উদ্যোক্তা মওলানা সাহেবরা আমার সম্মতির অপেক্ষা করা নিরাপদ মনে করেন নাই। আমার শাসনভার তাঁরা নিজেদের হাতেই নিয়াছিলেন। সভাস্থলে আসরের আওয়াল ওয়াকতে পৌঁছিলাম। গিয়াই দেখিলাম সভামঞ্চের অদূরে আমার অযুর জন্য এক বদনা পানি, একটা জলচৌকি ও একখানা তোয়ালিয়া রাখা হইয়াছে। প্রধান উদ্যোক্তা মওলানা সাহেবের দিকে চাহিলাম। তিনিও হাসিলেন, আমিও হাসিলাম। চোখ ইশারায় জানাজানি হইয়া গেল, আজ আর ছাড়াছাড়ি নাই। কোনও অজুহাতেরই সম্ভাবনা বা ঘেঁদা রাখা হয় নাই। তখন মোটামুটি জনতা বেশ বড় হইয়াছে। কজন আযান দিতে লাগিলেন। তিনজন মওলানা আমাকে অযু করিতে বলিয়া ঘাড়ের উপর দাঁড়াইয়া থাকিলেন যেন আমি ফাঁক পাইলেই পালাইব। আমি মোহাম্মদী কায়দায় ধীরে ধীরে অযু করিতে লাগিলাম। তাতে বেশ দেরি হইতে লাগিল। ওদিকে নামাজের কাতার খাড়া হইয়া গেল। ঐ অঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বজ্যেষ্ঠ আলেম এমামরূপে দাঁড়াইয়া গেলেন। আমার পাহারা-বন্ধুদের তিন-চারটা তাগাদায় আমি অবশেষে যখন অযু শেষ করিলাম, তখন নামাজ শুরু হইয়া গিয়াছে। আমরা সকলের পিছনের কাতারে দাঁড়াইলাম। মওলানা বন্ধুরা আমার দুই পাশে দাঁড়াইলেন আমি যাতে কাতার হইতে ভাগিয়া না যাই। আমি পাক্কা মোহাম্মদী কায়দায় দুই পা ফাঁক করিয়া দাঁড়াইলাম। দুই হাত চিৎ করিয়া কাঁধ পর্যন্ত তুলিলাম এবং সিনা টান। করিয়া বুকের উপর তহরিমা বাধিলাম। আর কথা নাই! দুই পাশের দুই আলেম বন্ধু নিজেরা নিয়ত ছাড়িয়া দিলেন। আমার তহরিমা বাঁধা হাত দুইটা সজোরে টানিয়া খুলিয়া ফেলিলেন এবং আমাকে টানিয়া পার্শ্ববর্তী ঝোঁপের একটা গাছতলায় নিয়া আসিলেন। হাঁপাইতে-হপাইতে বলিলেন : আপনে যে ও জিনিস, তা জানিতাম না। আপনার আর নামাজ পড়িবার দরকার নাই। এইখানে বসিয়া আপনি বিড়ি খাইতে থাকেন। আমরা একটা অজুহাত দিয়া দিব।
তাঁরা নিশ্চয়ই ভাল অজুহাত দিয়াছিলেন। কেউ আমার নামাজ না পড়ার খোঁজও করিলেন না। খুব ভাল ও সফল মিটিং হইল। আমার বক্তৃতা খুব জমিল। মগরেবের পরেও অনেকক্ষণ বক্তৃতা করিলাম। মগরেবের নামাজও আমার পড়িতে হইল না।
.
১৩. আমার জবাব
সভা তুখার জমিয়াছিল। আমার বক্তৃতাও খুব জোরদার হইয়াছিল। প্রমাণ, নির্বাচনে ঐ অঞ্চলে ভোট অনেক বেশি পাইয়াছিলাম। যা হোক, সভা শেষে মওলানা সাহেবরা আমাকে স্টেশন পর্যন্ত আগাইয়া দিতে আসিলেন এবং আমার টিকেটসহ নিজেদেরও টিকেট কাটিলেন। ময়মনসিংহ শহরে আমার বাসা পর্যন্ত আসিলেন। সারা রাস্তায় একটা কথাও বলিলেন না।
অত রাত্রে চারজন মেহমানের খানা বাসায় ছিল না। কাজেই বিবি সাহেব আমাদেরে চা দিয়া রান্নায় লাগিলেন। চা খাওয়া শেষ হইল। আমি হুঁক্কা টানিতে লাগিলাম। মওলানা সাহেবরা যেন কত বড় গোপন কথা বলিতেছেন, এমনিভাবে অত রাত্রেও একবার দরজার দিকে একবার জানালার দিকে চাহিলেন। তারপর একাধিকবার গলা কাশিয়া একজন বলিলেন : উকিল সাহেব, আমাদের বে-আদবি মাফ করিবেন, কিছু মনে করিবেন না। আপনার মত এক বড় জ্ঞানী-গুণী, এত বড় সাহিত্যিক, জনসাধারণের এত বড় নেতা লা-মযহাবী, এটা যে আমরা কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না।
আমি এক-এক করিয়া সকলের মুখের দিকেই তাকাইলাম। সত্যই ভদ্রলোকদের মুখে বিষাদের ছায়া। কত বড় ব্যথাই না তাঁরা পাইয়াছেন। আমিও তাদের বিষাদের অনুকরণে মুখ বিষণ্ণ করিয়া বলিলাম : আপনাদের চোখকে অবিশ্বাস করিবার কোনও কারণ নাই। আমি সত্যই লা-মযহাবী। এতে কি আমার প্রতি আপনাদের আস্থা কমিয়া গেল? আমার কথা বাদ দেন, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের প্রতি আপনাদের দরদ এর পরেও থাকিবে ত? আমার অপরাধে আপনারা কৃষক প্রজা পার্টি ছাড়িবেন না ত?
