.
৪. মযহাবী-বিরোধ
আমার এই ধর্মপ্রীতি অনেকবার আমাকে খুব বিপদেও ফেলিয়াছে। আমাদের পরিবার খুব গোঁড়া মোহাম্মদী। আমাদের ধনীখোলা গ্রামের বেশির ভাগ লোকই তাই। ছাত্ররাও। কিন্তু আমি ছাড়া আমাদের অঞ্চলের ছাত্রদের কোনও অসুবিধা বা বিপদ ছিল না। কারণ এরা কেউ নিজেদের মোহাম্মদীগিরি প্রদর্শন করিত না। নামাজের আহকাম-আরকানে হানাফী ও মোহাম্মদীদের মধ্যে যেসব প্রভেদ আছে, তার মধ্যে মোহাম্মদীদের বুকের উপর তহরিমা বান্ধা ও রুকুতে-রুকুতে রফাদায়েন করাই প্রধান কারণ এই দুইটাই সহনামাজিদের এবং বাহিরের দর্শকদের চোখে পড়ে। অন্যসব প্রভেদ সাধারণ। দর্শকের চোখে পড়ে না। আরেকটি বড় তফাত যা চোখে পড়ে না কানে লাগে, সেটি হইল জোরে ‘আমিন’ বলা। কেরাত জোরে না পড়িলে জোরে আমি বলিত হয় না। সুতরাং জুম্মা ও রাতের নামাজ ছাড়া এ পার্থক্য ধরা পড়ে না। আমাদের জিলায় এবং পরে জানিতে পারি, সারা দেশেই, হানাফীর অনুপাতে মোহাম্মদীর সংখ্যা অনেক কম। আমাদের ছাত্রজীবনেই আমি হানাফী মোহাম্মদীতে অনেক বাহাস-মুবাহেসা ও ঝগড়া-বিবাদ দেখিয়াছি। সুতরাং উভয় সম্প্রদায়ে বিরোধ ছিল প্রচুর। এমন বিরোধ থাকিলে ছোট দলের লোক সাধারণত একটু আত্মগোপন করিয়া চলে। বড় জমাতে বা যেখানে-সেখানে তারা ধরা দেয় না। ধরা না দেওয়ার উপায়ও খুব কঠিন ছিল না। তহরিমা বাধার সময় হাত দুইটা ঠেলিয়া একেবারে বুকের উপর না তুলিয়া সামান্য নামাইয়া বাঁধিলেই গোলমাল চুকিয়া যায়। হানাফীদের নিয়ম দুই হাত নাভির নিচে বাঁধা। কিন্তু নাভির নিচে কি উপরে, সেটা কেউ আঙুলে মাপিয়া দেখে না। কাজেই পেটের উপর বা ভুড়িতে হাত দুইটা ফেলিয়া রাখিলেই হানাফী মতে তহরিমা বাধা হইল। আর রফাদায়েনটা হাতের কবজি ভাঙ্গিয়া ইশারায় করিলে অথবা একদম না করিলেই বা কী হইল? শান্তিপ্রিয় মোহাম্মদীদের তাই করা উচিৎ। সেকালে অনেকেই তা করিত। আমি নিজে অনেক মোহাম্মদীকে হানাফীদের জমাতে ঐভাবে আত্মগোপন করিতে দেখিয়াছি। ওরা যে শুধু আমার বয়সী শিশু ছিল, তা নয়। আমাদের জমাতের দুই-একজন মুনশী মৌলবীকেও ঐভাবে আত্মগোপন করিতে দেখিয়াছি। তারা যে উদার ছিলেন, তারা যে উভয় প্রকারের আহকাম-আরকানকে জায়েজ মনে করিতেন, তা নয়। নিজেদের মধ্যে জুম্মায় বা ঈদের জমাতে এবং সভা-সমিতিতে তাদের কেউ কেউ হানাফীদিগকে হিন্দু-সে বদতর’ বলিয়া গালিও দিতেন। এরাই যখন হানাফীদের মধ্যে পড়িয়া হানাফী মতে নামাজ পড়িয়া আত্মগোপন করিতেন, তখন আমার শিশুমনও বিদ্রোহী হইয়া উঠিত। আমি বুঝিতাম, ইনারা ভয়ে আত্মগোপন করিতেছেন। এটাকে আমি কাপুরুষ বলিয়া ঘৃণা করিতাম। এই ধরনের কোনও আলেমকে যখন আমাদের বাড়িতে হানাফীদেরে নিন্দা করিতে শুনিতাম, তখন প্রকাশ্যভাবে মৌলবী সাহেবের কুকীর্তির কথা বলিয়া দিতাম।
.
