.
১১. মি. ল্যাংলির সহনশীলতা
এ সব কথা অধ্যাপকদের সামনেই বলিতাম। তাদের সঙ্গেও তর্ক করিতাম। অনার্স ক্লাসে অধ্যাপক ল্যাংলি ও ভট্টাচার্যের সঙ্গেই হইত বেশি। ল্যাংলি সাহেব খুব বড় ধার্মিক মানুষ ছিলেন। কিন্তু সহনশীল দার্শনিক মনোভাবও তার ছিল যথেষ্ট। তিনি প্রথম প্রথম আমাকে বুঝাইবার খুব চেষ্টা করিতেন। আমার যুক্তির দুর্বলতা কোথায়, দেখাইয়া দিতেন। কখনও চটিতেন না। কখনও কড়া কথা বলিতেন না। ছাত্রদের নির্বুদ্ধিতার জন্য কস্মিনকালেও তাদেরে মনে কষ্ট দিয়া কথা বলিতেন না। তারা যে নির্বোধ, তাদের মাথায় যে ঘিলু নাই, এমন ধরনের কথা যেত তার মুখ দিয়া আসিতই না। তার প্রশ্নের হাজার ভুল উত্তর দিলেও তিনি বলিতেন না : ‘তোমার উত্তর ঠিক হয় নাই। বরঞ্চ তিনি বলিতেন : ‘তোমার উত্তর যথাস্থানে ঠিকই আছে : কিন্তু আমার প্রশ্ন ওটা ছিল না। ল্যাংলি সাহেবের এই ভদ্রতার নজিররূপে আমরার ছাত্রদের মধ্যে যে উপমাটি প্রচলিত ছিল সেইটিই নমুনাস্বরূপ উল্লেখ করিতেছি। ধরুন, তিনি কোনও ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন : ‘বলো ত একটা মুরগির কতটা পা আছে? জবাবে ছাত্রটি বলিল : একটা ঘোড়ার চারটা পা আছে, স্যার’। ছাত্রদের এই নিরেট মূর্খের মত জবাবে যে কোনও শিক্ষক চটিয়া যাইতেন। কিন্তু ল্যাংলি সাহেব চটিতেন না। তবে কী করিতেন? তিনি বলিতেন : ‘ঘোড়ার পা সম্পর্কে তুমি ঠিকই বলিয়াছ। কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল মুরগির কয়টা পা।
এমন শরিফ ভদ্রলোকের সাথে গরম তর্ক করার উপায় ছিল না। তমিযে লেহাযে তাঁর মত ভদ্র, যবানে তাঁর মত মিষ্টভাষী না হইলে তার সাথে স্বভাবতই তর্ক জমান যাইত না। কিন্তু ল্যাংলি সাহেব শুধু আমাদের দর্শনের শিক্ষক ছিলেন না, ভদ্রতা ও তমিয-লেহাযেরও শিক্ষক ছিলেন। আমার নাস্তিক্য যতই বেপরওয়া ও বেলাগাম হইতে লাগিল, ল্যাংলি সাহেবের স্নেহ আমার প্রতি তত যেন বাড়িতে লাগিল। ডা. মার্টিনোর স্টাডি-অব-রিলিজিয়ন নামে একটা বড় দামি পুস্তক আমাদের অনার্সের পাঠ্য ছিল। এই পুস্তকের পঠিতব্য অংশ ছাড়াও সবটা বই পড়িয়া ফেলিতে তিনি আমাকে উপদেশ দিতেন এবং সত্য-সত্যই পড়িয়াছি কিনা, নানা রকম প্রশ্ন করিয়া তা পরীক্ষা করিতেন। ডা. মার্টিনোকে মি. ল্যাংলি পীরের মত মান্য করিতেন। এটা জানিয়াও আমি ল্যাংলি সাহেবের এক প্রশ্নের জবাবে বলিয়াছিলাম : ডা. মার্টিনো দার্শনিক নন, তিনি আসলে খৃষ্টান পাদরি। এতে ল্যাংলি সাহেব নিশ্চয়ই মনে খুব ব্যথা পাইয়াছিলেন। যিনি জীবনে কাকেও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও কড়া কথা বলেন নাই তিনিই আমাকে শুনাইয়া একদিন বলিলেন : ‘বেকন ঠিকই বলিয়াছেন লিটল লার্নিং ইজ ড্যানজারাস অ্যান্ড লিটল ফিলসফি লিডস টু এথিযম’ অর্থাৎ অল্পবিদ্যা বিপজ্জনক, অল্পদর্শন নাস্তিক্য-জনক।’ কথাটায় আমি মনে কষ্ট পাইব আশঙ্কা করিয়াই বোধ হয় উহার ধার মারিবার উদ্দেশ্যে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বলিলেন : ‘ডোন্ট ওয়ারি অল অ্যাকটিভ মাইন্ডস মাস্ট অব নেসেসিটি পাশ থু দ্যাট স্কেপটিসিযম ইন দেয়ার ইয়ুথ’ অর্থাৎ এর জন্য চিন্তা করিও না। সক্রিয় তরুণ মনে অমন সন্দেহবাদ একবার আসিয়াই থাকে।
