দ্বিতীয় বছর আমার লাফের দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় ফুট কমিয়া যায়। মোত্তালেব সাহেব সেইবার ফার্স্ট হন। আমার অধঃপতনের কারণ এই যে আমি সেইবার ফুটবল খেলিতে গিয়া হাঁটু মচকাইয়া ছিলাম। সে মচকানটা এত সাংঘাতিক হইয়াছিল যে আমাকে দুই-দুইবার হাসপাতালে ভর্তি হইতে হইয়াছিল। জীবনে আর তা সারে নাই। এই বৃদ্ধ বয়সেও সেই মচকানো হাঁটু নিয়া কষ্ট পাইতেছি।
.
৯. গলা সাধনা
বর্তমানে তরুণ বন্ধুরা শুনিয়া তাজ্জব হইবেন যে হোস্টেলের আনন্দমেলায় আমি শুধু ফুট বাজাইতাম না, গানও গাইতাম। ছেলেবেলা হইতেই আমার গলা ভাল ছিল। খোশ কুফী ও মিসরি ইলহানে আমি ছেলেবেলা যখন কোরআন তেলাওয়াত করিতাম, তখন অনেক কারী-মৌলবীও কান পাতিয়া শুনিতেন। আমি চাচাজীর নিকট এই ইলহান শিখিয়াছিলাম। আমার খোশ ইলহান শুনিয়া দরিরামপুর মাদ্রাসার কয়েক বন্ধু আমাকে গজল শিখান। জগন্নাথ কলেজে পড়িবার সময় আমি আমিন সাহেবের নিকট বাঁশি শিখি এবং হারমোনিয়ামে সারেগামা সাধি। আমিন সাহেব অবশ্য আমাকে হুঁশিয়ার করিয়া দিয়াছিলেন যে, গানের গলা রাখিতে গেলে আমাকে বাঁশি ছাড়িতে হইবে। আমি তা ছাড়ি নাই। ফুট, বাঁশি ও আড়বাঁশি বাজানো আমার একটা নেশা হইয়া গিয়াছিল। তাতে খুব দ্রুতগতিতে আমার গলা পড়িয়া যায়। বর্তমানে আমার গলা শুধু বেসুরা বা হোর্স হইয়াই যায় নাই; উদারার সপ্তগ্রামের প্রথম দুইটা ঘাট সা এবং রে একদম বন্ধ হইয়া গিয়াছে। ফলে বক্তৃতায়, এমনকি সাধারণ বৈঠকি আলাপেও নিম্ন গ্রামে আমার কথা মিলাইয়া বা ফেড আউট করিয়া যায়। ফলে জোর দিয়া কথা বাহির করিতে হয়। এক বন্ধুর এবং অনেকের ধারণা আমি চিল্লাইয়া কথা বলি। যারা জানেন না, তাঁরা ভাবেন আমি রাগ করিয়াছি।
.
১০. মধ্যম রকমের ভাল ছাত্র
ছাত্র হিসাবে আমি মধ্যম শ্রেণীর ভাল ছাত্র ছিলাম। প্রথম শ্রেণীর প্রতিভাধর ছিলাম না। ইউনিভার্সিটিতে নাম করিবার মত কিছু ছিল না। তবু যতটুকু পারিতাম সাহিত্য ও রাজনীতি আমাকে তা-ও করিতে দেয় নাই। আমি দিবারাত্র আউট বই লইয়া থাকিতাম। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্রদের অনেকেই আউট বই পড়িয়াও পরীক্ষায় নাম করিয়াছেন। কাজেই শুধু আউট বই পড়াকেই আমার পরীক্ষার ভাল না করার জন্য দোষী করা যায় না। কিন্তু আমি ছিলাম একদম ‘হোল-হগার ওয়ান ট্র্যাক মাইন্ড’ যাকে বলে একরুখা। যখন যেটা ধরিতাম, সেটার শেষ না দেখিয়া ছাড়িতাম না। অনার্স নিয়াছি দর্শনে, কলেজ লাইব্রেরিতে রিসার্চ শুরু করিলাম ইতিহাসে। এক বই-এ আরেক বইয়ের রেফারেন্স পাইয়া সেই বই ধরিতাম। সেটা হইতে আরেকটা। এইভাবে দিনের পর দিন ও সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটাইয়া দিতাম। দর্শনে অনার্সের ছাত্রকে যদি রিসার্চ করিতে হয় তবে দর্শনেই করা দরকার। এ উপদেশ কেউ যদি দিতেন এবং সেটা যদি আমি পালন করিতে যাইতাম তবে সে পথেও শেষ দেখিতে চাইতাম। আমাদের পাঠ্যবইয়ে কান্ট, হেগেল, কোতে, ডেকার্টে, স্পিনোজা, মিলের কোটেশনে সন্তুষ্ট থাকিতাম না। তাদের মূল বই দেখিতে চাইতাম। এবং একটা খুলিয়া দশটায় জড়াইয়া পড়িতাম। ফলে আমি বোধ হয় পরীক্ষার পাশের দিক হইতে চিনিখোরের জায়গায় চিনির বলদ হইয়া গেলাম। সহপাঠীর নজরে পণ্ডিত হইয়া উঠিলাম; কিন্তু শিক্ষক ও পরীক্ষকদের কাছে মূর্খই রহিলাম।
.