৫. আমার একগুঁয়েমি
কাজেই কোনও অবস্থাতেই কোনো জায়গাতেই আমি নিজের মোহাম্মদীগিরি গোপন করিতাম না। বরঞ্চ ওটা যাহির করাকে আমি গৌরবের বিষয় মনে করিতাম। নামাজে বুকের উপর তহরিমা বাঁধা, তহরিমা বাঁধার আগে কান পর্যন্ত হাত না তুলিয়া কাঁধ পর্যন্ত তোলা, জোরে ‘আমিন’ কওয়া, রুকুতে যাইতে-উঠিতে রফাদায়েন করা, প্রথম রেকাত হইতে দ্বিতীয় রেকাতে উঠিবার সময় সিজদা হইতে সোজা না উঠিয়া বসিয়া উঠা, চতুর্থ বা শেষ রেকাতে আত্তাহিয়াত পড়িবার সময় বাম পা ডান পায়ের নিচে দিয়া বাহির করিয়া দেওয়া, আত্তাহিয়াত পড়িবার সময় সারাক্ষণ শাহাদত আঙুল উঁচা করিয়া রাখা ইত্যাদি কোনও খুঁটিনাটিও বাদ দিতাম না। বরঞ্চ হানাফী সহনামাজিদেরে দেখাইবার জন্য তহরিমাটা অনাবশ্যকরূপে বুকের উপরের দিকে ঠেলিয়া দিতাম। ভাবটা যেন এই : দেখ ও হানাফীগণ, আমি মোহাম্মদী, তোমাদেরে আমি ডরাই না। যা করিতে পার কর। নিজের বাড়ির জমাতে আমি যতটা জোরে ‘আমিন’ বলিতাম, হানাফীদের জমাতে তার থনে জোরে বলিতাম। উদ্দেশ্য যেন হানাফীদের কানতালি লাগাইয়া দেওয়া।
এমন যখন আমার মোহাম্মদী তেজ, ঠিক সেই সময় আমি দরিরামপুর মাইনর স্কুলে ভর্তি হইলাম এবং দুই-একদিন বাদেই জুম্মার নামাজ পড়িতে মসজিদে গেলাম। ময়মনসিংহ ত্রিশালের পাকা রাস্তায় ত্রিশাল থানা বা দরিরামপুর হাই স্কুলে পৌঁছিবার একটু আগেই রাস্তার ডান দিকে যে পাকা এক গুম্বুজের মসজিদ দেখা যায় এইটিতেই তকালেও আমরা স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র জুম্মার নামাজ এমনকি অনেকে ওয়াকতিয়া নামাজও পড়িতাম। আসল মসজিদটি আকারে তেমন বড় না হইলেও সামনের সেহানটি খুবই কুশাদা। মসজিদের ভিতরে যত মুসল্লি ধরে, বারান্দায় ধরে তার তিন ডবল। স্কুলের হেডমৌলবী জনাব জহুরুল হক ও অন্যান্য শিক্ষক-মুদাররেসদের পিছনে পিছনে আমরা অনেক ছাত্র দল বাঁধিয়া মসজিদে আসিলাম। সামনের পুকুরে অযু করিয়া ছাত্ররা সকলে বারান্দায় দাঁড়াইলাম। শুধু মৌলবী সাহেবরা মসজিদের ভিতরে গেলেন। আর আর সাথীরা কে কোথায় দাঁড়াইল মনে নাই। কিন্তু আমরা দুই ভাই একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়াইলাম।
.
৬. প্রথম সংঘর্ষ
আমরা দুই ভাই পাক্কা মোহাম্মদী। সুতরাং বুকের উপর রাখিয়া তহরিমা বাঁধিয়াছি। এক-আধ রেকাত দাখিলুল-মসজিদ বা কাবলুল-জুম্মা বোধ হয় পড়িয়াও ফেলিয়াছি। এমন সময় একজন মোটা গলায় চিৎকার করিয়া বলিলেন : “এই বাচ্চারা, তোমরা কেমনে নামাজ পড়তেছ? তোমরা লা-মাযহাবী নাকি?’ কাকে কে এ কথা বলিতেছে, তা ভাবিবার সময় পাইলাম না। একটা লোক আসিয়া আমাদের দুই ভাইয়ের বুকে বাঁধা হাত টানিয়া নাভির নিচে নামাইয়া দিলেন। নামাজে দাঁড়াইয়া কথা বলিতে নাই। কাজেই আমরা কিছু বলিলাম না। কিন্তু লোকটি আমাদের হাত ছাড়িয়া দেওয়া মাত্র আমাদের দুই জোড়া হাত স্প্রিংয়ের মত পূর্বস্থানে বুকের উপরে উঠিয়া আসিল। লোকটি আবার আমাদের হাত নামাইয়া দিলেন। আবার আমাদের হাত উঠিয়া পড়িল।
