মুনশী সাহেব আরেকটা কুর্নিশ করিয়া বলিলেন : হাঁ হুযুর।
হফেয সাহেব : তুমি আমার প্রজা?
মুনশী : জি, হুযুর।
হাফেয সাহেব : তুমি নাকি লা-মাযহাবী?
মুনশী সাহেব চোখ কপালে তুলিয়া বলিলেন : লা-মযহাবী, ওটা কি চিজ, হুযুর?
হাফেয সাহেব লোকটার অজ্ঞতায় বিস্মিত হইয়া বলিলেন : লা-মযহাবী কারে কয় তাও জান না? আরে এই যে যারগো কয় মোহাম্মদী, তুমি কি মোহাম্মদী?
মুনশী সাহেব আরো বেআক্কেল বনিয়া গেলেন। বলিলেন : মোহাম্মদী কারে কয়, তা ত জানি না হুযুর।
হাফেয সাহেব এত বড় মূর্খকে লইয়া বিপদে পড়িলেন। বলিলেন : মোহাম্মদীও জান না? আহা এই যে যারগগা রফাদানী কওয়া হয়। তুমি কি রফাদানী?
মুনশী সাহেব কুঞ্চিত করিয়া বলিলেন: রফাদানী? সে আবার কে? আমি জীবনে এর নামও ত শুনছি না, হুযুর।
হাফেয সাহেবের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিল। তিনি বিরক্ত হইয়া শেষ চেষ্টা করিলেন। বলিলেন : রফাদানী চিন না? অই যে নামাজের মধ্যে দুই হাত এমন এমন কৈরা যারা মশা খেদায়।
হাফেয সাহেব নিজের দুহাত কাঁধ পর্যন্ত ঘন ঘন উঠাইয়া-নামাইয়া দেখাইলেন এবং বলিলেন : তুমি নামাজের মধ্যে এমন কৈরা হাত উঠাও নামাও?
মুনশী সাহেব যেন এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝিলেন। তিনি বলিলেন : নামাজের কথা কইতেছেন হুযুর। আমার চৌদ্দপুরুষে নামাজই পড়ি না হাত উঠামু কি?
হাফেয সাহেবের গম্ভীর রাগত মুখে এইবার হাসি ফুটিল। তিনি হাসি মুখে বলিলেন : ও তুমি নামাজই পড় না? ঠিক ত? কোনো দিন নামাজ পড় নাই?
মুনশী সাহেব মুখ পুছিয়া বলিলেন : না, হুযুর। হাফেয সাহেব : যাও, তুমি, খালাস।
কাহিনীটার কতখানি সত্য, আর কতখানি রং-ঢং লাগানো, তা জানিবার উপায় নাই। কিন্তু মোটামুটি সত্য এই যে হানাফী-মোহাম্মদী বিরোধ তৎকালে ঐ রকমই ছিল।
দরিরামপুরে ঐ ঘটনা ঘটার পর আমি সাবধান ত হইলামই না, বরঞ্চ আমার জিদ আরো বাড়িয়া গেল। মোহাম্মদী মতে নামাজ পড়া সহী হাদিস সেহা-সেত্তার হুকুম। সহী হাদিস মানেই পয়গম্বর সাহেবের কথা। সুতরাং ওটাই আল্লার কথা। মানুষের ডরে আল্লা-রসুলের হুকুম অমান্য করিব? আল্লাকে না ডরাইয়া মানুষকে ডরাইব? কিছুতেই না। এই মনোভাব লইয়া নিরাপদে দরিরামপুর ছাত্রজীবন কাটাইয়া দিলাম। কারণ গোড়াতে বাপ দাদার পরিচয় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জনপ্রিয়তা ছিল সেখানে আমার জোর। ঐ অঞ্চলের মাতব্বররা ও স্কুল কমিটির মেম্বররা সকলেই আমাকে পুত্রের স্নেহাদর দিয়াছিলেন। আমিও ওঁদের নিজের লোক হইয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু ময়মনসিংহ শহরে সে সুবিধা ছিল না।
.
