কলেজের অধ্যাপকদের মধ্যে প্রিন্সিপাল ললিত চ্যাটার্জি মহাশয় ছাড়াও আরো নামকরা অনেক অধ্যাপক ছিলেন। দর্শনের অধ্যাপক উমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ইতিহাসের অধ্যাপক মি. পি গুপ্ত, ইংরাজির অধ্যাপক সতীশ চন্দ্র সরকার, অধ্যাপক ফণীন্দ্র নাথ রায় প্রভৃতি অনেকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসের অধ্যাপক মি. পি গুপ্ত অধ্যাপনায় ত ভাল ছিলেনই, চেহারা-ছবি ও পোশাকেও তিনি ছিলেন একেবারে ইংরাজ। বিশেষত, তিনি ছিলেন বিখ্যাত অধ্যাপিকা তটিনী গুপ্তার স্বামী। তৎকালে সারা ভারতে এবং ভারতের বাইরেও মিসেস তটিনী গুপ্তা ছিলেন জ্ঞানে প্রতিভায় বিস্ময় ও শ্রদ্ধার পাত্রী। অধ্যাপকদের মধ্যে শ্রীযুক্ত সতীশ চন্দ্র সরকার ছিলেন শুধু জগন্নাথ কলেজের নয়, সকল কলেজ-স্কুলের ছাত্রদের এবং ঢাকাবাসী সকলের ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র। অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করিয়া ইনি ন্যাশনাল কলেজ ও ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল স্থাপন করেন। কলেজটি চলে নাই। কিন্তু মেডিকেল স্কুলটি আজও আছে।
.
৭. ঢাকা কলেজ–এস এম হোস্টেল
১৯১৯ সালে আইএ পাশ করিয়া আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। বিশ্বযুদ্ধের দরুন পাটের দাম কিছুটা বাড়িয়া যাওয়ায় সব পাটচাষির মতই আমার বাপের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভাল হয়। এই সুযোগে আমি এস এম হোস্টেলেই উঠি। পরবর্তী জীবনে বড় হইয়াছিলেন এমন অনেক ভাল-ভাল ছাত্রের সাথে পরিচিত হই এই হোস্টেলে। এই হোস্টেলে তখন আসাম সরকারের অন্যতম মন্ত্রী কাছাড় হাইলাকান্দিবাসী মি. আবদুল মোত্তালেব মজুমদার, ডা. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক যহুরুল ইসলাম, হাইকোর্টের বিচারপতি মি. মোহাম্মদ ইব্রাহিম, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মি. মিজানুর রহমান, আইন পরিষদের ডি. স্পিকার মরহুম মোহাম্মদ শাহেদ আলী, আইজিআর মি. সাদেক খা, এককালীন গভর্নর রাষ্ট্রদূত মি. সুলতান উদ্দিন আহমদ, পুলিশের আইজি মি. শামসুদদোহা, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মি. আফতাঁবুদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ হাসান আলী, ইনকাম ট্যাক্স অফিসার আবদুল আজীজ ডি. ম্যা. মি. আবদুল মজিদ মোল্লার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজাদ সম্পাদক মি. আবুল কালাম শামসুদ্দিনও এই হোস্টেলের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি কলিকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হইয়া কারমাইকেল হোস্টেলের বাসিন্দা হন।
আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হইবার অল্পদিন পরেই জগন্নাথ কলেজের দর্শনের অধ্যাপক বিখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য মহাশয় ঢাকা কলেজের দর্শনের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তিনি জগন্নাথ কলেজে আমাদিগকে তর্কশাস্ত্র পড়াইতেন। তর্কশাস্ত্রে আমার কৃতিত্বে সন্তুষ্ট হইয়া বিএতে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স লইবার জন্য তিনি আমাকে তখনই উপদেশ দিয়াছিলেন। তাঁর উপদেশমতই আমি দর্শনশাস্ত্রে অনার্স লইয়াছিলাম। তিনি ঢাকা কলেজে যোগ দিয়া আমাকে দর্শনের অনার্স ক্লাসে দেখিয়া খুব সন্তুষ্ট হন। ঢাকা কলেজের দর্শনের প্রধান অধ্যাপক ছিলেন তখন অধ্যাপক ল্যাংলি। তিনি পরবর্তীকলে দর্শনে পিএইচডি পাইয়াছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার হইয়াছিলেন। অধ্যাপক ল্যাংলি ও অধ্যাপক উমেশ ভট্টাচার্য আমাদের দর্শনের অনার্স ক্লাস লইতেন। আমি জগন্নাথ কলেজ হইতেই উমেশবাবুর প্রিয় পাত্র ছিলাম। ক্লাসে ও পরীক্ষায় ভাল করিয়া আমি ল্যাংলি সাহেবের প্রিয় পাত্র হইয়া উঠিলাম।
.