১১. ল্যাংলি সাহেবের শেষ উপদেশ
এর উপর বিএ পরীক্ষার কয়েস মাস আগে হইতেই খিলাফত ও নন্কো আন্দোলনে মাতিয়া উঠিলাম। ইব্রাহিম সাহেব এই আন্দোলনে আমাদের নেতা। তার এবং বরিশালে আবুল কাসেম নামে এক সহপাঠীর প্রেরণায় খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিলাম। এবং বিএ পরীক্ষা দিব না বলিয়া হোস্টেল ছাড়িয়া বাড়ি চলিয়া গেলাম। ল্যাংলি সাহেব আমাকে সত্যই স্নেহ করিতেন। তিনি আমাকে তার সাথে দেখা করিবার জন্য বাড়ির ঠিকানায় পত্র দিলেন। আমি তাঁর আদেশ পালন করিলাম। তার সাথে দেখা করিলাম। তিনি আমাকে পরীক্ষাটা দিতে অনুরোধ করিলেন। আমি প্রস্তুতির অভাবের অজুহাত দিলাম। তিনি আমার সব কথা শুনিয়া বলিলেন : ‘পরীক্ষাটা তুমি দাও। অনার্স যদি নাও পাও পরীক্ষায় তুমি ফেল করিবে না। গ্র্যাজুয়েটটা ত হইয়া থাক, স্বরাজ হইলেও ওটা কাজে লাগিবে।’
আমি পরীক্ষা দিলাম। অনার্স পাইলাম না। পাশ করিলাম। পরীক্ষার ফল বাহির হইবার পর আবার ল্যাংলি সাহেব আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। দেখা করিলাম। অনার্স না পাওয়ায় তিনি আমার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিলেন। তিনি বলিলেন, অনার্স না পাওয়ার সম্ভাবনার কথা তিনি বলিয়াছিলেন বটে কিন্তু সত্য-সত্যই তাই ঘটিবে এটা তিনি বিশ্বাস করিতেন না। আমি অনার্স না পাওয়ায় তিনি বিস্মিত হইয়াছেন। এই বদনাম লইয়া আমার কলেজ ছাড়া উচিৎ হইবে না। আমার এমএ ক্লাসে ভর্তি হওয়া উচিৎ।
তখন নয়া ঢাকা ইউনিভার্সিটির কাজ শুরু হইয়াছে। নয়া ইউনিভার্সিটিতে অনেক সুবিধা পাওয়া যাইবে বলিয়াও ল্যাংলি সাহেব আমাকে অনেক আশা ভরসা দিলেন। আলীগড় হইতে কয়েকজন ভাল ছাত্র আসিয়া এখানে ভর্তি হইয়াছেন বলিয়া তিনি তাদের সাথে আমাকে দেখা করিতেও বলিলেন।
আমি এতদিনে কংগ্রেস-খিলাফত আন্দোলনে গলা পর্যন্ত ডুবিয়া গিয়াছি। মহাত্মাজীর এক বছরে স্বরাজ পাওয়া সম্বন্ধে পূর্ণ বিশ্বাসী। সুতরাং এই কয় মাসের জন্য ইংরাজের গোলামখানায় ঢুকিতে আমি রাজি হইলাম না।
