.
৩. খৃষ্টান
হযরত ঈসা পয়গাম্বরের উম্মত বলিয়া এই সময় খৃষ্টানদের সম্বন্ধে আমার কৌতূহল বাড়ে। ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের গেটের পাশে এখনও যে ‘গসপেল হল’ আছে সেখানে প্রতি রবিবার প্রার্থনা ও বক্তৃতা হইত। প্রতি সন্ধ্যায় হলের সামনে টুলের উপর দাঁড়াইয়া মিশনারীরা বক্তৃতা করিতেন। রোজ এঁদের বক্তৃতা শুনিবার জন্য আসিতাম কিন্তু এঁদের বক্তৃতা ভাল লাগিত না বলিয়া বেশিক্ষণ থাকিতাম না। কিন্তু যেদিন ইংরাজ পাদরি বক্তৃতা করিতেন, সেদিন বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিতাম। বক্তৃতা ভাল লাগিত বলিয়া নয়। ইংরাজ সাহেব বাংলায় বক্তৃতা করিতেছেন, তাই শুনিবার জন্য। ওদের মুখে বাংলা কথা আমার বড় ভাল লাগিত।
কিন্তু একবার এক খৃষ্টান পাদরির বক্তৃতা সত্যই ভাল লাগিয়াছিল। ইনি ছিলেন রেভারেন্ড ফাদার এ ডি খা। ইনার বক্তৃতার ব্যবস্থা হইয়াছিল টাউন হলে। এই উপলক্ষে টাউন হল বিশেষভাবে সাজান হইয়াছিল। জিলা ম্যাজিস্ট্রেট, জিলা জজ ও পুলিশ সাহেব প্রভৃতি সমস্ত ইংরাজ কর্মচারী এই সভায় যোগ দিয়াছিলেন। তা ছাড়া শহরের সমস্ত গণ্যমান্য লোকও উপস্থিত ছিলেন। রেভারেন্ড ফাদার এ ডি খা টাঙ্গাইল মহকুমার এক মুসলমান ভদ্র পরিবারের লোক। তাঁর নাম আলাউদ্দিন খাঁ। তিনি ছেলেবেলায় খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং স্বীয় প্রতিভা বলে খৃষ্টান ধর্মযাজক সমাজে এত উন্নতি করেন। গসপেল হল হইতে বিজ্ঞাপন আকারে আগেই এ সব খবর প্রচার করা হইয়াছিল বলিয়া আমি প্রবল আগ্রহে এই সভায় যোগদান করি। হলে তিল ধারণের স্থান ছিল না। ছাত্রদের দাঁড়াইয়া বক্তৃতা শুনিতে হইল। আমিও দাঁড়াইয়াই শুনিলাম। তিনি অবশ্য বেশিক্ষণ বক্তৃতা করিলেন ইংরাজিতে। ইংরাজি বক্তৃতা আমি তেমন ভাল বুঝিলাম না। কিন্তু বাংলায় তিনি যতটুকু বলিলেন, তা আমার খুব ভাল লাগিল। তিনি অন্যান্য মিশনারীর মত অন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু না বলিয়াই শুধু খৃষ্টান ধর্মের গুণাবলি বয়ান করিলেন।
এই সব নাম করা লোকের বক্তৃতা শুনিয়া শুনিয়া আমার ক্রমেই মনে হইতে লাগিল সব ধর্মের মধ্যেই অল্প-বিস্তর সত্য ও সৌন্দর্য রহিয়াছে। এই ধারণা পল্লবিত হইয়া শেষ পর্যন্ত আমার মধ্যে পরস্পর-বিরোধী মত দেখা দিল। সব ধর্মের সত্য আছে, সব ধর্মই মানুষের কল্যাণ চায়। তবু কেন এক ধর্ম আরেক ধর্মের নিন্দা করে? তবু কেন এক ধর্ম আরেক ধর্মকে মিথ্যা বলে? ধর্মে ধর্মে কেন এই বিরোধ? মানুষের কল্যাণ করার মত পবিত্র কাজ করিতে গিয়াও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন? এটা ত নিতান্ত ব্যবসাদারের মত কাজ।
.