৯. ময়মনসিংহ শহরে সংঘর্ষ
১৯১৩ সালে ময়মনসিংহে আসিয়া আবার সেই বিপদে পড়িলাম। মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের আশেপাশে কোনো মসজিদ ছিল না। কাঁচারি মসজিদ এখনও হয় নাই। কাজেই ওয়াকতিয়া নামাজ পড়িতাম আমরা কাঁচারির শানবান্ধা ঘাটে। ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল রোড যেখানে আসিয়া ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে পড়িয়াছে ঠিক এইখানে নদীতে একটা বিশাল বাধান ঘাট ছিল। পাশে যেমন বড়; গভীরও তেমনি। একেবারে নদীর তলায় চলিয়া গিয়াছিল। ঘাটলাটি ছিল দুতলা। অর্থাৎ রাস্তা হইতে সাত-আট ধাপ নিচে নামিয়া সিঁড়ি অপেক্ষা পাশে ডবল বিশাল পাকা চত্বরে আসিতে হইত। এই চত্বরের দুই পাশে পুরাটা এবং অপর দুই পাশে সিঁড়ি বাদে বাকিটা পোড়াপিট ছিল। ঠিক যেন হেলানিয়া বেঞ্চি। এই চত্বর হইতে মূল ঘাট শুরু। অসংখ্য সিঁড়ির ধাপ পানির ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়াছে। ঘাটের উপরেই একটা বিশাল বটগাছ। এই গাছটা ঘাটলা ঢাকা দিয়া বেশির ভাগই ছায়া-শীতল রাখিত। আজ সে ঘাটও নাই, বটগাছও নাই। যা হোক কাঁচারির লোকজন এ মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের নামাজি ছাত্ররা এখানেই যোহরের নামাজ পড়িতাম। কিন্তু জুম্মার নামাজ পড়িতে যাইতাম জিলা স্কুল মসজিদে। পরিচয়ের সুবিধার জন্য একে ঐ নামে ডাকা হইলেও জিলা স্কুলের সাথে এর কোনও সম্পর্ক নাই। জনগণের অর্থ সাহায্যে আজ এখানে তিন গুম্বুজের মসজিদ উঠিয়াছে বটে কিন্তু আমি যখনকার কথা বলিতেছি তখন এটি ছিল একটি ছোট্ট টিনের ঘর।
এই মসজিদে জুম্মা পড়িতে গিয়া প্রথম দিনই আমি বিপদে পড়িলাম। দাখিলুল মসজিদের দুই রেকাত নামাজও শেষ করিতে পারিলাম না। হৈ হৈ করিয়া দুই-তিন জন লোক আসিয়া আমাকে ঘেরিয়া একদম হেঁচকা টানে আমার তহরিমা বান্ধা হাত নামাইয়া দিল। চিল্লাইয়া বলিল : তুমি লা মাযহাবী? তোমার বাড়ি কই? কই থাক?
চার বছর আগের দরিরামপুরের ঘটনা মনে পড়িল। কিন্তু দুই-এর মধ্যে কত তফাত। সেটা ছিল বাড়ির কাছে। দুই ভাই ছিলাম। মৌলবী যহুরুল হক ছিলেন, আর বাপ-দাদাকে ওরা চিনিতেন। আর আজ? আমি একা বিদেশ বিভুই। চিনা-জানা কেউ নাই। ঘাবড়াইলাম। আল্লাকে ডাকিতে লাগিলাম।
আল্লাহ সাড়া দিলেন। একদল ছাত্রসহ একজন মাস্টার গোছের লোক ঢুকিলেন। ঢুকিয়াই ব্যাপার কী জিজ্ঞাসা করিলেন। আমার কিছু বলিতে হইল না। ওদের মুখের কথা শুনিয়াই লোকগুলিকে তিনি তম্বিহ করিতে লাগিলেন। ওদের মত সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভাবের লোকই মযহাবী বিবাদ বাধাইয়া মুসলমানদের ঐক্য নষ্ট করিতেছে; আসলে সব মযহাবই ঠিক ইত্যাদি বক্তৃতা করিলেন। কাতার ভাঙ্গিয়া মুসল্লিরা জনতায় পরিণত হইল। ভিতর হইতে মৌলবী গোছের অনেকে বাহির হইয়া আসিলেন। দেখিলাম, এই ভদ্রলোককে সবাই চিনেন। সবাই খাতির করেন। তাঁর কথায় প্রায় সবাই সায় দিলেন। আমার আততায়ী তিনজনকে এতক্ষণ যাঁরা সমর্থন করিতেছিলেন, তাঁরাও ঘুরিয়া দাঁড়াইলেন। সবাই মিলিয়া ওদেরে বকিতে লাগিলেন। ভদ্রলোকের কত প্রভাব! এক মুহূর্তে সব ওলট-পালট করিয়া দিলেন।
