এতক্ষণে ভদ্রলোক আমার দিকে স্নেহ-ভরা দৃষ্টিতে চাহিলেন। হাত ধরিয়া টানিয়া আমাকে নিজের পাশে দাঁড় করাইলেন। নিজের নামাজ শুরু করিলেন। তার নিরাপদ পাশে দাঁড়াইয়া আমি নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে নামাজ পড়িলাম। ইচ্ছার বিরুদ্ধে মনে মনে সারাক্ষণ আমি আল্লার চেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানাইলাম এই ভদ্রলোককে।
নামাজ শেষে ভদ্রলোক আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। আমি পরম বিনয়ের সাথে পরিচয় দিলাম। তারও পরিচয় পাইলাম। তিনি জিলা স্কুলের শিক্ষক মৌ. শেখ আবদুল মজিদ। তার নাম আমি আগে হইতেই জানিতাম। তিনি সাহিত্যিক। শিক্ষা প্রচার বা এই গোছের নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করিতেন তিনি। সারা শহরের মুসলিম ছাত্রদের তিনি ছিলেন প্রিয় ‘মজিদ সার’। মুসল্লিদের উপর প্রভাবের কারণও বুঝিলাম। সারা জিলার মুসলমানদের একচ্ছত্র নেতা উকিল পাবলিক প্রসিকিউটর (পরে খান বাহাদুর) মৌ. মোহাম্মদ ইসমাইল সাহেবের প্রিয় সহচর ছিলেন এই মজিদ স্যার। যে স্কুলেরই ছাত্র হউক, মুসলমান ছেলেরা তাঁকে এক ডাকে চিনিত। সবাই তাকে মান্য করিত এবং ভালবাসিত।
অল্পদিন মধ্যেই আমিও তার একজন ভক্ত অনুচর হইলাম। সাহিত্য সেবায় তাঁর প্রেরণা পাইয়াছিলাম অনেকখানি ত বটেই মযহাবী উদারতাও শিখিয়াছিলাম নিশ্চয়ই। কারণ কিছুদিন মধ্যেই আমি বুঝিতে পারিলাম মজিদ সারের উদারতা ও মহানুভবতার খাতিরেই বোধ হয় তহরিমা বাঁধিবার সময় হাত দুইটা বুকের উপর অতিরিক্ত মাত্রায় ঠেলিয়া উঁচায় তুলিতে গিয়া কেমন যেন বাধ-বাধ ঠেকিত। মজিদ সারের উদার হাসিমাখা মুখ আমার চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিত। হাত দুইটা যেন অবশ হইয়া বুক হইতে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামিয়া আসিত।
.
১০. দাদাজীর উদারতা
এর পরেও মজিদ সারের উদারতা ও তার কথাগুলি আমার বুকে খোঁচাইয়া চলিল। এই মযহাবী কলহ মুসলমানদের আত্মঘাতী অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং এটাতে মুসলমানরা দুর্বল হইতেছে; মজিদ সারের এই কথাটা কি সত্য নয়? চিন্তা করিতে লাগিলাম। এত দিনে মনে পড়িল দাদাজীর মুখেও যেন এই ধরনের কথা শুনিয়াছি। দাদাজী উম্মী মানুষ, লেখা-পড়া জানিতেন না। কিন্তু তিনি জ্ঞানী ছিলেন। অনেক আলেম-ওলামা ও শিক্ষিত লোকও দাদাজীর জ্ঞান বুদ্ধির তারিফ করিতেন এবং জটিল-জটিল প্রশ্নে দাদাজীর উপদেশ মানিয়া চলিতেন। মজিদ সারের মত শিক্ষিতের ভাষায় ঐ সব কথা তিনি নিশ্চিয়ই বলেন নাই। কিন্তু তিনি যা বলিতেন মজিদ সারের কথার সাথে অর্থের দিক দিয়া তার আশ্চর্য মিল আছে। কথা ছাড়াও কাজে-কর্মে দাদাজী আশ্চর্য রকম উদার ছিলেন। দাদাজীও পাক্কা মোহাম্মদী