.
৯. খোদা-বিশ্বাস বনাম ধর্ম-বিশ্বাস
কিন্তু আসল কথা এই যে আমি তখনও নাস্তিক হই নাই। ধর্মবিরোধী অর্থাৎ লৌকিক ধর্মবিরোধী হইয়াছি মাত্র। তৎকালে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলিলেই লোকেরা তাকে নাস্তিক বলিত। ধর্ম ও আল্লাকে তারা একই বস্তু মনে করিত। সুতরাং যে ধর্ম মানে না, সে আল্লাকেও মানে না। এই ছিল সাধারণ জনমত। কিন্তু কৌতুকের বিষয় এই যে, ধর্ম মানে এখানে তারা শুধু নিজেদের ধর্ম মনে করিত। আল্লা ও ধর্ম যে এক, সেটা অন্য কারো ধর্ম নয়, আমাদের ধর্ম। কাজেই মুসলমান যদি হিন্দু ও খৃষ্টানের, হিন্দু যদি মুসলমান খৃষ্টানের অথবা খৃষ্টান যদি হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মের নিন্দা করে, তবে সেটা নাস্তিকতা হইবে না। এ কথার সোজা অর্থ এই যে আমার ধর্ম ছাড়া আর গুলি আসলে ধর্মই নয়। কাজেই ওগুলিতে অবিশ্বাস করিলে বা ওদের নিন্দা করিলে তাতে সৃষ্টিকর্তা অসন্তুষ্ট হইবেন না। বরঞ্চ উল্টা ঐগুলিকে নিন্দা না করিলেই তিনি অসন্তুষ্ট হইবেন। তার মানে আমারটাই আল্লার একমাত্র ধর্ম। আর গুলি সব জাল। ধার্মিকেরা একবার ভুলক্রমেও বলেন না, নাস্তিকের চেয়ে খোদা-বিশ্বাসী ভাল, অতএব আমার ধর্মে বিশ্বাস না হয়, অন্য ধর্মে বিশ্বাস কর; তবু সৃষ্টিকর্তার প্রতি ঈমান আন। না, না, এ কথা বলা চলিবে না। বরঞ্চ নাস্তিক থাক তা-ও ভাল। তবু আমার ধর্ম ছাড়া অপরের ধর্মে বিশ্বাস করিও না। ছেলেবেলা চাচাজীর কাছে যা শুনিয়াছিলাম তা আজও সত্য। তিনি বলিতেন: হানাফীরা হিন্দুর চেয়ে বদতর। হানাফীরা যে আল্লা, রসুল, নামাজ, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি ইসলামের সবগুলি মূলনীতিতে বিশ্বাসী তাতেও চাচাজী সন্তুষ্ট নন। তাঁরা যে বুকের উপর তহরিমা বাধিয়া জোরে ‘আমিন’ কয় না, এতেই তারা প্রতীক পূজক বহু ঈশ্বরবাদী হিন্দুর চেয়ে বদতর হইয়া গেল। চাচাজীর কথা : ‘যদি মুসলমান হইতে চাও তবে আমাদের মত মোহাম্মদী হও; যদি মোহাম্মদী না হও তবে তোমার মুসলমান হওয়ার কোনো সার্থকতা নাই; তুমি বরঞ্চ হিন্দুই থাক।’ এটা করটিয়ার জমিদার হাফেয মোহাম্মদ আলী সাহেবেরও কথা। অবশ্য প্রচলিত গল্পটি যদি সত্য হইয়া থাকে।
ঠিক তেমনি ধার্মিকেরা বলে, আমার ধর্মে যারা বিশ্বাস করে না, তারা। ‘নাস্তিকোঁসে বদ্তর হ্যায়’। চাচাজীর কথা অনুসরণ করিয়াই তারা বলে : যদি ধর্মবিশ্বাসী অর্থাৎ খোদা-বিশ্বাসী হইতে চাও, তবে আমার ধর্মে ঈমান আন। যদি তা নাই পার, তবে নাস্তিকই থাক।
.
