সুখের বিষয় এর ব্যতিক্রম আছে। আমি গৌরবের সাথে ঘোষণা করিতেছি যে এই ব্যতিক্রমের মধ্যে আমিও একজন। পড়িবার আগ্রহ আমার ছেলেবেলার মতই তীব্র রহিয়াছে। শুধু তা-ই নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে খিদা যেন আরো বাড়িয়াছে। ছাত্রজীবনের পনের-ষোল বছরে যত বই-পুস্তক পড়িয়াছি, পরবর্তী ষাট বছরে তার চার গুণেরও অনেক বেশি পড়িয়াছি। কাজেই আমি দাবি করিতে পারি যে আমার শিক্ষাজীবন। নিরবচ্ছিন্নভাবে আজও চলিতেছে। আমি আজও ছাত্র। গুরুতর অসুখ ছাড়া অন্য কোনও কারণেই আমার এই ছাত্রজীবনে ছেদ পড়ে নাই। এমনকি কঠিন অসুখেও রোগ মুক্তির পর স্বাস্থ্য লাভের মুদ্দতে বিছানায় শুইয়া বসিয়া কাটাইবার সময়টাও আমি বই-পুস্তক পড়িয়াই কাটাইয়াছি। জেল খাঁটিতে গিয়াও আমার অধ্যয়ন বন্ধ হয় নাই। বরঞ্চ এ সময় আরো বেশি পড়িয়াছি। আমার অধ্যয়নের এলাকা খুবই বিস্তৃত, এমনকি দেওয়ালহীন ছিল বটে এবং আমি সকল শ্রেণীর বই পড়িতাম সত্য, আমার পাঠ্য তালিকায় নাটক, নভেল, কাব্য-কবিতা, মিস্ত্রি-ডিটেকটিভ, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, ভাল-মন্দ, শ্লীল-অশ্লীল এমনকি স্কুল-কলেজের আধুনিক পাঠ্যপুস্তকও ছিল বটে, সব রকমের বই ছিল ঠিক, কিন্তু ফিলসফি, মেটাফিজিকস, পলিটিক্যাল সায়েন্স, ধর্মালোচনা (বিশেষত কোরআন, গীতা, বাইবেল সম্বন্ধে) প্রবন্ধই আমি বেশি পড়িয়াছি। ইতিহাসের প্রতিও আমার আকর্ষণ স্কুল-কলেজজীবন হইতেই ছিল। আজও আছে। টয়েনবি, রাসেল ও শ’র বহু বই পড়িয়াছি। কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল আমি একাধিকবার পড়িবার ও বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছি। লেনিন ও মাও-এরও অনেকগুলি বই পড়িয়াছি। এসবের বেশির ভাগ পড়িয়াছি স্কুল কলেজজীবনের অবসানের পরে; পারিবারিক জীবনের ঝামেলার মধ্যে; রাজনৈতিক জীবনের হট্টগোলের মধ্যেও।
এসবই পড়িয়াছি জ্ঞান লাভের, মানে শিক্ষিত হইবার আশায়। জ্ঞান লাভও যথেষ্ট করিয়াছি। যথেষ্ট করিয়াছি বলিতেছি এইজন্য যে আমি নিজেই বুঝিতেছি প্রতিদিনই আমি কিছু না-কিছু নূতন জ্ঞান লাভ করিতেছি, নূতন সত্যের সন্ধান পাইতেছি। কাল যা জানিতাম না, আজ তা জানিয়াছি। এর যেন শেষ নাই। জ্ঞান লাভের যেন বিরতি বা বাউন্ডারি নাই। এমনকি নিছক আনন্দের জন্য শুধু সময় কাটাইবার জন্য যেসব মিস্ত্রি ও ডিটেকটিভ গল্প পড়িয়াছি, তাতেও প্রচুর জ্ঞান লাভ করিয়াছি। এসব বিষয়ে ইংলন্ড, আমেরিকার জনপ্রিয় যেসব গল্পকারের বই ও রুশ, ফরাসি যেসব বইয়ের ইংরাজি অনুবাদ পড়িয়াছি, তারও কোনও হিসাব নাই। সত্য-সত্যই অসংখ্য হইবে। অশ্লীল বলিয়া নিন্দিত যৌন-বিজ্ঞানের বই এবং সত্য-সত্যই নিন্দার যোগ্য এ সম্পর্কিত অবৈজ্ঞানিক বইও কম পড়ি নাই। কিন্তু শিক্ষা লাভ করিয়াছি আমি সবগুলি থনেই।