ছিলেন বটে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে হানাফী মযহাবের বড় কোনও আলেম আসিলে তাকে জুম্মার বা ঈদের নামাজে এমামতি করিতে দিতেন। চাচাজী এতে ঘোরতর অসন্তুষ্ট হইতেন। কিন্তু দাদাজী তাঁর মত অগ্রাহ্য করিতেন। শুধু শর্ত করিতেন, হানাফী মওলানা সাহেবকে কয়েকটি ব্যাপারে মোহাম্মদী মতে নামাজ পড়াইতে হইবে শুধু মুকতাদীদের সুবিধার জন্য। যথা : সুরা ফাতেহার শেষে কেরাত শুরু করিবার আগে মুকতাদীদেরে ‘আমিন’ বলিবার সময় দিয়া অল্প দম নিতে হইবে। প্রথম রেকাত হইতে দ্বিতীয় রেকাতে উঠিবার সময় বসিয়া লইতে হইবে। ঈদের জমাতে মোহাম্মদীদের মত সাত ও পাঁচ তকবির পড়িতে হইবে। ব্যস আর কিছু না। দাদাজী স্পষ্টই বলিতেন, ঐরূপ না করিলে মুকতাদীরা অসুবিধায় পড়িবে। মুকতাদীদের অসুবিধা না হয় এমনভাবে উক্ত হানাফী মওলানা সাহেব সব আরকান হানাফী মতেই পালন করিতে পারেন। যথা : বুকের উপর হাত না বাধিয়া নাভির নিচে বাঁধা এবং রফাদায়েন না করা। এমাম এটা করিলেন কিনা, তাতে মুকতাদীদের কিছু আসে যায় না।
দাদাজীর এই উদারতার জন্য হানাফী আলেমরাও দেশে-বিদেশে দাদাজীর নাম করিতেন। অবশ্য গোঁড়া মোহাম্মদীদের কেউ কেউ বলিতেন যে দাদাজী তাঁর এক হানাফী ভাগিনা মৌলবী লোকমান আলী সাহেবের খাতিরে ও প্রভাবে এইরূপ উদারতা দেখাইতেন।
সেটা ঠিক কিনা বলা যায় না। কিন্তু মৌলবী লোকমান আলী সাহেবও, যখন আমাদের জুম্মার এমামতি করিতেন, তখন মোহাম্মদী আরকানই মানিয়া চলিতেন। এমনকি, কট্টর হানাফী হইয়াও মৌ. লোকমান আলী আমাদের ঈদের মাঠে এমামতি করিতে গিয়া বার তকবিরে নামাজ পড়াইতেন।
.
১১. গোঁড়ামি ও আদব-লেহায
আরেকটা ব্যাপারে দাদাজীর উদারতা দেখিয়া ছেলেবেলা রাগ করিতাম, একটু বড় হইয়া গৌরব করিতাম ও অনুসরণ করিতাম। ভিন গাঁয়ে একদিন হানাফী আত্মীয় বাড়িতে আমাদের বাড়ির সকলেই দাওয়াত খাইতে গিয়াছিলাম। যিয়াফতটা বোধ হয় লিল্লার যিয়াফত ছিল। বোধ হয় সেই জন্যই খাওয়ার আগে মিলাদের মহফিল হইল। যথারীতি মিলাদ পড়া হইল। যথাসময়ে সকলে কেয়ামে দাঁড়াইয়া উঠিলেন। কেয়াম করাকে মোহাম্মদীরা কবিরা গোনাহ, অনেক শেরক মনে করিয়া থাকেন। প্রধানত এই কেয়ামের জন্যই মোহাম্মদীরা মিলাদের বিরোধী। অথচ দাদাজী সকলের সাথে সাথে কেয়ামে দাঁড়াইলেন এবং পাশে বসা আমাকেও হাত ধরিয়া টানিয়া খাড়া করিলেন। অদূরে বসা চাচাজী নিরুদ্বেগে বসিয়া রহিলেন।
যিয়াফত হইতে ফিরিবার পথে এই লইয়া দাদাজী ও চাচাজীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হইয়াছিল। তার সব কথা আমার মনে নাই। কিন্তু দাদাজীর একটা কথা আজও আমার কানে বাজিতেছে। দাদাজী বলিয়াছিলেন : অন্য কারণে না হউক, আদবের খাতিরে দাঁড়ান উচিৎ। কোনও মজলিসে সবাই যখন দাঁড়াইল তখন এক-আধজনের বসিয়া থাকা বেয়াদবি।