৮. খেলাধুলা
জগন্নাথ কলেজে দুই বছর ধরিয়া খেলাধুলায় যে উপাস করিয়াছিলাম, ঢাকা কলেজে সে ক্ষুধা পুরাপুরি মিটাইলাম। খেলাধুলায় আমার বরাবরই খুব বেশি ঝোঁক ছিল। ঢাকা কলেজে ও হোস্টেলে খেলার সরঞ্জাম ও মাঠের সুবিধা প্রচুর পাওয়ায় খেলার ঝোঁকও আমার বাড়িল। ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন সব রকমের খেলাতেই অংশগ্রহণ করিতাম স্কুলজীবনেই। ঢাকা কলেজে আসিয়া টেনিস ও হকি খেলার সুযোগ পাইলাম। ফুটবল, ক্রিকেটে মোটামুটি ভাল খেলোয়াড় ছিলাম বটে, কিন্তু কলেজের এগার জনের একজন কখনো ছিলাম না। কিন্তু হোস্টেলে-হোস্টেলে কম্পিটিশনের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলাম।
এই সব খেলায় মধ্যম শ্রেণীর খেলোয়াড় হইলেও লাফালাফি দৌড়াদৌড়িতে কিন্তু প্রধানদের মধ্যে একজন ছিলাম। বস্তুত, কলেজের বার্ষিক স্পোর্টসে লং জাম্প এবং হাই জাম্পে একবার প্রথম ও আরেকবার দ্বিতীয় হইয়াছিলাম। কাজী মোতাহার হোসেন, মি. আবদুল মোত্তালেব ও আমি এই তিনজনই ছিলাম এই লাফালাফিতে শ্রেষ্ঠ। লং জাম্পে আমার ও মোত্তালেব সাহেবের মধ্যে প্রতিযোগিতা হইত, আর হাই জাম্পে কাজী। সাহেব ও আমার মধ্যে প্রতিযোগিতা হইত। আমি যে বছর লং জাম্পে প্রথম হইয়াছিলাম সেইবার আমার লাফের দৈর্ঘ্য ছিল উনিশ ফুট দুই ইঞ্চি। পরে শুনিয়াছি আমার লাফের ঐ দৈর্ঘ্য বেশ কিছুকাল রেকর্ড ছিল। লম্বা লাফে আমার এই সাফল্যের কারণ সম্বন্ধে বন্ধুরা বলিতেন যে আমি লাফ দিয়া শূন্যে উঠিয়া দুই হাতে কাক-চিলের মত ডানা মারিয়া উড়িয়া যাইতাম। কথাটা ঠিক কিনা আমি জানিতাম না। কিন্তু আমি নিজে যেটা বুঝিতাম সেটা এই যে আমি জাম্পিং গ্রাউন্ড হইতে হাওয়ায় উড়িয়া ফলিং গ্রাউন্ডে পড়িয়া যাইতাম না। শূন্যে উঠিয়া হাত-পা ও কোমরের জোরে অন্তত দুইটা ঢেক্কর মারিতাম। আমি বুঝিতাম ঐ ঢেক্করে কমসে কম দুই ফুট জায়গা আমি আগাইয়া যাইতাম।
