মওলানা সাহেবদের সবারই চোখ পানিতে ছলছল করিয়া উঠিল, আমারও। একজন চেয়ার ছাড়িয়া আমার দিকে আগাইলেন। আমার পায়ের দিকে হাত বাড়াইলেন। আমি পা সরাইয়া নিলাম। তিনি কদমবুছির ভঙ্গিতে নিজের মুখে বুকে হাত লাগাইয়া বলিলেন : আপনে পীর-মুর্শেদ, আপনের বাতেনি নামাজ আল্লার দরবারে কবুল হইয়া গিয়াছে। যাহেরি নামাজের আপনের দরকার নাই।
আমি সবিনয়ে বলিলাম : আমার সম্বন্ধে মুবালেগা করিয়া আমারে আরো বেশি গোনাগার করিবেন না। শুধু দোওয়া করিবেন, আল্লাহ যেন আমার ঈমান শক্ত রাখেন।
মওলানা সাহেবরা সত্য-সত্যই হাত উঠাইয়া দোওয়া করিলেন।
অধ্যায় আট – গোঁড়ামির প্রতিক্রিয়া
১. উদারতার ক্রমপ্রসার
আগের অধ্যায়ের শেষ দিকে যেসব ঘটনার কথা বলা হইয়াছে, সেগুলি ছাত্রজীবনের পরে কর্মজীবনের কথা। এখন ছাত্রজীবনেই আবার ফিরিয়া যাই। মজিদ সারের সংশ্রব আমার গোঁড়ামির বরফে উদারতার উত্তাপ লাগাইয়া দিল। আমার গোঁড়ামি প্রথমে আস্তে আস্তে ও পরে দ্রুত গলিতে লাগিল। অবশেষে গোঁড়ামির জায়গা উদারতা দখল করিল।
উদারতার বুক প্রশস্ত ও বাহু লম্বা। সে বুকে একজনকে নিতে পারিলে আরেকজনকেও নিতে হয়। সে বাহু একজনকে জড়াইয়া সন্তুষ্ট থাকে না। দশজনকে ধরিতে চায়। মজিদ সারের উদারতার ছোঁয়াচে আমার মন যখন আমার এতদিনের দুশমন হানাফীকে ভালবাসিতে পারিল, তখন উদারতা ও ভালবাসার পরিধি আর একটু বাড়িয়া অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়কেও ভালবাসিতে পারিবেন না কেন?
আমার মনও তা পারিল। প্রথমে ব্রাহ্ম, তারপর খৃষ্টান ও তারও পরে হিন্দুকে সে উদারতার পরিধির মধ্যে জায়গা দিল। উক্ত ক্রমে পরিধি বাড়িল কেন, সে কথাই এখন বলিতেছি। ব্রাহ্মরা এক খোদা মানে, লোকমুখে এই কথা শুনিয়া ব্রাহ্মদের সভায় বক্তৃতা শুনিতে যাইতে লাগিলাম। ময়মনসিংহ স্টেশন রোডে গাঙ্গিনার পাড়ে এখন ব্রাহ্মমন্দির নামে যে দালানটি আছে এবং যাতে বর্তমানে ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল চলিতেছে, এটি তখনও ছিল এবং সত্যই ব্রাহ্মমন্দির ছিল। সেখানে প্রতি সপ্তাহেই সভা হইত। বিশেষ করিয়া মহোৎসবের সময় কলিকাতা হইতে বড় বড় নামকরা বক্তা আসিতেন। এঁদের বক্তৃতা কখনও আমি বাদ দিতাম না। এঁদের মধ্যে সঞ্জীবনী সম্পাদক শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মিত্র ও প্রবাসী সম্পাদক শ্রীযুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কথা আমার মনে আছে। কৃষ্ণকুমার বাবুর বক্তৃতা আমার খুব পছন্দ হইয়াছিল। বোধ হয় এই সময়েই কৃষ্ণকুমার বাবুর মোহাম্মদ চরিত পড়িয়াছিলাম।
.
