কিন্তু হোস্টেলে গেলাম। দেখিলাম আমার যেসব বন্ধু কলেজ ছাড়িয়া খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়াছিলেন, তাঁদের অনেকেই হোস্টেলে ফিরিয়া আসিয়াছেন। নূতন নামকরা এমএ ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে মি. আলতাফ হোসেনকে (পরে ডন-এর এডিটর), মি. যাকির হোসেন (পরে আইজি ও গভর্নর), মো. সিরাজুল ইসলাম (পরে জুডিশিয়াল সার্ভিস ও খান বাহাদুর) প্রভৃতি অনেকের সাথে পরিচিত হইলাম। এঁরাও আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে অনুরোধ করিলেন। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল রহিলাম।
‘গ্র্যাজুয়েট হইয়া থাক, স্বরাজ হইলেও ওটা কাজে লাগিবে’, ল্যাংলি সাহেবের এই কথাটা কাজে লাগিবার জন্য স্বরাজপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হয় নাই। মাত্র পাঁচ বছর পরেই কাজে লাগিয়াছিল। গান্ধীজির প্রতিশ্রুতিমত এক বছরে স্বরাজ না হওয়ায় এবং ইতিমধ্যে আন্দোলনে ভাটা পড়ায়, অধিকন্তু হিন্দু-মুসলিম বিরোধ জটিল হইয়া উঠায় স্বরাজের সম্ভাবনা আরো দূরে চলিয়া যায়। আমি ১৯২৬ সালে রিপন ল কলেজে ভর্তি হইলাম। ১৯২৯ সালে ফার্স্ট ক্লাস পাইয়া ফাইনাল পাশ করিলাম।
.
১২. সমকালীন শিক্ষা কারিকুলাম
আমাদের ছাত্রজীবনে উচ্চশিক্ষা মাত্র দুই প্রকারের ছিল : আর্ট ও সায়েন্স। ডিগ্রিও ছিল দুই প্রকারের : ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ), ব্যাচেলার অব সায়েন্স (বিএসসি) ও মাস্টার অব আর্টস (এমএ), মাস্টার অব সায়েন্স (এমএসসি)। আজকাল আর্টস’-এর বদলে বলা হয় হিম্যানিটিস’। আর উচ্চশিক্ষার শ্ৰেণীও দুইটার স্থলে তিনটা করা হইয়াছে, বাণিজ্য যোগ করা হইয়াছে। তার উপর মেয়েদের জন্য ‘হোম ইকনমিকস’ যোগ করিয়া চারটা করা হইয়াছে। মেয়েদের হোম ইকনমিকসের মত পুরুষদের জন্য ডিগ্রি ইন এগ্রিকালচারও যোগ করা হইয়াছে। এগ্রিকালচারের কলেজ অবশ্য আগেও ছিল। কিন্তু গোটা উপমহাদেশে ছিল মাত্র একটা। এখন বাংলাদেশেই একটা এগ্রিকালচারের ইউনিভার্সিটি করা হইয়াছে।
এসব সংস্কার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ঠিকই হইয়াছে। যেসব দেশ শিক্ষা সভ্যতায় আমাদের দেশের চেয়ে অগ্রগামী, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকেই এসব হইয়াছে এবং আমরা তাদের অনুসরণ করিয়াছি মাত্র। ধরুন, আর্টসের জায়গায় হিউম্যানিটিসের প্রবর্তন। আগেরটাও যেমন ঠিক ছিল না, পরেরটাও তেমনি ঠিক নয়। আর্ট’-কেও যেমন আমরা শিল্প, কারিগরি বা দক্ষতা ইত্যাদি রূপে বাংলায় তর্জমা করিতে পারিতাম না, এখনকারটাকেও আমার মানবিকতায় তর্জমা করিতে পারি না। তবু আমরা নিঃশঙ্কচিত্তে যেমন আগেরটা ব্যবহার করিয়াছি, এখনকারটাও তেমনি নিঃশঙ্কচিত্তেই ব্যবহার করিতেছি। ব্যাচেলার কথাটাকে ‘অবিবাহিত পুরুষ’ তর্জমা করিতে পারি নাই। আজও পারি না। তবু ডিগ্রিটার নাম ‘ব্যাচেলার আগেও বলিয়াছি এখনও বলিতেছি। বলিতেছি এইজন্য যে আসলে এসব শব্দের দ্বারা আমরা কী বুঝাইতে চাই, তা যতই আর্বিট্রারি বা অযৌক্তিক হউক, সকলে একই রকম বুঝিয়া থাকি। ব্যস, তাতেই কাজ হইল। উন্নততর, মানে অধিকতর স্পষ্ট অর্থজ্ঞাপক, শব্দের