দাদাজীর এই ধরনের উদারতার অর্থ মজিদ সারের সাথে মিশিবার পর আমার কাছে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হইয়া উঠিল। আমি দ্বিধা-সন্দেহের মাঝে কাল কাটাইতে লাগিলাম। মজিদ সারের সংসর্গ ও আমাদের হোস্টেলের পরিবেশ আমাকে ক্রমে উদার করিয়া তুলিল। আমাদের হোস্টেলে সুপার ছিলেন তৎসময়ের জিলা স্কুলের হেডমৌলবী মৌ. আলী নেওয়াজ সাহেব। তিনি মযহাবী কলহের বিরোধী ছিলেন। তা ছাড়া আঞ্জুমনে ওলামায়ে বাঙ্গলার দুইজন খ্যাতনামা আলেম আমাদের হোস্টেলে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। একজন মওলানা খোন্দকার আহমদ আলী আকালুবী, অপরজন মওলানা মযাফফর উদ্দিন আহমদ। মওলানা মাফর উদ্দিনের বাড়ি ছিল ঢাকায়। তিনি আঞ্জুমনের প্রচার উপলক্ষে ময়মনসিংহ আসিলে আমাদের হোস্টেলে মেহমান হইতেন। আর মওলানা আকালুবী সাহেব ময়মনসিংহ জিলার লোক। তার সাতটি শ্যালক এক সঙ্গে এই হোস্টেলে থাকিতেন। তার মধ্যে একজন পরবর্তীকালে হাইকোর্টের জজ হইয়াছিলেন। তিনি ছিলেন জাসটিস বদিউজ্জামান। যা হোক সাত শালার খাতিরেই হউক আর আঞ্জুমনের প্রচার উপলক্ষেই হউক তিনি প্রায়ই আমাদের হোস্টেলে আসিতেন। মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মওলানা মো. আকরম খাঁ প্রভৃতি যারা আঞ্জুমনে ওলামার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন, মওলানা আকালুবী ছিলেন তাঁদের অন্যতম। হানাফী-মোহাম্মদী মযহাবী কলহ দূর করা ছিল এই আঞ্জুমনের অন্যতম উদ্দেশ্য। মওলানা আকালুবী সাহেবের নাম আমরা অনেকেই আগে হইতে জানিতাম। তাঁর শুভ জাগরণ নামক কাব্যগ্রন্থ রাজদ্রোহ অপরাধে বাযেয়াফত হওয়ায় ইতিমধ্যেই তার নাম দেশময় ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সুবক্তা হিসাবেও তাঁর খুবই খ্যাতি ছিল। তাকে চোখে দেখিয়া আরো খুশি হইলাম। দুধে আলতা গৌরবর্ণ সুডৌল চেহারা মুখ ভরা বিরাট চাপ দাড়ি, হাসি-মুখ, মিষ্ট ভাষা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করিল। তিনি ইসলামের সৌন্দর্য বুঝাইতে গিয়া প্রসঙ্গক্রমে মযহাবী বিরোধের অযৌক্তিকতা আমাদেরে বুঝাইয়া দিলেন। তিনি নিজে মোহাম্মদী। কিন্তু তার শ্যালকরা হানাফী এই খাতিরে তিনি উদারতা প্রচার করিতেছেন বলিয়া আড়ালে সিনিয়র ছাত্ররা হাসি-তামাশা করিলেও তার যুক্তিগুলির অকাট্যতা সকলেই স্বীকার করিতেন। ফলে আমাদের হোস্টেলের ভিতরে হানাফী-মোহাম্মদী মত-বিরোধটা আস্তে আস্তে নিভিয়া গেল। তার ফলে আমার মনেও উদারতা দেখা দিল। না দিলে চলে না। কারণ সবাই উদার। আমি একা অনুদার থাকিলে কেমন দেখায়?
.