৪. নামাজ-রোযার শিথিলতা
যখন আমার মনে ধর্ম সম্পর্কে এই আলোড়ন চলিল, তখন নামাজ-বন্দেগিতে আমার আর উৎসাহ থাকিল না। আস্তে আস্তে নামাজ-রোযা ছাড়িয়া দিলাম। টুপি ফেলিয়া দিলাম। যাত্রা-থিয়েটার দেখিতে লাগিলাম। গান-বাজনা শুনিতে থাকিলাম। এই পরিবর্তন আমার মধ্যে এত তাড়াতাড়ি হইয়া গেল যে, আমার সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবরা অবাক হইয়া গেল। কিন্তু বাড়িতে মুরুব্বিরা। আমার এই পরিবর্তন টের পাইলেন না। দাদাজী তখন এন্তেকাল করিয়াছেন। সুতরাং তাঁর ভয় নাই। বাপজীও দাদাজীর মতই উদার, তাঁকেও ভয় নাই। শুধু চাচাজীকেই সবচেয়ে ভয় পাইতাম। কিন্তু ভয়ে নয়, মুরুব্বিদের প্রতি বিশেষত বাপ-মার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধায় আমি বাড়িতে আমার মুসল্লী মুত্তাকিগিরি পুরামাত্রায় বজায় রাখিলাম। বাপজী-মার, বিশেষ করিয়া মার মনে কষ্ট দেওয়া আমার কল্পনারও বাহিরে ছিল। আমি এটা কিছুতেই বরদাশত করিতে পারিতাম না। তারা মনে কষ্ট পাইবেন, শুধু এ ভয়েই আমি বাড়িতে এসব করিতাম। শহরে যে আমি নামাজ-রোযা করিতাম না, এ খবর যাতে বাপজী ও মার কানে না যায়, সেদিকে সতর্ক থাকিতাম। গ্রীষ্ম ও পূজার লম্বা ছুটিতে সহপাঠী ও অন্যান্য বন্ধুদের বাড়িতে দল বাঁধিয়া বেড়ান তৎকালে ছাত্রদের মধ্যে রেওয়াজ ছিল। এই উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে যেসব ছাত্র বন্ধু বেড়াইতে আসিত তাদেরে আগে হইতে আমি সাবধান করিয়া দিতাম।
এইভাবে কিছুকাল চলিবার পর আমি যখন আইএ পড়িবার জন্য ঢাকায়। আসিলাম, তখন আমি পুরামাত্রায় বে-নামাজি হইয়া গিয়াছি। আইএ পড়াকালে আমি যখন হাকিম আরশাদ সাহেবের বাড়িতে যায়গীর থাকিতাম, তখন রাতে শুইতাম চুড়িহাট্টা মসজিদে। মসজিদের একটি কামরায় আমার বিছানাপত্র ও বাক্স-আদি থাকিত। বই-পুস্তক যদিও থাকিত হাকিম সাহেবের বাড়িতে, কিন্তু কার্যত আমি মসজিদেরই একজন বাসিন্দা। তবু আমি এক ফযর ছাড়া অন্য ওয়াকতের নামাজ পড়িতাম না। ফযরটা না পড়িয়া উপায় ছিল না।
জগন্নাথ কলেজের দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন বাবু উমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য। তিনি আইএতে আমাদের লজিক পড়াইতেন। তাঁর বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ জিলার নেত্রকোনা মহকুমায়। এই খাতিরে আমি তার কাছে ভিড়িয়া পড়িলাম। তাঁর ক্লাসে ভাল করিলাম। তিনি সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর লেখা দার্শনিক প্রবন্ধটি মাসিক কাগজে ছাপা হইতে আগেই দেখিয়াছি। আমার কয়েকটা লেখা ইতিপূর্বেই মাসিক কাগজে বাহির হইয়াছে। আমি কলেজে শুধু ‘আহমদ’ বলিয়া উমেশ বাবু অবশ্য সে খবর রাখিতেন না। আমি নিজেই একদিন তাঁকে জানাইয়াছিলাম। এই সব কারণে উমেশ বাবু আমাকে একটু বিশেষ খাতির করিতেন। আমি লজিকের পাঠ্যবই ডিঙ্গাইয়া দর্শনের বই পড়িতে শুরু করি। জন স্টুয়ার্ট মিল, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, হীরেন দত্ত, ব্ৰজেন শীল, এ্যানি বেসান্ত প্রভৃতি দার্শনিক লেখকের লেখা এই সময় আমি খুব পড়িতাম এবং মাঝে মাঝে উমেশবাবুর কাছে বুঝিতে যাইতাম। এইভাবে উমেশ বাবু আমার মধ্যে স্বাধীন চিন্তার উন্মেষ করেন এবং আমার মনকে সংস্কারমুক্ত করিয়া তুলেন।
