.
২. শৈশবের বাড়াবাড়ি
এই পরিবেশে অন্য সহোদরদের সাথে আমিও খুব মুসল্লি-মোত্তাকি হইয়া উঠিলাম। বরঞ্চ আমি সকলের চেয়ে বেশিই হইলাম। পাঁচ বছর বয়সে মতন কোরআন শরিফ খতম করিলাম। ঐ বয়সেই পাঁচ ওয়াকত নামাজ নিয়মিত পড়িতে লাগিলাম। এ ছাড়া মার জায়নামাজে তার পাশে বসিয়া তার দেখাদেখি এবাদত করিতাম। কী এবাদত করিতাম, তা নিজেই জানিতাম না। কখনও মার তসবিহ ছড়া নাড়িয়া, কখনও ডান হাতের আঙুল টিপিয়া এবং কখনো সিন্দা করিয়া মার অনুকরণ করিতাম। এতে মা অসন্তুষ্ট হইতেন না। বরঞ্চ দোওয়া তসবিহ শিখাইবার চেষ্টা করিতেন।
সাত বছর বয়সে সর্বপ্রথম পুরা ত্রিশটা রমযানের রোযা রাখিলাম। নয় বছর বয়সে বাড়ির মাদ্রাসায় জমাতে নহম ও পাঠশালায় দ্বিতীয় শ্রেণী পাশ করিয়া ফেলিলাম। তাতে উর্দু ফেকায়ে-মোহাম্মদী, রাহে-নাজাত, মেফতাহুল জান্নাত ও বাংলা নিয়ামতে-দুনিয়া ও আখেরাত এবং নক্শে-সুলেমানী পড়িয়া একরূপ মুখস্থ করিয়া ফেলিলাম। এইসব কেতাবের উপদেশসমূহের শিশুসুলভ আজগুবি অর্থ করিয়া সেসব উপদেশ গোপনে আমল করিতে লাগিলাম। এই সব আমলের দুই-একটা এইরূপ : প্রতি রেকাতে একবার সুরা ফাতেহার পর তিনবার সুরা কওসর অথবা সুরা এখলাস পড়িয়া একশ রেকাত নামাজ পড়িতাম। প্রতি দুই রেকাত অন্তর সালাম ফিরাইতাম এবং একশ বার সোবহানাল্লা পড়িতাম। প্রায় প্রতি রাত্রেই এই নামাজ শুরু করিতাম বটে কিন্তু খুব কম রাত্রেই পুরা করিতে পারিতাম। দশা বিশ রেকাত পড়িতেই মা বা বাপজী জাগিয়া উঠিতেন। আমিও নামাজ বন্ধ করিতাম। কিন্তু তারা কোনো দিন আমাকে তষিহ করিতেন না। বরঞ্চ মা এটা পছন্দই করিতেন। পড়ার জন্য বাড়ি ছাড়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি বাবা-মার সঙ্গেই থাকিতাম। তাঁদেরে গোপন করিতে গিয়া আমাকে বেশি রাত্রে এ নামাজ পড়িতে হইত। আমি তাদের আগেই শুইয়া পড়িতাম এবং ঘুমের ভঙ্গিতে পড়িয়া থাকিতাম। তারা দুজনে শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িলেই আমি চট করিয়া উঠিয়া পড়িতাম। অযুর দরকার হইত না; কারণ অযু করিয়াই বিছানায় আসিতাম। মার জায়নামাজটা বিছাইয়া এবাদতে লাগিয়া যাইতাম। অন্ধকারেই এটা করিতাম। কারণ বাতি জ্বালাইলে বাবা-মা টের পাইবেন, ভয় ছিল। নফল নামাজে কেরাত জোরে পড়িতে হয় না। কাজেই সেদিকে কোনও চিন্তার কারণ ছিল না।
কিন্তু আসল কথা এই যে বাবা-মা উভয়েই আমার এই গোপন এবাদতের নেশার কথা জানিতেন। যদিও আমি মনে করিতাম, তারা ঘুমাইয়া আছেন। আসলে কিন্তু তারা সজাগই থাকিতেন এবং অন্ধকারে আমার এবাদত লক্ষ করিতেন। প্রথম প্রথম উভয়েই কৌতুক বোধ করিতেন। মা পছন্দ করিতেন। কিন্তু আমার কতকগুলি জটিল রোগ দেখা দেওয়ায় তারা চিন্তিত হইলেন। শরীর আমার কোনও দিনই পুষ্ট ছিল না। এইসব রোগে আমি শুকাইয়া একেবারে কঙ্কাল হইয়া গেলাম। আমার এই এবাদতের সঙ্গে আমার রোগের সম্পর্ক আছে বলিয়া বাবা-মারও সন্দেহ হইয়াছিল। কাজেই দাদাজীর কাছে এবং আমার চিকিৎসকদের কাছে তারা আমার এই গোপন কথা প্রকাশ করিয়া দেন।