১২. মযহাবী সংকীর্ণতা মরিয়াও মরে না
আমাদের জিলায় এই মযহাবী সংকীর্ণতা কতটা কায়েমী মোকরররী হইয়াছিল, তার প্রমাণ পাইয়াছিলাম উপরোক্ত ঘটনার পঁচিশ বছর পরে ১৯৩৭ সালে। তখন কৃষক-প্রজা আন্দোলন খুব জনপ্রিয়। ময়মনসিংহ জিলা কৃষক-প্রজা সমিতি সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আমি এই সমিতির সেক্রেটারি। জিলার প্রজা আন্দোলনের আমি নেতা। বাংলা আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ মার্টির বিরুদ্ধে নির্বাচন যুদ্ধ করিতেছি। খান বাহাদুর শরফুদ্দীন, খান বাহাদুর নূরুল আমিন প্রভৃতি বড় বড় নেতা আমাদের বিরুদ্ধ পক্ষ। গরীব কৃষক প্রজা-কর্মী লইয়া এই সব ধনী ও ক্ষমতাশালী লোকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতেছি। আমি জিলার কৃষক প্রজা পার্টির নেতা বলিয়া লীগ পার্টির সোজাসুজি আক্রমণটা আমারই বিরুদ্ধে। আমার আয়নার অনেক কপি লীগ পার্টি হইতে ক্রয় করিয়া মুসলমানদের মধ্যে বিশেষত আলেম ও পীরদের মধ্যে বিতরণ করিয়া আমাকে মুসলমান ভোটারদের কাছে অপ্রিয় করা এবং তাতে পরোক্ষভাবে কৃষক প্রজা পার্টিকে দুর্বল করাই উদ্দেশ্য। কৃষক প্রজা পার্টির কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে বহু আলেম-ওলামা ছিলেন। তাহারা স্বভাবত আমার জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ রাখিবার চেষ্টা করিতেন। এটা করিতে গিয়া আমাকে তারা পাক্কা মুসলমান বলিয়া চিত্রিত করিতেন এবং আয়নার লেখাগুলির ব্যাখ্যা করিয়া নির্দোষ প্রমাণ করিতেন। কিন্তু একটা ব্যাপারে তারা লা-জবাব হইতেন। আমি তখন ঘোরতর বেনামাজি ছিলাম। ঘোরতর বেনামাজি মানে আমি সভা সমিতিতেও নামাজ পড়িতাম না। বাড়িতে নামাজ পড় আর না পড় সভা সমিতিতে বিশেষত ইলেকশনী সভায় পলিটিক্যাল নামাজ পড়া পলিটিশিয়ানদের চিরদিনের নীতি। অন্তত এই কাজ করিতে আলেম বন্ধুরা অনেক দিন আমাকে পীড়াপীড়ি করিয়াছেন। আল্লার ডরেই যখন পড়ি না, তখন মানুষের ডরে পড়িব? এই বলিয়া অনেকবার মৌলবী সাহেবদেরে নিরস্ত করিলাম।
কিন্তু নান্দাইল থানার এক সভায় তা পারিলাম না। এখানে সংগ্রাম বড় কঠিন। মুসলিম লীগ প্রার্থী ডিবি চেয়ারম্যান খান বাহাদুর নূরুল আমিন। আর তার মোকাবিলায় আমাদের প্রার্থী গরীব প্রাইমারী মকতবের শিক্ষক আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরী। সেদিনকার মিটিংটা হইবে নূরুল আমিন সাহেবের হোম থানা নান্দাইলের আলেম-প্রধান জায়গা শাহগঞ্জে। এই অঞ্চলের কৃষক প্রজা আন্দোলনের প্রধান নেতা মওলানা বোরহান উদ্দিন কামালপুরী আমাকে আগেই জানাইয়াছিলেন, এই একটি গ্রামেই ত্রিশজনের বেশি মাদ্রাসা-পাশ ও দেওবন্দ-পাশ মওলানা আছেন। এঁরা যেদিক সমর্থন করিবেন, নির্বাচনে তাদের জিত অবধারিত। এই মিটিংয়ের উদ্যোক্তারাও সকলেই মৌলবী-মওলানা। কাজেই এঁরা আগেই আমাকে বলিয়া রাখিয়াছিলেন, এখানকার সভায় আমাকে নামাজ পড়িতেই হইবে। নইলে নির্বাচনে আমাদের চান্স অন্ধকার।