২. ডা. বিপিন বিহারী সেন
ডা. বিপিন বিহারী সেন ও শ্রীযুক্ত মনোরঞ্জন ব্যানার্জী তখন ব্রাহ্ম সমাজের দুই প্রধান ছিলেন। ক্লাস সেভেনে পড়িবার সময় যখন সেহড়া কাঁঠাল লজে’ থাকিতাম তখন এই দুই ভদ্রলোকের সাথে প্রায়ই দেখা হইত। তাঁদের বাড়ির সামনে দিয়াই আমাদের স্কুলে যাতায়াতের পথ ছিল। ডা. বিপিন সেন বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন। মনোরঞ্জন বাবু সিটি স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ছিলেন। ডাক্তার বাবুর বাগানওয়ালা বিরাট বাড়ি ছিল। সেই বাগানে ডা. সেন ও মিসেস সেনকে প্রায়ই দেখিতাম। রাস্তার পাশের ডুয়ার্ক ওয়ালের উপর দিয়া তাঁদেরে দেখা যাইত। বাগানে দাঁড়াইয়া ডাক্তার বাবু স্কুলে-গমনরত আমাদের কুশল-মঙ্গল জিজ্ঞাসা করিতেন। তাঁর মুখ সব সময় হাসি-হাসি থাকিত। কাজেই রোজ দেখা হইলেই আদাব দিতাম। তিনি ত আদাব লইতেনই। মিসেস সেনও আমাদের আদাব লইতেন। প্রথম প্রথম অবশ্য আমি ডাক্তার বাবুকে উদ্দেশ্যে করিয়াই আদাব দিতাম। বেগানা আওরতকে আদাব দেওয়া বা তার দিকে চোখ তুলিয়া চাওয়া আমাদের কল্পনার বাহিরে ছিল। বিশেষত ঐ সময়ে মিসেস সেন ছাড়া আর কোনও মেয়েলোককে বাহিরে দেখি নাই। কাজেই মিসেস সেনের দিকে চোখ তুলিয়া চাইতে শরম লাগিত। কিন্তু ডাক্তার সেনকে আদাব দেওয়ার সময় তিনিও যেভাবে আমাদের আদাব নিতেন, তাতে আস্তে আস্তে আমার লজ্জা কাটিয়া গেল। তখন মিসেস সেনকে একা দেখিলেও আদাব দিতাম। তিনি হাসি মুখে হাত তুলিয়া আদাব নিতেন। কিন্তু কথা বলিতেন না। সে সময় ব্রাহ্ম মেয়েরাও ব্রাহ্মমন্দিরের সভায় যাইতেন। মিসেস সেনও যাইতেন। মেয়েদের বসিবার জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। মিসেস সেনও সেখানে বসিতেন। তবু গেটে বা রাস্তায় মিসেস সেনের সঙ্গে দেখা হইয়া গেলে, সেখানেও তাঁকে আদাব দিতাম। এইটুকু পরিচয়েই মহিলাকে আমার এত ভাল লাগিয়া ছিল যে, এর পর মাত্র কয়েক মাস পরে যখন মিসেস সেনের মৃত্যুসংবাদ পাইলাম, তখন নিজের অজ্ঞাতে আমার চোখে পানি আসিয়া পড়িয়াছিল। ডা. ও মিসেস সেনের প্রতি শ্রদ্ধাহেতুই হউক, আর কৃষ্ণবাবুর বক্তৃতা শুনিয়াই হউক, অথবা কৃষ্ণবাবুর মোহাম্মদ চরিত পড়িয়াই হউক, আমি ব্রাহ্মদের প্রতি বেশ আকৃষ্ট হইয়া পড়িলাম। এই সময় গিরিশ সেনের বঙ্গানুবাদ কোরআন ও অপসমালা পড়িয়া সে আকর্ষণ আরো বাড়িল। হোস্টেলেও স্কুলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তর্ক করিতে গিয়া আমি ব্রাহ্মগণকে মুসলমান বলিয়া দাবি করিতাম। নিজের মতে নিঃসন্দেহ হইবার জন্য চাচাজীকে জিজ্ঞাসা করিলাম। চাচাজী হানাফীদের প্রতি নিষ্ঠুর হইলেও অমুসলমানদের প্রতি খুবই উদার ছিলেন। আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলিলেন : শুধু ব্রাহ্ম বৈলা নয়, যেকোনো লোক আল্লার ওয়াহাদানিয়াত (একত্ব) স্বীকার করে, সেই মুসলমান। চাচাজীর মত পাইয়া আমি এ বিষয়ে আরো শক্তিশালী হইলাম।
