আমার কানকে আমি বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। এই আঠার-উনিশ বছরের যুবকের জন্য নামাজ ফরয হয় নাই? আমি কি ভুল শুনিলাম? সন্দেহ নিরসনের জন্য আবার বলিলাম : কী কইলেন?’ যুবক তার কথার পুনরাবৃত্তি করিলেন। আমি বলিলাম, সাত বছর বয়স হোতেই যে নামাজ ফরয হয়।
যুবক কিছুমাত্র অপ্রস্তুত না হইয়া বলিলেন : জি হাঁ সে কথা ঠিক। কিন্তু আমার নামাজ যে আল্লার দরগায় কবুল হৈব না।
আমি আরো বিস্মিত হইয়া বলিলাম : কেন? আপনার অপরাধ?
যুবক বিনা-সংকোচে বলিলেন : আমি যে আজও পীরের মুরিদ হৈতে পারি নাই।
আমি স্তম্ভিত হইলাম। মুরিদ না হইতে পারার কারণ সম্বন্ধেও যুবক আরো কিছু বলিয়াছিলেন। কিন্তু সে সব কথা আমার কানে ঢুকিল না। আমি নিজের কাজে চলিয়া গেলাম। অনেক দিন আমার মন হইতে এই চিন্তা দূর হইল না। হায়, পুতুল-ভাঙ্গা ইসলামের এই দুর্দশা মুসলমানেরই হাতে?
.
৭. ধর্ম-মত বনাম চরিত্র
কিছুদিন আগে হইতেই আল-ইসলাম নামক বাংলা মাসিক ও ইসলামিক রিভিউ ও রিভিউ-অব-রিলিজিয়ন নামক ইংরাজি মাসিক কাগজ নিয়মিত পড়িতে শুরু করিয়াছি। এই সব কাগজে বড় বড় পণ্ডিত ও আলেম লেখকের লেখার মধ্যে একটি কথা আমার খুব পছন্দ হইয়াছিল। সেটা এই যে সব ইসলাম ধর্মের অনুসারীরাই ইসলামের আসল শিক্ষা হইতে দূরে সরিয়া পড়িয়াছে। মুসলমানদের কাজকর্ম, চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্র যে আমাদের ভাল লাগে না, তার জন্য ইসলাম দায়ী নয়, দায়ী আমাদের ভুল ব্যাখ্যা।
কিন্তু বেশিদিন এই কৈফিয়তে সন্তুষ্ট থাকিতে পারিলাম না। প্রথমত সব ধর্মের পক্ষ হইতেই এ ধরনের কথা বলা হইতেছে। দ্বিতীয়ত ভয়ানক ধার্মিক, ভয়ানক শরিয়তের পা-বন্ধ, সাংঘাতিক নামাজি লোককেও আদর্শ চরিত্রবান, সত্যবাদী ও পরোপকারী হইতে দেখি না কেন? তৃতীয়ত হিন্দু, ব্রাহ্ম ও খৃষ্টানদের মধ্যে এমন আদর্শ চরিত্রবান সত্যবাদী ও স্বার্থত্যাগী লোক দেখিয়াই শুধু মুসলমান নন বলিয়াই তারা বেহেশতের বদলে দোযখে যাইবেন, এই কথাটা কিছুতেই আমার মন মানিত না। ময়মনসিংহের ডা. বিপিন সেনের মত ত্যাগী ও পরোপকারী ব্রাহ্ম, আমার অধ্যাপক উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের মত হিন্দু ও আমার অধ্যাপক মি. ল্যাংলির মত খৃষ্টান দোযখে যাইবেন। আর আমার চিনা-জানা দু-একজন মওলানা-মৌলবী সাহেবের মত মিথ্যাবাদী, মামলাবাজ ও নাবালক ভাতিজাদের সম্পত্তি অপহারক মুসলমান বেহেশতে যাইবে, এটা আমার বিবেকে বাধিত। চতুর্থত, সব ধর্মই যার-তার মতে মানুষের কল্যাণের জন্য একযোগে চেষ্টা না করিয়া যার-তার শ্রেষ্ঠত্ব, যাহির করিবার জন্য এত চেষ্টা-তদবির, এত প্রচার-প্রচারণা, এত অর্থ ব্যয় করিতেছে কেন? ইসলামিক রিভিউ ও আল-ইসলাম-এর পাশে পাশে এই সময় আমি খৃষ্টান মিশনারীদের প্রকাশিত এপিফেনি নামক কাগজ পড়িতাম এবং সদরঘাটে অবস্থিত ব্যাপটিস্ট মিশন হলে বক্তৃতা শুনিতে ও বই সংগ্রহ করিতে যাইতাম। সময়ের মধ্যেই ম্যাট্রিক পাশ করিবার সময় একবার ও আইএ পাশ করিবার সময় আরেকবার চামড়ার বাধানো সুন্দর কাগজে ছাপা দুইখানা বাইবেল এই মিশন হইতে উপহার পাইয়াছিলাম। এই প্রচারণার সমস্ত ব্যাপারটাই আমার কাছে ব্যবসাদারি বলিয়া মনে হইল। এই সময় হাকিমী চিকিৎসা ভাল কি কবিরাজী চিকিৎসা ভাল, এই বিষয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও হ্যান্ডবিলে খুব বাদ-বিতণ্ডা চলিতেছিল। ‘জিস্তান’, ‘সুশীল মালতী’ প্রভৃতি সুগন্ধি পানের মসল্লা চা’র ছোট ছোট প্যাকেটও এই সময় বিনা মূল্যে বিতরণ করা হইত। ধর্মপ্রচার ও এই সব ঔষধপত্রের প্রচারের মধ্যে আমি কোনও পার্থক্য দেখিতে পাইলাম না।
.