এর পর শুধু বাবা-মা নন, সমস্ত মুরুব্বিরা মিলিয়া আমাকে বুঝাইতে লাগেন, এই অল্প বয়সে নফল এবাদতের দরকার নাই। চাচাজী এক ধাপ আগাইয়া গিয়া বলিলেন : এ অবস্থায় এই বয়সে নফল এবাদতে কোনও সওয়াব ত হইবেই না, বরঞ্চ গোনা হইবে।
কিন্তু এসব কথায় আমি টলিলাম না। মুরুব্বিরা ত শুধু উপদেশ দিয়াই ক্ষান্ত হইলেন। কোনও প্রকার যবরদস্তি করিলেন না। আমার গোপন এবাদত এখন হইতে প্রকাশ্যভাবে চলিতে থাকিল।
আমার এই নফল এবাদতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হযরত পয়গম্বর। সাহেবকে খাবে দেখা। অন্তত খাজে-খেযেরের সাক্ষাৎ পাওয়া আমার নফল এবাদতের অপর প্রধান মকসুদ ছিল। পয়গম্বর সাহেবকে খাবে দেখার জন্য নশে-সুলেমানী’ ও ‘নিয়ামতে-দুনিয়া ও আখেরাতে যতগুলি তরকিব বাতলান হইয়াছিল একটা-একটা করিয়া তার সবগুলি আমি এস্তেমাল করিতাম। কাগজের ছোট টুকরায় আরবি হরফে একশ একবার আল্লাহ লিখিয়া সেই টুকরা বালিশের নিচে লইয়া শুইতাম। যাফরানের কালিতে শাহাদত আঙুলে আরবি হরফে মোহাম্মদ লিখিয়া শুইতাম। ঘুম আসিবার আগ পর্যন্ত মনে মনে ইয়া রাহিম’ জপিতাম। এত করিয়াও কিন্তু পয়গম্বর সাহেবকে কখনো খাবে দেখিতে পাই নাই। ঐ আমলের ফলে খাজে-খেযেরের মোলাকাত পাইবার আশায় নদীর পাড় বা অন্যান্য সম্ভাব্য স্থানে একা একা ঘুরিয়া বেড়াইতাম। কিন্তু খাজে খেযেরের সাক্ষাৎ পাইলাম না। তবে খাবে খাজে-খেযেরের আনুমানিক চেহারার অর্থাৎ সাদা দাড়ি, সফেদ পোশাকের গৌরবর্ণ একজন সুফি-দরবেশকে পুনঃপুন স্বপ্নে দেখিতাম। তিনি স্বপ্নে আমাকে আরবি মুখরেজ ও তালায় শিখাইয়াছিলেন। এসব কথা আমি অন্য অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা করিয়াছি।
.
৩. টুপি নিষ্ঠা
এবাদত-বন্দেগিতে আমার এই ধার্মিকতা আমার পোশাক-পাতিতে প্রকট হয়। টুপি ছাড়া আমি কোথাও যাইতাম না, স্কুলে-মকতবে ত নয়ই। ক্লাসে কখনও মাথা হইতে টুপি নামাইতাম না। আমার টুপিটা ছিল লাল তুর্কি টুপি। ঐ ধরনের টুপিতে মাথায় বাতাস যাতায়াতের কোনো রাস্তা ছিল না। গরমের দিনে ঘামে মাথা ভিজিয়া যাইত। কপাল, গাল, চিপ ও ঘাড় বাইয়া ঘাম পড়িত। তবু টুপি খুলিতাম না। গ্রামের পাঠশালায় পড়িবার সময় আমাদের শিক্ষক জগদীশ বাবু কোনও দিন টুপি খুলিতে বলেন নাই। আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব ত এ জন্য দস্তুরমত আমাদের দুই ভাইয়ের তারিফই করিতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দরিরামপুর স্কুলে ও আরো পরে শহরে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলে পড়িবার সময় হিন্দু শিক্ষক ও সহপাঠীরা অন্তত গরমের সময় টুপিটা খুলিয়া রাখিতে। পরামর্শ দিতেন। কিন্তু আমি তাদের কথা রাখিতাম না। শুধু হাসিয়া বলিতাম: ‘আমার কোনও অসুবিধা হইতেছে না। দরিরামপুর স্কুলে পড়িবার সময় স্কুলসংলগ্ন মাদ্রাসার ছাত্রদের অনেকে সর্বদা টুপি পরিত না। তা দেখাইয়া অনেক শিক্ষক ও সহপাঠী টুপি খুলিয়া মাথা ঠাণ্ডা করিতে উপদেশ দিতেন। তাদেরও আমি বলিতাম : আমার মাথা বেশ ঠাণ্ডাই আছে। আমিও আসলে ঠাণ্ডা। টুপির জন্য আমি কখনও মাথায় গরম বোধ করিতাম না।
