শেষ পর্যন্ত আমি যখন খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করি, তখন আমি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত মানুষ। এই পরিবর্তন দেহ-মন উভয় দিক থনেই হইয়াছিল। মনের দিককার কথা পরে বলিতেছি। আগে দেহের। কথাটাই বলিয়া নেই।
আমি পোশাকের বাবুগিরি একদম বর্জন করিলাম। খদ্দরের তহবন্দ ও কল্লিদার লম্বা কোর্তা (পাঞ্জাবির চেয়ে বেশি লম্বা বটে, কিন্তু মৌলবী সাহেবদের কোর্তার চেয়ে কম লম্বা) পরিলাম। মাথায় গান্ধী টুপি বসাইলাম। শেভ করা ছাড়িয়া দিলাম। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই চাপদাড়িতে গাল ভরিয়া উঠিল। মোহাম্মদী আলেমদের মধ্যে সুন্নতি বাবরি চুল রাখার রেওয়াজ আছে। আমিও সুন্নতি বাবরি রাখিলাম। সুন্নতি বাবরি মানে ঘাড়ের সমান কাটা বাবরি। হিন্দু-সন্ন্যাসী, মুসলমান শাহ ফকির বা শিখেরা মেয়ে লোকের মত লম্বা চুল রাখিয়া যে ধরনের বাবরি রাখে সুন্নতি বাবরি তেমন নয়। পয়গম্বর সাহেবের সুন্নত বলিয়া কাঁধ সমান উঁচা একটা বাঁশের লাঠিও লইলাম। গান্ধীজির অনুকরণে জুতা ছাড়িয়া প্রথমে খালি পায়ে এবং কিছুদিন খড়ম পায়েই আন্দোলন শুরু করিয়াছিলাম। কিন্তু খড়ম পায়ে বেশি দূর চলাফেরা করা যায় না। অথচ পুরাতন ডার্বি অক্সফোর্ডেও ফিরিয়া যাওয়া যায় না। কাজেই আগাগোড়া সুন্নতি লেবাছের সাথে খাপ খাওয়াইয়া বিহারিদের মত দেলওয়ারী’ জুতা পরিলাম। দেলওয়ারী মানে নাগরা বা সেলিমশাহী নয়। দেলওয়ারী জুতার মাথা চোখাই হউক আর ভোতাই হউক, ওটা লাল চামড়ার হইবে এবং সবুজ চামড়ার মেইন বর্ডার থাকিতে হইবে। আজকাল এ ধরনের জুতা আমার নজরে পড়ে না বলিয়াই এই কথা কয়টা বলা দরকার বোধ করিলাম। এই ভাবে আমি পুরা সুরতি বা পোশাকি মুসলমান হইয়া গেলাম।
.
২. পুনরায় ধর্মে মতি
এইবার দেখা যাক সিরাতে বা চরিত্রে কতটুকু মুসলমান হইলাম। নামাজ রোযা পুরা মাত্রায় শুরু করিলাম ঠিক; কিন্তু এবার নামাজ-রোযাকেই আমি একমাত্র বা শ্রেষ্ঠ এবাদত বলিয়া মনে মনে মানিয়া লইলাম না। নিয়মিত নামাজ-রোযা ধরিলাম নিজের কথা ও কাজে সংগতি রাখিবার জন্য। কংগ্রেস ও খেলাফতের বড় বড় জনসভায় কোরআন-হাদিস হইতে মূল আরবি আয়াত (অবশ্য ছোট ছোট) আবৃত্তি করিয়া বক্তৃতা করিতাম। ছেলেবেলা হইতেই খোশ-ইলহানে দরায় গলায় কোরআনের কেরাত আবৃত্তি করা আমার অভ্যাস ছিল। মাঝখানে চার বছর নামাজ পড়ি নাই, কেরাতও আবৃত্তি করি নাই। অবিশ্রান্ত ফুট ও বাঁশি বাজাইয়া গলা নষ্ট করিয়াছি। কিন্তু স্বরাজ খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়া বিলাসিতার বস্তু হিসাবে ফুট-বাঁশি বর্জন করিয়াছি এবং নিয়মিত নামাজও ধরিয়াছি। এতে আশ্চর্য রকম অল্পদিনে আমার কেরাতি গলা ফিরিয়া আসিল। দুই-এক সভায় মগরেবের নামাজের এমামতি করিয়া নিজের খোশ-ইলহানকে আবার মশহুর করিয়াছিলাম। কাজেই এমামতিতে আমার ডাক পড়িয়া গেল। কিন্তু বুঝিলাম ইলহানই শুধু আসিল, খোশ আর আসিল না। গলা আসিল কিন্তু দায় আসিল না। মুখরেজ-তালাফুযে আমার কাবেলিয়াত আমাদের অঞ্চলের আলেম-ওলামাদেরও জানা ছিল। কাজেই খুব উচা দরজার মওলানা-মৌলবী উপস্থিত না থাকিলে আলেমরাও আমাকেই এমামতি করিতে ঠেলিয়া আগাইয়া দিতেন। অনেক সময় মুকতাদিদের দাবিতেই আলেমরা এই ত্যাগ স্বীকার করিতেন।