বই-পুস্তক কিনিয়াছি আমি অনেক। এ বিষয়ে সাধ্যানুসারে পয়সা খরচ। করিয়াছি ত নিশ্চয়ই। সাধ্যের অতীতও অনেক খরচ করিয়াছি। কিন্তু আমার মত রাক্ষস পাঠকের বই নিজে কিনিয়া পড়িবার সাধ্য খুব কম লোকেরই থাকে। আমার ত কোনও দিনই ছিল না। সেজন্য পরিচিত বন্ধুবান্ধবের নিকট ধার করিয়া অথবা কোনো লাইব্রেরিতে গিয়া পড়িতে হইয়াছে। বই পড়িয়া জ্ঞান লাভের একটা তৃপ্তি ত আছেই। তা ছাড়া বইয়ের মালিক হওয়ার আনন্দও কম নয়। কলিকাতা থাকিতে আমি ইমপেরিয়াল (বর্তমান ন্যাশনাল) লাইব্রেরিতে বসিয়া অনেক বই পড়িয়াছি। বর্তমানে ইউএসআইএসও বৃটিশ কাউন্সিল হইতে আনাইয়া অনেক বই পড়িয়াছি। বইয়ের মালিক হওয়ার জন্য কলিকাতায় প্রায় ত্রিশ বছরের জীবনে কলেজ স্কোয়ারের সেকেন্ড হ্যান্ড। পুস্তকের দোকানদার ও ফুটপাতের পুরান পুস্তক বিক্রেতাদেরও কম ঘাটাই নাই। বস্তুত আমার খরিদা পুস্তকগুলির মধ্যে অর্ধেকের বেশিই সেকেন্ড। হ্যান্ড। আমার ছেলেরা ও বউয়েরা সবাই পুস্তক কিনিয়া টাকা খরচ করিয়া থাকে। তারা অবশ্য নূতন পুস্তকই কিনিয়া থাকে। এদের কিনা বইয়ের রেঞ্জও খুব বিস্তৃত। বর্তমানে এদের কিনা বই-ই আমি বেশি পড়িয়া থাকি। আমার নিজের বই কিনার সামর্থও নাই, দরকারও পড়ে না।
কলিকাতায় কিনা বইগুলির অধিকাংশই ফেলিয়া আসিতে হইয়াছিল। তবু ছেলে ও বউদের বই-পুস্তক লইয়া আমার বাড়ির লাইব্রেরি মোটামুটি বেশ বড়। অবশ্য আমার সংগ্রহের মধ্যে আইন পুস্তকই বেশি।
আমার ছেলে-বউদের কিনা বই প্রায়ই অবশ্য তাদের নিজ নিজ সাবজেক্টের বই : কেউ ইকনমিকস, কেউ সাইকলযি, কেউ ফিলসফি, কেউ থিওলজি, আর কেউ বাংলা। সব বিষয়েই তারা ডিগ্রি লাভ করিয়াছে। কিন্তু ঐ সাবজেক্টের টেক্সট বুক ছাড়াও অনেকগুলি ইংরাজি নাটক, নভেল ও মিস্ত্রি বই তারা কিনিয়াছে ও কিনিয়া থাকে। ও সবই এখন আমার এই অবসরজীবনের প্রধান খোরাকি।
কেউ কেউ আছেন যারা বই পড়েন, কিন্তু কিনেন না। আবার কেউ কেউ আছেন বই কিনেন, পড়েন না। প্রথম শ্রেণীর লোকেরা পরের বই একবার হাতাইতে পারিলে আর ফেরত দেন না। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা বৈঠকখানা সাজাইবার জন্য বুক কেস করেন। এই উভয় শ্রেণীর লোকই মন্দের ভাল। পরের বই নিয়া যদি পড়েন এবং পড়ার পরে যদি ফেরত নাও দেন তবু ভাল। পড়িলেন ত। দেশের জন্য এটাই লাভ আর যারা বই কিনিয়া লাইব্রেরি সাজান, পড়েন না, তাঁরাও ভাল যদি তারা অপরকে সে বই পড়িতে দেন। আগের দিন জমিদাররা বই কিনিয়া বড় বড় লাইব্রেরি সাজাইতেন, নিজেরা খুব কমই পড়িতেন। কিন্তু অপরকে তাঁরা পড়িতে দিতেন। ময়মনসিংহ জিলার জমিদারদের অনেকেরই ভাল ভাল লাইব্রেরি ছিল। সেখান হইতে আমি অনেক বই পড়িতে পাইয়াছি।