১০. নাস্তিকতা
ধার্মিকদের চিন্তায় ও কথায় এই স্ববিরোধিতা দেখিয়া আমি নিজের মনেই হাসিতাম। স্বল্প বুদ্ধিতার জন্য ওদের উপর কৃপা হইত। কিন্তু তাদের কথা সত্য হইতে বেশি দিন লাগিল না। ধর্মে অবিশ্বাসী হইয়া আমি বেশি দিন। খোদার উপর ঈমান রাখিতে পারিলাম না। তখন দর্শনের ক্লাসে পড়া দেকার্তে, স্পিনোযা, মিল, বেনথাম, কোতে, লক, হিউম, কেন্ট, হেগেল আমার মাথায় গজগজ করিতেছে। আমি প্রথমে পার্সিমনি-অব-লজিক বা ন্যায়শাস্ত্রের বখিলির সূত্র দিয়া আল্লার সর্বজ্ঞতা, সর্বশক্তিমানত্ব ও সর্বব্যাপিতা খণ্ডন করিতে লাগিলাম। তর্কশাস্ত্রের বখিলি ব্যাপারটা এই যে আপনি কোনও কিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত করিবার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু অনুমান করিতে পারিবেন না। ধরুন লংক্লথের একটা পায়জামার দাম আপনি আজকালের বাজারেও দশ টাকার বেশি অনুমান করিতে পারেন না। সে জায়গায় আপনার পরনের পাজামাটি দেখিয়া যদি আমি বলি : আমি অনুমান করি, এটা বানাইতে দশ হাজার টাকা খরচ পড়িয়াছে; কিম্বা যদি বলি : আমার মনে হয় কলিকাতার মাস্টার টেইলার বরকতুল্লা এই পাজামাটা সিলাই করিয়াছে তবে এই দুইটা কথাই পার্সিমনি-অব-লজিক-এর খেলাফ হইবে। কারণ ঐ পাজামা বানাইতে প্রথম শ্রেণীর লংক্লথেও দশ টাকার বেশি খরচ পড়িতে পারে না; এবং ইসলামপুর-নবাবপুরের যে কোনও সাধারণ দর্জি এই পায়জামা সেলাই করিতে পারে। তেমনি, একটি কাঁচা-ভিটির বাঁশ ছনে দুচালা ঘর দেখিয়া যদি আমি বলি : তাজমহলের কারিকর বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি ইসমাইল খাই নিশ্চয় এই ঘরটি বানাইয়াছে, তবে এটাও পার্সিমনি অব-লজিক সূত্রের খেলাফ হইবে।
চিন্তার এই সূত্র ধরিয়া ধর্ম বিরোধ হইতে অতি সহজেই খোদা বিরোধে পৌঁছিলাম। মুসলমান হিসাবে এক আল্লা-বিশ্বাসী। সে আল্লা-বিশ্বাসী, সে আল্লা নিরাকার, নিরঞ্জন, সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান। এমন সর্বব্যাপী এক আল্লা হইতে প্রথমে সুফিবাদের দিকে মন ধাবিত হইল। মনসুর হাল্লাজের ‘আনাল হক’ (আমি’ই হক), উপনিষদের ‘অহংব্রহ্ম’ খুবই আকর্ষণীয় মনে হইল। স্পিনোযা ও লাইবনিজের নিয়ম (অদ্বৈতবাদ) ও প্যাথিযম (সর্বেশ্বরবাদ, মায়াবাদ) আমার চোখে খুব উঁচুদরের তত্ত্বদর্শন ছিল। এর সঙ্গে সুফীবাদ, অদ্বৈতবাদের মিল দেখিয়া আমি খুবই চমৎকৃত হইলাম। এইভাবে নিরাকার সৃষ্টিকর্তা হইতে ‘আনাল এক’-এ ‘অহংব্রহ্মবাদের ভিতর দিয়া প্রথম মায়াবাদ বা প্যাথিযম ও পরে মনিযম এবং আরো পরে নিরীশ্বরবাদের দুর্নিবার যুক্তির খাদে পড়িতে আমার বেশি সময় লাগিল না।
সূত্রের এই দৃষ্টান্ত হইতে আমি বলিতে লাগিলাম : রোগ, শোক, ঝড়, ভুইকাপ, বন্যা, মহামারি ও দুঃখ-দারিদ্র্যপূর্ণ অসুন্দর এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তারূপে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ও কল্যাণময় একজন আল্লা-ভগবান অনুমান করা যুক্তিসহ ও ন্যায়সম্মত নয়। আমি বন্ধুদেরে চোখে আঙ্গুল দিয়া কলেজ প্রাঙ্গণের আমগাছগুলি দেখাইয়া দিতাম। দেখ, দেখ, ফায়ুন মাসে এইসব গাছ বউলে ঝুঁকিয়া পড়ে, মনে হয় লক্ষ কোটি আম হইবে। কিন্তু চৈত্র-বৈশাখে সেইসব বউল ঝরিয়া পড়ে, থাকে মাত্র এক কুড়ি আম। পাড়াগাঁয়ের খালে-বিলে-পুকুরে গিয়া দেখ একটা মাছ কমসে কম লক্ষ পোনা ছাড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাচ্চা মাছ থাকে মাত্র কুড়ি-পঁচিশ, বড় বড় হয় মাত্র দশ-পনেরটা। এসব কাজ দক্ষ নিপুণ সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাজ হইতে পারে? একটা পাকা মালি এক সাজি ফুল দিয়া কুড়ি মালা গাঁথিবে। কোনও আনাড়ির হাতে পড়িলে একটি মালা গাঁথিতেই সাজির ফুল খতম। প্রকৃতির এই অপব্যয় অনিয়ম ও অশৃঙ্খলা কদাচ সর্বজ্ঞ ও অন্তর্যামী আল্লার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। জ্ঞানের দিক দিয়া যা, শক্তির দিকেও তাই। আল্লার সর্বশক্তিমানত্ব চ্যালেঞ্জ করিয়া বলিতে লাগিলাম : খোদা কি এক সঙ্গে এই দরজাটা খোলা ও বন্ধ রাখিতে পারেন।
