এতএব বই পড়ার সাধ, মানে জ্ঞান লাভের খিদা, আমার আজও মিটে নাই। কাজেই এই পঁচাত্তর বছর বয়সেও আমার শিক্ষাজীবন শেষ হয় নাই। ফলে আমার আত্মকথার এই অধ্যায় অসমাপ্তই রহিয়া গেল।
তৃতীয় খণ্ড – ধর্ম-জীবন
অধ্যায় সাত – গোঁড়ামির পরিবেশ
১. নফলিয়াতের পাবন্দি
ফরাযী পরিবারের আনুষ্ঠানিক ধার্মিকতার পরিবেশে আমার জন্ম। বুদ্ধি হওয়ার সাথে সাথেই দেখিয়াছি নামাজ-রোযার ধুম। সুরুজ উঠার দুই ঘণ্টা আগেই দাদাজী খোশ ইলহানে বুলন্দ আওয়াজে আযান দিতেন। তাঁর আযান আশেপাশের দু-চার গ্রামের লোক শুনিতে পাইত। লোকেরা বলাবলি করিত : ফরাযী সাবের আযানই আমাগর ঘড়ি। দাদাজীর আযানে আমাদের বাড়ির সকলেই জাগিয়া উঠিতেন। পুরুষরা সকলে বাহির বাড়ির মসজিদে (তকালে কাঁচা ভিটি টিনের ঘর) জমাতে নামাজ পড়িতেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা সকালে উঠিতেন, তাঁরাও এই জমাতে শামিল হইতেন। আমাদের চাকরদের মধ্যে যারা রাত্রে আমাদের বাড়িতে থাকিত তারাও নামাজ পড়িতে বাধ্য ছিল এবং ফযরের নামাজে জমাতে শামিল হইত। মোট কথা আল্লার ভয়ে না হউক, দাদাজীর ভয়ে আমাদের বাড়ির সবাই নামাজি ছিলেন।
বাড়ির ভিতরের মেয়েরা সকলে পাক্কা নামাজি ছিলেন। মেয়েলোক অর্থে দাদি, ফুফু, মা ও চাচি। এ ছাড়া গুলের মা নাম্নী এক চাকরানি ও তার মেয়ে গুলজান। এরাও সকলেই আওয়াল-ওয়াকতে ফযরের নামাজ পড়িত।
এ অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে আমার পূর্বপুরুষেরাই সকলের আগে শিরা কবুল’ করিয়াছিলেন, এ কথা আমি এই পুস্তকের পয়লা অধ্যায়েই বলিয়াছি। ‘পয়লা শরা কবুল করার মধ্যে যেমন একটা গৌরব বোধ আছে, তেমনি একটা দায়িত্ববোধও আছে। আমি ছেলেবেলায় দেখিয়াছি, আমার মুরুব্বিদের মধ্যে এই গৌরববোধটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল; কিন্তু দায়িত্ব বোধটা প্রতিবেশীরা এবং বাইরের লোকেরা স্মরণ করাইয়া দিতেন। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা রোযা-নামাজে নিজেরা গাফেল ছিলেন, তাঁরাও ফরাযী পরিবারের লোকদের নামাজ-রোযার গাফলতি সহ্য করিতেন না। যেসব আমোদ-প্রমোদ, গান-বাজনা, যাত্রাপার্টি ও পূজা-মেলায় আমার সহপাঠী ও সমবয়সীরা অবাধে যাইত, সে সবে আমি ও আমার ভাইয়েরা গেলে তারাই আপত্তি করিত। এমনকি ঐ সব গান-বাজনার আয়োজনকারী হিন্দুরা ও আমাদের শিক্ষকেরাও আর সকলকে বাদ দিয়া শুধু আমাদেরে বলিতেন : “তোমরা ফরাযী বাড়ির লোক। তোমাদের এসবে আসা উচিৎ নয়।
এই পরিবেশে আমাদের মুরুব্বিদের বাড়ির বাহিরের পুরুষদের, অন্দরের মেয়েলোকদের এবং আমরা মকতব-পাঠশালার পড়ুয়াদের কারো পক্ষে নামাজ-রোযায় ও শরিয়তের অপরাপর আইকাম-আরকানে গাফলতি করার উপায় ছিল না। এ অবস্থায় আমাদের অজ্ঞাতসারেই আমরা বাধ্য হইয়াই মুসল্লি-মুত্তাকি অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক ধার্মিকরূপে গড়িয়া উঠিয়াছিলাম।
