.
৫. কবর-পূজা
‘নামাজ পড় আর না পড়, পীর মানিতেই হইবে’ এই ধরনের মতবাদ তখন হানাফী সম্প্রদায়ের এক অংশে খুবই চালু ছিল। আমরা মোহাম্মদীরা এমনিতেই পীর মানি না, তার উপর আমি সম্প্রতি ধর্মের সত্যতায়ই সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছি। কাজেই এই সময়কার আমার মতবাদ হানাফী জনসাধারণের, এমনকি শিক্ষিত সম্প্রদায়েরও সহ্য করিবার কথা নয়। আমার এই মতবাদ কাজেই একবার আমাকে বিপদে ফেলিয়াছিল। আমি হাকিম আরশাদ সাহেবের বাড়িতে যায়গীর থাকাকালে আলিমুদ্দীন সাহেব নামক জনৈক শিক্ষকের নেতৃত্বে একবার নৌকাভ্রমণে যাই। ছাত্র-বন্ধুদের মধ্যে মি. রেজাই করিম তার এক ভাই আবদুল করিম, মি. ইউসুফ সালাহউদ্দিন তার ভাই সালেহউদ্দিন প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নৌকাভ্রমণ উপলক্ষে নদীর ধারে অবস্থিত মিরপুরে পীরের দরগা যিয়ারত করা হয়। আমি যিয়ারত করি। যিয়ারত শেষ করিয়া নৌকায় ফিরিয়া বন্ধুরা পীর সাহেবের কাছে কে কী মুকসেদ চাহিয়াছেন, তার খবর-পুরসি শুরু করেন। সকলেই যার-তার মুকসেদের কথা বলেন। কিন্তু আমি কিছু বলি না। কাজেই আমাকে সবাই ধরেন, আমি কি চাহিয়াছি বলিতে হইবে। সকলের পীড়াপীড়িতে আমি বলিলাম : ‘পীর সাহেবের গোনা-খাতা মাফ করবার লাগি আল্লাহর দরগায় মুনাজাত করছি। আমার এই কথা শুনিয়া সকলে ত আমাকে মারে আর কি? পীর সাহেবের শানে এত বড় কথা! তাঁর গোনা-খাতা? সকলেই ভদ্র বংশের ভদ্রলোকের ছেলেপিলে। কাজেই সত্য-সত্যই আমাকে মারপিট করিলেন না। কিন্তু ঐ বেতমি কথা প্রত্যাহার করিবার জন্য জিদ করিলেন। আমি প্রত্যাহার করিলাম না। বরঞ্চ নিজের উক্তির সমর্থনে বলিলাম : এই যে আপনারা আল্লার কাছে মকসুদ চাইয়া পীর সাহেবের নিকট চাইলেন, এই যে পীর সাহেবের মাজারে মাথা কুটিয়া দৈনিক হাজার লোক শেরক করিতেছে, এই যে পীর সাহেবের কবর যিয়ারতের ওসিলায় হররোজ আল্লার হুকুমের বরখেলাফ করিতেছে, তাতে লোকেরার ত গোনাহ হইতেছেই, পীর সাহেবেরও হইতেছে। যার কবরে এমন শেরেকি হয়, আল্লার দরগায়ে তিনিও নিশ্চয়ই গোনাগার। তাই আমি পীর সাহেবের মাগফেরাত চাহিয়া মোনাজাত করিয়াছি।
আমার জবাবে বন্ধুরা স্তম্ভিত হইলেন। মেহেরবানি করিয়া তাঁরা আমাকে নৌকা হইতে ফেলিয়া দিলেন না। কালবিলম্ব না করিয়া নৌকা ফিরাইতে মাল্লাকে আদেশ দিলেন। আমার সাহচর্যে তারা যেন আর এক মুহূর্ত থাকিতে রাজি ছিলেন না। বাকি পথ তারা আমার সাথে কোনও কথা বলিলেন না। হাকিম সাহেবের কাছে আমার এই ধর্মবিরোধী বতমিজির খবর পৌঁছিল। আমার যায়গীর উঠাইয়া দিবার চাপ তার উপর পড়িল।
কিন্তু হাকিম সাহেব জানিতেন আমরা মোহাম্মদী। তিনি বহুদিন আগে হইতেই আমাদের গ্রামে যাতায়াত করিতেন। আমাদের গ্রামের অনেকেরই তিনি চিকিৎসা করিয়াছেন। গ্রামের বিভিন্ন মাতব্বরের বাড়িতে তিনি। একনাগাড়ে সপ্তাহের বেশি সময় থাকিয়াছেন। কাজেই তার কাছে এটা জানাই ছিল যে আমি ও আমার আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী সকলেই গোড়া মোহাম্মদী এবং আমরা পীর-পূজা, গোর-পূজার ভয়ানক বিরোধী। কাজেই হাকিম সাহেব ঐ চাপে টলিলেন না। তিনি শুধু গোপনে আমাকে উপদেশ দিলেন একটু সাবধানে কথাবার্তা বলিতে।
.
