান্টের অজ্ঞেয়বাদ শেষ পর্যন্ত আমার প্রাণে অশান্তি ও অস্বস্তির আগুন জ্বালাইয়া দিল। আমার চিন্তারাজ্যে অবর্ণনীয় ঝড়-তুফান ও ওলট-পালট চলিতে থাকিল।
এই সময় দেশ খিলাফত ও স্বরাজ আন্দোলনের বন্যায় ভাসিয়া গেল। আমিও ভাসিলাম। এই আন্দোলনের ইনটেলেকচুয়াল দিকটা সহজেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। আমি মহাত্মা গান্ধীর ইয়ং ইন্ডিয়ার গ্রাহক হইলাম। শুরু হইতে উহার লেখা পড়িবার জন্য ব্যাক নাম্বারের কপিগুলির একত্রে বাঁধন কপি কিনিয়া ফেলিলাম। মহাত্মাজীর লেখার মধ্যে আমি খিলাফত স্বরাজ আন্দোলনের আধ্যাত্মিক দিকের সন্ধান পাইলাম। মহাত্মাজীর লেখা ছাড়া এই সময় আমি স্বামী বিবেকানন্দের ও রবীন্দ্রনাথের কতকগুলি লেখা পড়িয়া একদম আকৃষ্ট হইয়া পড়িলাম।