অনুসন্ধান করিতে গেলে অধিকতর জটিলতার সম্মুখীন হইব বলিয়াই আমরা অনুকরণযোগ্য ভদ্রলোকদের অনুকরণ করি। কিন্তু বিষয়-বস্তুর পরিবর্ধন বিস্তৃতিকরণ এবং তদনুসারে ডিগ্রির সংখ্যা বৃদ্ধিটা তেমন অযৌক্তিক বা অনাবশ্যক নয়। আমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এলাকা, আয়তনক্ষেত্র, অঞ্চল ও পরিমণ্ডল সম্বন্ধে আমাদের ধারণা ও জ্ঞান যতই অধিক ও ব্যাপক হইতেছে, উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি সংখ্যাও ততই বাড়িবে এটা খুবই স্বাভাবিক। একই শিক্ষার্থীর পক্ষে এই পরিমণ্ডলের সব জ্ঞানের বোঝা একই সঙ্গে একই মস্তকে বহন করা কঠিন বলিয়া জ্ঞানের ক্ষেত্রকে খণ্ড খণ্ড করিয়া এক এক বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষজ্ঞ তৈয়ার করার ব্যবস্থার উদ্দেশ্যটাও সাধু ও বাস্তবধর্মী। সুখের বিষয় বর্তমানের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্রমে শিক্ষানীতি ও কারিকুলামে এই বাঞ্ছিত পরিবর্তন প্রবর্তন করিতেছেন।
.
১৩. শিক্ষাজীবনের শেষ নাই
এইভাবে প্রথমে ১৯২১ সালে এবং দ্বিতীয় বারে ১৯২৯ সালে আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়। কিন্তু আমার শিক্ষাজীবনও কি ঐ সঙ্গে শেষ হইয়াছিল? এই অধ্যায়ের শিরোনাম, আমার শিক্ষাজীবন। কাজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় : কলেজ-ভার্সিটি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি মানুষের শিক্ষাজীবন শেষ হয়? এটা বড় প্রশ্ন। শাশ্বত সনাতন প্রশ্ন। যুগে যুগে এ প্রশ্ন উঠিয়াছে। শিক্ষাবিদেরাও বলিয়াছেন, মানুষের শিক্ষাজীবন কখনও শেষ হয় না। কথাটা কি সত্য? সত্য হইলেও কত জনের জন্য, কার কার জন্য সত্য? কীভাবে সত্য? আমরা প্রায়শ দেখি, দর্শনশাস্ত্রে এমএ পাশ করিয়া আমাদের কত তরুণ ব্যাংকের কেরানি বা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরি চাকরি গ্রহণ করিয়াছেন। তাঁদের কি শিক্ষাজীবনের নিরবচ্ছিন্নতা বা ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে। ব্যাংকের কেরানি প্রৌঢ় বয়সে যখন ম্যানেজার হইয়া সাব-ইন্সপেক্টর যখন ডিএসপি হইয়া রিটায়ার করেন, তখন তাদের দর্শনশাস্ত্রে না হউক, আর কোন শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি বাড়িয়াছে? বয়সের অভিজ্ঞতা লাভ তাঁরা করিয়াছেন নিশ্চয়ই এবং সেটা হইয়াও থাকিতে পারে বিপুল উভয়ের বেলাতেই। কিন্তু অধ্যয়নের শিক্ষাও হইয়াছে কি? ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে, তা হয় নাই। সত্য কথা এই যে কলেজজীবন শেষ করিয়া কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিবার পর শিক্ষাজীবনের নিরবচ্ছিন্নতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ঘটিয়া থাকে আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের খুব কম লোকের ভাগ্যেই। বরঞ্চ উল্টাটাই সত্য সংসার-জীবনে ঢুকিয়া কলেজে-ভার্সিটিতে অর্জিত বিদ্যা ভুলিয়া যাওয়াই আমাদের দেশের সাধারণ নিয়ম। জ্ঞান অর্জনের জন্য বই-পুস্তক পড়া ত দূরের কথা, আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাসও এদেশে খুবই কম।