কাজেই জ্ঞান হইয়াছে অবধি আমি আমাদের বাড়িতে নামাজের ধুম দেখিতেছি। আর রোযা? পুরুষরা সবাই বছরে একবার রমযানের এক মাস মাত্র রোযা রাখিতেন। এ ছাড়া দাদাজীকে মাঝে মাঝে কোনও বিশেষ উপলক্ষে রোযা রাখিতে দেখিয়াছি। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের যেন রোযার আর শেষ নাই। রমযানের পরে শওয়ালের ছয়টি সাক্ষী রোযা’ মাসে মাসে আইয়াম-বাজের রোযা, আশুরার রোযা, শবে বরাত ও শবে মেরাযের রোযা ইত্যাদি কত কী? মেয়েদের মধ্যে আবার মা সকলকে ছাড়াইয়া যাইতেন। বরকত ও ফজিলতের যতগুলি নফল রোযা আছে সেগুলি ত তিনি রাখিতেনই, তার উপর তিনি প্রায় সারা বছরই সদুকার রোযা ও কাফুরার রোযা রাখিতেন। শ্বশুর-শাশুড়ি, বাপ-মা, স্বামী-পুত্র, ভাই-ভগিনী অথবা নিকট আত্মীয় কারো অসুখ-বিসুখ হইলে, অমনি মা তার রোগমুক্তির জন্য তিনটা রোযা, সদকা মানিয়া বসিতেন। খোদার ফজলে মার উপরোক্ত শ্রেণীর লোকের অভাব ছিল না তাদের কারো না কারো অসুখ-বিসুখ একটু-না-একটু হইতই। সুতরাং মার সদকার রোযা যোগাড় করিতে হইত না। যদি সৌভাগ্যবশত কোনো বছর এতগুলি আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কারোই কোনও অসুখ-বিসুখ না হইত এবং তার ফলে মার সদকার রোযার অভাব হইত, তবু তাঁকে রোযা রাখা হইতে মহরুম করিবার উপায় ছিল না। সে অবস্থায় তিনি কাফফারার রোযা রাখিতেন। আমি খুব ত্যক্ত-বিরক্ত হইতাম। কারণ দিনের বেলা মাকে খাইতে দেখা এবং তাঁর হাতের ‘লুকমা’ বা ‘নওলা’ খাওয়া আমার ভারি শখের জিনিস ছিল। তাই মাকে প্রশ্ন করিতাম : এটা আবার কিসের রোযা? তিনি বলিতেন, আমরা দিন-রাত অজানাভাবে কত আয়েব কসুর গোনা-খাতা করিতেছি, তার হিসাব নাই। আমাদের বরাতে যে বালা মুসিবত হইয়া থাকে, তা এইসব গোনা-খাতার জন্যই হইয়া থাকে। তিনি রোযা করিয়া সেইসব গোনা-খাতা আল্লার দরগায় মাফ নিতেছেন এবং ঐ সব বালা-মুসিবতের রাস্তা বন্ধ করিতেছেন। মোট কথা রোযা রাখা মার একটা নেশা ছিল এবং শেষ পর্যন্ত ওটা তার স্বভাবে পরিণত হইয়াছিল। দিনের বেলা কিছু খাওয়া তার সহ্য হইত না। জীবনের শেষ পনের-বিশ বছর তিনি বছরের নিষিদ্ধ ছয় দিন বাদে সারা বছরই রোযা রাখিতেন।
যা হোক রোযা-নামাজের এই ধুম ছাড়া বাহির বাড়ির আটচালা টিনের ঘরে চাচাজীর মাদ্রাসা বসিত। তাতে সকাল-সন্ধ্যায় আরবি-ফারসি পড়া হইত। তাছাড়া বার মাসই মুনশী-মৌলবী, আত্মীয়-স্বজন এবং বিদেশি আলেম-মুসাফিরের সমাগম থাকিত। এঁরা প্রায় সব সময় মসলা-মসায়েলের আলোচনা ও বাহাস-মুবাহেসা করিতেন। প্রায় মাসে মাসেই বাহির বাড়ির উঠানে ওয়াযের মজলিস বসিত।