যেন নাস্তিক্য একটা রোগ। এই রোগাক্রান্ত হইয়া আমি যেন বাঁচিবার আশা ত্যাগ করিয়াছি। তিনি যেন বড় ডাক্তাররূপে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন : কোনও চিন্তা করিও না। তোমার রোগ সারিয়া যাইবে। বছরের এই ঋতুতে সবারই এই রোগ হইয়া থাকে।
কিন্তু ল্যাংলি সাহেবের চিকিৎসায় আমি ভাল হইলাম না। ডা. মার্টিনোর স্টাডি-অব-রিলিজিয়ন পড়িয়া ধর্মের প্রতি আমার বিরূপ ভাব কমিল না। আল্লার প্রতি আমার মতিগতি বদলাইল না। নাস্তিক্যের প্রতি আমার ঈমান এতটুকু ক্ষুণ্ণ হইল না। বরঞ্চ ডা. মার্টিনোর কোনও কোনও যুক্তি আমাকে সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে আরো শক্ত করিয়া তুলিল।
.
১২. অধ্যাপক ভট্টাচার্য
ল্যাংলি সাহেব যা পারিলেন না; অধ্যাপক উমেশ ভট্টাচার্য তা পারিলেন। তিনি সক্রেটিসের ডায়লেকটিক ম্যাথডে আমার সঙ্গে তর্ক করিয়া অর্থাৎ আমার প্রায় সব কথার সমর্থন করিতে করিতে এক বেকায়দা জায়গায় আনিয়া ফেলিলেন। উমেশ বাবু ডগমা রিলিজিয়ন, এমনকি খোদার সর্বজ্ঞতা ও সর্বশক্তিমানত্বের প্রশ্নেও আমার সহিত একমত হইবার পর অবশেষে অত্যন্ত অকস্মাৎ তিনি বলিয়া বসিলেন : খোদা আছেন এটারও যেমন কোনও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমাণ নাই, খোদা যে নাই তারও কোনও প্রমাণ নাই, কি বল?
আমি হঠাৎ চমকিয়া উঠিলাম। তাই ত। কিসের জোরে আমি খোদা নাই বলিয়া কুঁদিয়া বেড়াইতেছি? আমার পকেটে টাকা বা সিগারেট নাই; ঘরে খাবার নাই, টেবিলে পুস্তক নাই, এসব কথা যেমন নিজের জ্ঞানে বলিতে পারি। সৌরজগতে আল্লাহ নাই, এ কথা কি তেমনি নিজের জ্ঞানে বলিতে পারি? আমাকে চিন্তা করিতে দেখিয়া উমেশ বাবু হাসিলেন। তিনি কান্টের বই হইতে খানিকটা পড়িয়া শুনাইলেন। ওতে লেখা ছিল : আল্লাহ অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়। তিনি মানুষের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের বাহিরে ও উর্ধ্বে বলিয়া কেউ তাঁকে জানেও নাই, জানিতে পারিবেও না। কান্টের উক্তি শেষ করিয়া উমেশ বাবু বলিলেন : তবু কান্ট খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। সব খোদা-বিশ্বাসীরাই না জানিয়া খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে তোমার মত এই না জানিয়া ‘খোদা আছেন’ বলার দরুন এঁদের মতকে যদি যুক্তিহীন ডগমা বলিতে চাও, তবে তুমি যে না জানিয়া ‘খোদা নাই’ বলিতেছ, এটা ত সেই কারণেই যুক্তিহীন ডগমা।