স্বরাজ-খেলাফতের বক্তৃতা করিতে করিতে আমি সহবক্তা আলেমদের মত কিছু কিছু ওয়ায-নসিহত করিতাম। এই ওয়াযে আমি আলেমদের মামুলি বক্তৃতার অনুকরণে রোযা-নামাজের কথা বলিতাম না। ছেলেবেলা হইতে আলেম-ফাযেলদের ওয়াযের নিয়মিত শ্রোতা হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা এই যে, আলেমরা যে তাদের ওয়াযে শুধুই নামাজ-রোযা, হজ যাকাতের কথা বলেন, সাধারণ শ্রোতাদের এটা পছন্দ হয় না। একই কথা। একই ধরনে শুনিতে শুনিতে শ্রোতারা ঐ সব ওয়াযে কোনও রস পায় না। ওয়ায শুনিলে সওয়াব হয়, আলেমরা তাদের প্রত্যেক বক্তৃতায়ই কোরআন হাদিস দ্বারা তা প্রমাণ করিয়া থাকেন। শ্রোতারা এসব কথা বিশ্বাস করে। তাই শুধু সওয়াবের আশাতেই শ্রোতারা ওয়াযের মজলিসে বসিয়া থাকে। একটু জ্ঞান হইয়াছে অবধি আমি এই ধরনের ওয়ায না-পছন্দ করিতাম। ব্রাহ্ম ও খৃষ্টান বক্তাদের বক্তৃতার মধ্যে শ্রোতাদের শিখিবার মত অনেক কথা থাকে, এ অভিজ্ঞতা আমার হইয়াছে। শুধু সওয়াবের আশায় নহে, কিছু শিখিবার জন্যও মুসলমান শ্রোতারা ওয়ায শুনুক, এ কথা আমার মনে। আগে হইতেই জাগরূক হইয়াছিল। অনেক আলেম বন্ধুকে আমার মনের কথা বলিয়াছি। শুধু নামাজ-রোযা, হজ-যাকাত ও হায়েয-নেফাসের মসলা মসায়েল না বলিয়া চরিত্র গঠন, সত্য কথন, স্বাস্থ্য পালন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, পরোপকার, নাগরিক কর্তব্য, প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য, ব্যবসা বাণিজ্য, হক-হালাল রুজি-রোযগার ইত্যাদি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে বক্তৃতা করিবার জন্য আমি অনেক মৌলবী বন্ধুকে উপদেশ দিয়াছি। যে কোনও কারণেই হউক, তাঁরা কেউ আমার কথায় কান দেন নাই।
.
৩. ওয়াযে নূতনত্ব
কাজেই খিলাফত স্বরাজের সভা-সমিতিতে আমি নিজেই যখন স্বরাজ স্বাধীনতার কথার সাথে ওয়ায-নসিহত শুরু করিলাম, তখন নিজের বহুদিনের পোষা অভিমতকে নিজেই কাজে লাগাইবার চেষ্টা করিলাম। আমার বক্তৃতায়। শরিয়ত ও মসলা-মসায়েলের কথা খুব কমই থাকিত। ঐ সব ব্যাপারে সামান্য একটু ভূমিকা করিয়াই আমি শ্রোতাদের বাস্তব ও ব্যবহারিক জীবনের কর্তব্যের কথা বলিতে শুরু করিতাম ও চাষবাসের কাজে ব্যাঘাত না ঘটাইয়াও কীভাবে সকল ছেলেমেয়েকেই প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া যায়, তার সহজ ফন্দি-ফিকির বাতলাইতাম। সকল অবস্থার চাষি ভাইরাই যে কাপড়ের খরচা এক পয়সা না বাড়াইয়াও যার-তার বাড়ির মেয়েদেরে কোর্তা পরাইতে পারেন, কাপড়ের গজ ইঞ্চি সিলাইর খরচা হিসাব করিয়া তা বুঝাইয়া দিতাম। বনে-জঙ্গলে ও বাড়ির পিছাড়িতে যেখানে সেখানে পেশাব-পায়খানা না করিয়া সামান্য খরচে কীভাবে পুরুষ ও মেয়েদের জন্য বাড়ির ভিতরে ও বাইরে দুইটি স্বতন্ত্র পায়খানা নিজ হাতে তৈয়ার করা যায়, কাঠ-বাঁশের হিসাব করিয়া তার সহজ সাধ্যতা এবং উপকারিতা বুঝাইতাম। বাড়ির আশেপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করা, পুষ্করিণী, কুয়া-ইন্দারা সাফ রাখা, গোহাল পরিচ্ছন্ন রাখা, বাড়ির ভিতর বাহির উঠান ঝাড়ু দেওয়া, বাড়ির সামনে দু-চারটা ফুলের গাছ ও বাড়ির পিছনে শাক-সবজির গাছ লাগাইবার সহজ উপায় ও উপকারিতা বর্ণনা করিতাম।
