শুনিলাম অপর দুই-একজন বলিল : ‘আহা, আপনে এটা কি করতেছেন? আমাদের আক্রমণকারী ভদ্রলোক বলিলেন : এরা লা-মযহাবী যে।
প্রতিবাদকারী বলিলেন : হোক না। ওদেরে দাখিলী সুন্নতটা শেষ করতে দেন। তারপর যা হয় বলেন।
আমরা বিনা বাধায় সুন্নত শেষ করিতে পারিলাম। কিন্তু সালাম ফেরান মাত্র লোকটি আমাদের সামনে আবার কুঁদিয়া আসিলেন। মনে হইল তিনি আমাদের দুই রেকাত দাখিলী নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ওত পাতিয়া পাশেই দাঁড়াইয়া ছিলেন। চিল্লাইয়া আমাদের মুখের সামনে মুষ্টিবদ্ধ হাত নাড়িয়া বলিতে লাগিলেন : তোমরা লা-মাযহাবী। তোমরা খারেজি। আমাদের মসজিদে ঢুকিয়া মসজিদ নাপাক করিয়াছ।
আমরা ভড়কাইয়া গিয়াছিলাম। কিন্তু আশেপাশের কিছু লোক আমাদের পক্ষে থাকিলেন। পক্ষে থাকিলেন মানে আমাদেরে সমর্থন করিলেন, তা নয়। ঐ লোকটি যাতে তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত আমাদের গায়ে বসাইয়া দিতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তারা আমাদের ঘিরিয়া রাখিলেন। হৈ-চৈয়ে নামাজের কাতার ভাঙ্গিয়া নামাজের জমাত জনতায় পরিণত হইল। মসজিদের ভিতর হইতে স্কুলের হেডমৌলবী ও মাদ্রাসার মুদাররেসরাও বাহির হইয়া আসিলেন। জনতার মধ্যেও আলেমে-আলেমে অনেক কথা কাটাকাটি হইল। আমাদের পরিচয় জানাজানি হইয়া গেল। দাদাজীর নাম অনেকেই জানিতেন। হেডমৌলবী সাহেবের মধ্যস্থতায় আমাদের বিনা বাধায় নামাজ পড়িতে দেওয়া হইল। আক্রমণকারী ভদ্রলোক ও তার সমর্থকেরা গোঁ গোঁৎ করিতে লাগিলেন। নামাজ শেষে হেডমৌলবী সাহেব ও অন্য মৌলবী সাহেবেরা আমাদেরে সাহস দিলেন এবং বরাবর নির্ভয়ে এই মসজিদে নামাজ পড়িতে আসিতে বলিলেন। আমরাও নির্ভয়েই সেখানে জুম্মার নামাজ পড়িতে লাগিলাম। এর পরেও আরো দুই-একবার আমাদেরে আক্রমণ করা হইয়াছে কিন্তু প্রতিবারই আক্রমণকারী ছিলেন নবাগত।
.