৮. সব ধর্ম সত্য, না সব ধর্ম মিথ্যা?
দুই-তিন বছর আগে ভাবিতাম, সব ধর্মই সত্য হইতে পারে। এখন ভাবিতে শুরু করিলাম সব ধর্মই মিথ্যাও হইতে পারে। সিদ্ধান্তে পৌঁছিতে বেশি দিন লাগিল না। দর্শনের অনার্স ক্লাসে বড় বড় দার্শনিকের নাম শুনিয়া কলেজ লাইব্রেরিতে তাঁদের বই-পুস্তক পড়িতে লাগিলাম। গভীর অধ্যয়নের সময়ও ছিল না, সম্ভবও ছিল না। ভাসা-ভাসা পড়িয়াই বড় দার্শনিক তত্ত্ব সম্বন্ধে নিজস্ব অর্থ করিয়া বসিলাম। লৌকিক ধর্ম ও আসল ধর্মের পার্থক্য আমার সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমি বুঝিলাম আল্লার গুণাবলির অনুকরণে সদগুণের অধিকারী হওয়ার নামই ধর্ম। সেটা করিতে গিয়া কোনও লৌকিক ধর্মের নিয়মাবলি মানিয়া চলার দরকার নাই। মানুষ নীতিমান হইলেই ধার্মিক হইল। যেসব লৌকিক ধর্ম মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, এগুলি ব্যবসাদারী ডগমা মাত্র। খোদাকে মূলধন করিয়া এরা এক-একটা ব্যবসা ফাঁদিয়াছে মাত্র। সৃষ্টিকর্তার নিজের মুখের বাক্য বলিয়াও যে সব কিতাব চালু আছে, সেগুলির মধ্যে যুগোপযোগী ভাল-মন্দ কথা আছে বটে কিন্তু ওগুলি আসলে খোদার মুখের কথাও নয় এবং সে কারণেই ওগুলি চিরকালের উপযোগীও নয়। সৃষ্টিকর্তার অবতার পুত্র বন্ধু বলিয়া যেসব ধর্ম প্রবর্তক দাবি করিতেছেন, তাদের দাবি ঠিক নয়। এই সব সিদ্ধান্ত করিয়া সমস্ত লৌকিক ধর্মের বিরুদ্ধে পাইকারি হারে কঠোর কঠোর উক্তি করিতে লাগিলাম। সহপাঠী ও বন্ধুরা আমার কথা শুনিয়া কেউ কানে আঙুল দিল, কেউ শিহরিয়া উঠিল, কেউ মারমুখী হইল। মারিল না কেউ। কিন্তু সবাই আমারে নাস্তিক আখ্যা দিল। হিতৈষীরা আমার আখেরাতের চিন্তায় আকুল হইল। বক ধার্মিকেরা আমাকে হোস্টেল হইতে বাহির করিয়া দিবার জন্য সুপার আসাদ সাহেবকে চাপ দিতে লাগিল। আসাদ সাহেব কি ভাবিয়া আমাকে তাড়াইলেন না, প্রিন্সিপালের কাছে আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করিলেন না। কিন্তু মিলাদ প্রভৃতি বার্ষিক অনুষ্ঠান হইতে আমাকে বাদ দিলেন।