ভদ্রলোকেরা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতে পারিলেন না। প্রায় মিনিটখানেক পরে তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় জন খুব গোছাইয়া মিষ্টি ভাষায় বলিলেন : আমাদের জন্য চিন্তা করিবেন না। আমরা অতটা ফ্যানাটিক নই। কিন্তু এটা জানাজানি হইয়া গেলে ত আর রক্ষা থাকিবে না।
আমিও সমান উদ্বেগ দেখাইয়া বলিলাম : এখন উপায় কী?
ভদ্রলোকেরা কোনও জবাব দিলেন না। একদৃষ্টে করুণ চোখে আমার দিকে চাহিয়া রহিলেন। অগত্যা আমি বলিলাম : এর মাত্র দুইটা উপায় আছে। একটা, আমার মোহাম্মদী মযহাব ছাড়িয়া হানাফী মাযহাব এখতিয়ার করা। এটা আমি পারি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, পৈতৃক ধর্মই মানুষের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ধর্মের খুঁটি। এটাকে নৌকার নঙ্গর বলিতে পারেন। ইংরাজিতে এটাকে মুরিং বলা হয়। এই খুঁটি একবার ফসকাইলে কোনও ধর্মের ঘাটেই আপনি স্থায়ী হইতে পারিবেন না। যে পৈতৃক হানাফী মত ছাড়িয়া মোহাম্মদী বা মোহাম্মদী মত ছাড়িয়া হানাফী হইতে পারে সে ইসলাম ছাড়িয়া খৃষ্টধর্ম, খৃষ্টধর্ম ছাড়িয়া বৌদ্ধধর্ম এবং সব ধর্ম ছাড়িয়া মানবধর্মও গ্রহণ করিতে পারেন। তার চেয়ে বরঞ্চ আল্লা আপনারে যে ধর্মে সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই ধর্মে থাকিয়াই ধর্ম সাধনা করুন না। আল্লা আপনাকে খারাপ জায়গায় পয়দা করিয়াছেন, আল্লার প্রতি এই অবিশ্বাস কেন হইবে আপনার? তিনি কি ভুল করিতে পারেন? তিনি যে আলেম-উল-গায়েব, তিনি যে অন্তর্যামী। তিনি যে দেশে যে ধর্মে আপনারে পয়দা করিয়াছেন, সেখানেই আপনার কর্তব্যও রাখিয়াছেন। এটা আমি বিশ্বাস করি। কাজেই ভাই সাহেবান, আপনারা বুঝতেছেন, আমার পক্ষে বাপের মযহাব ছাড়া সম্ভব নয়। কাজেই আমি দ্বিতীয় উপায় অবলম্বন করিয়াছি। এই জিলার পঞ্চাশ লক্ষ মুসলমান কৃষক-প্রজার মধ্যে চল্লিশ লক্ষই হানাফী। আপনারা বলিয়াছেন, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের নেতা লা-মযহাবী, এটা জানাজানি হইয়া গেলে আর রক্ষা থাকিবে না। তাই আল্লার সাথে আমার একটা ফয়সলা হইয়া গিয়াছে। আমি নামাজ পড়িলে কৃষক-প্রজা আন্দোলনের, তার মানে এ জিলার পঞ্চাশ লক্ষ, তথা বাংলার চার কোটি কৃষক-প্রজার মুক্তির আন্দোলনে ব্যাঘাত হইবে। অতএব আল্লার অনুমতি লইয়া আমি ঠিক করছি আমি নামাজ না পড়িয়া দুখেই যাব। নিজের একার বেহেশতের জন্য কোটি কোটি লোকের অনিষ্ট হইতে দিব না।