৭. মযহাবী-বিরোধের তকালীন রূপ
যে যুগের কথা আমি বলিতেছি, সে যুগে এমন ব্যবহার অন্যায়ও ছিল না। ব্যতিক্রম ছিল না। বরঞ্চ ঐটাই ছিল নিয়ম। তৎকালে হানাফী মোহাম্মদীর বিরোধ, বাহাসের সভা, সভা শেষে মারামারি এবং পরিণামে মামলা মোকদ্দমা ও জেল-জরিমানা ছিল সাধারণ ব্যাপার। আমার আয়না পুস্তকের ‘মোজাহিদিন’ গল্পটা নেহাত কাল্পনিক গল্প নয়। ঐ ধরনের বহু সভায় আমি নিজে গিয়াছি। চাচাজী এরই ধরনের বাহাসের নামে নাচিয়া উঠিতেন। উদ্যোগ-আয়োজন করিতেন। বাহাসের সভায় গিয়া আগের কাতারে বসিতেন। হানাফীদিগকে তর্কে হারাইবার উদ্দেশ্যে তিনি এ সম্পর্কে বেশ কিছু পুস্তকাদি কিনিয়াছিলেন। তার মধ্যে মওলানা আব্বাছ আলীর ফেফায়ে মোহাম্মদী ও মৌলবী এলাহী বখশের রদ্দে মোকাল্লেদিন ও দুরারায়ে মোহাম্মদী ইত্যাদির নাম আজও আমার মনে আছে। পক্ষান্তরে হানাফীদের বক্তব্য সম্বন্ধে ওয়াকেফহাল হইবার জন্য মওলানা রুহুল আমিন ও মৌলবী নঈমউদ্দিন সাহেবের রদ্দে গায়ের মোকাল্লেদিন ও রদ্দে লা-মযহাবী নামক পুস্তকও তিনি কিনিয়াছিলেন। তিনি হানাফীদের উপর এত বিরূপ ছিলেন যে তাঁদেরে বুঝাইতে গিয়া রাগের চোটে উর্দু বলিয়া ফেলিতেন। তিনি বলিতেন ‘হানাফীরা হিন্দো-সে বদতর হ্যায়। আমার মোজাহেদিন’ গল্পে উভয় পক্ষের যে সব তথাকথিত যুক্তির অবতারণা করিয়াছি, ও-সবই ঐ সময়কার বাহাসে দুই পক্ষের দেওয়া যুক্তি। যুক্তিগুলি খুবই লজিক্যাল এবং আমার এখনও মনে হয় উভয় পক্ষের কথার মধ্যেই আন্তরিকতা ছিল।
কাজেই দরিরামপুর মসজিদের কতিপয় মাতব্বর-মুসল্লি যে আমাকে হামলা করিয়াছিলেন এতে বিস্ময়েরও কিছু নাই, অন্যায়ও তারা করেন নাই। আমার মত লা-মযহাবীরা ঐ মসজিদে ঢুকিয়া উহা নাপাক করিয়াছি, এ কথা তারা ঈমানদার সাচ্চা হানাফী মুসলমান হিসাবেই বলিয়া ছিলেন। তাদের বিচারে হানাফীরাই একমাত্র খাঁটি মুসলমান। অ-হানাফীরা মুসলমানই নয়। হানাফী আলেমরা অবশ্য বলিতেন, চার মযহাবই বরহক, চারটার একটা মানিলেই সে মুসলমান হইল। কিন্তু হানাফী জনসাধারণ অতশত সূক্ষ্ম বিচারে যাইত না। অন্যতম মযহাবী দল শাফীরাও নামাজের খুঁটিনাটি আরকানে অবিকল মোহাম্মদীদের মত চলিলেও জনসাধারণ সে কথা বিচার করে না। মোট কথা, লা-মযহাবীদের নামাজ পড়া না-পড়া সমান। শুধু তা-ই নয় চাচাজীর বিচারে হানাফীরা হিন্দুদের আগেই দুযখে যাইবে। অনেক হানাফীর চোখে মোহাম্মদীদের কপালেও তাই আছে। অতএব নামাজ না পড়ো তাও ভাল, তবু অপর দলের মত পড়িও না। এ কথাটাও আমার কাল্পনিক কথা নয়। এমন ঘটনা অনেক ঘটিয়াছে। আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ সাহেবের মুখে শোনা গল্পটাই এখন নজিরস্বরূপ উল্লেখ করিতেছি। গল্পটা এই :
.
৮. করটিয়ার কাহিনী
বাংলার হাতেমতায়ী করটিয়ার স্বনামধন্য জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চান মিয়া) সাহেবের পিতা হাফেয মোহাম্মদ আলী সাহেব খুব কট্টর হানাফী ছিলেন। একদা তিনি খবর পাইলেন, তাঁর প্রজাদের মধ্যে একজন লা মহাবী আছেন। তাঁর নাম ইসমাইল মুনশী। তাঁর জমিদারির পুণ্য ভূমিতে লা-মযহাবী! অমনি ইসমাইল মুনশীর তলব হইল। ইসমাইল মুনশী আসিলেন। নকিব ফুকারিল : আসামি ইসমাইল মুনশী হাজির। মুনশী সাহেব দরবারে হাজির হইয়া কুর্নিশ করিলেন। হাফেয সাহেব সিংহাসন হইতে গর্জিয়া উঠিলেন : তোমার নাম ইসমাইল?