৬. পীর-পূজা
একশ্রেণীর মুসলমানের পীরভক্তি এই সময় এমন চরম সীমায় উঠিয়া ছিল যে, উহা স্পষ্টতই ইসলামের মৌলিক শিক্ষার বিরোধী। এই শ্রেণীর মুসলমানের কথাবার্তায়, কাজে-কর্মে আল্লার পানা না চাহিয়া পীর সাহেবদের পানা চাহিতেন। যেমন তারা ‘ইনশাহ আল্লাহ এই কাজ করিব’, ‘খোদার ফযলে ভালই আছি’, ‘আল্লার মর্জিতে এটা হইয়াছে, ইত্যাদি না বলিয়া হুযুর পাকের ইচ্ছা হইলে এ কাজ করিব’, ‘হুযুর কেবলার মেহেরবানিতে ভালই আছি’, ‘খাজাবাবার দোওয়াতে এটা হইয়াছে’ ইত্যাদি বলিতেন। মোট কথা, এঁরা যার-তার পীর সাহেবদেরে দিয়া আল্লার জায়গা দখল করাইয়াছিলেন। এই পীর-পূজার চরম দৃষ্টান্ত দেখিয়াছিলাম, এস এম হোস্টেলে থাকিবার সময়। আমার পাশের রুমেই চাঁদপুরের একজন ছাত্র থাকিতেন। আইএ সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। বয়স আঠার-উনিশ। চেহারা-ছবিতে এবং চাল-চলনে ভদ্র পরিবারের ছেলে। রোজ সকালে তার খোশ-ইলহানের কোরআন তেলাওয়াত শুনিয়া আমাদের ঘুম ভাঙ্গিত। কোনও কারণেই তার এই কোরআন তেলাওয়াত কামাই হইত না। অথচ এই ভদ্রলোক নামাজ পড়িতেন না। নামাজ আমিও পড়িতাম না। আলসামি করিয়া পড়িতাম না, তা নয়। নামাজ পড়ার আমি বিরোধীই ছিলাম। ছাত্র-বন্ধুদের মধ্যে নামাজের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করিতাম। সে জন্য কলেজের আরবির প্রফেসার এবং হোস্টেল সুপার অধ্যাপক এ এম আসাদ সাহেবের কাছে কয়েকবার ধমক খাইয়াছি। কিন্তু নামাজবিরোধী প্রচার বন্ধ করি নাই। কাজেই কথিত ভদ্রলোকের নামাজ না পড়ায় আমার খুশি হইবার কথা। কিন্তু খুশি হওয়ার বদলে আমি দুঃখিত হইলাম। যিনি কোরআন তেলাওয়াত করিবেন, তিনি নামাজ পড়িবেন না কেন? রোজ নিয়মিতভাবে কোরআন তেলাওয়াত করার মত দৃঢ় ধর্ম-বিশ্বাস যার, আলসামি করিয়া তিনি নামাজ তরক করিবেন, এটা আমার বরদাশত হইল না। আলসামিকে আমি দুচক্ষে দেখিতে পারিতাম না।
কাজেই আমি তাঁকে তাঁর এই আলস্যের কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। এবং তাঁর জবাবের অপেক্ষা না করিয়া আলসামির নৈতিক ও দৈহিক কুফল বর্ণনা করিয়া বক্তৃতা শুরু করিয়া দিলাম। বক্তা, সাহিত্যিক উপরের ক্লাসের ছাত্র বলিয়া ভদ্রলোক আমাকে সম্মান করিতেন। কাজেই আমার কথায় তিনি চোখে-মুখে বাধা দিলেন না। আমি আমার কথার মাঝে একটু দম নিতেই তিনি বলিলেন : কিন্তু আমি ত আলসামি কইরা নামাজ তরক করি না। নামাজ আমার লাগি ফরযই হৈছে না।
