হাকিম সাহেব নিজে ছিলেন একজন স্বল্পভাষী গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি আরবি-ফারসিতে বেশ লিয়াকত রাখিতেন। নিজের বিদ্যার বড়াই তিনি কখনও করিতেন না। কিন্তু আমি অল্প দিনেই তাঁর পরিচয় পাইলাম। ফারসি আমার দ্বিতীয় ভাষা ছিল। আমি হাকিম সাহেবের ছেলেমেয়েদের পড়াইবার সময় সঙ্গে সঙ্গে নিজের পাঠ্যবইও পড়িতাম। আমি ফারসি টেক্সট বই পড়ার সময় হাকিম সাহেব দাওয়াখানা হইতে ফিরিয়া আসিলে প্রায়ই সাদী, হাফেয, রুমী, ফেরদৌসী ও জামী লইয়া আমার সহিত আলোচনায় বসিতেন। কবিদের সম্বন্ধে আমার অজানা অনেক তথ্য বর্ণনা করিতেন এবং আমার পাঠ্যবইয়ের বাইরের অনেক কবিতা আবৃত্তি করিতেন।
হাকিম সাহেব মোটামুটি খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক ছিলেন। মৌলবী বাজারে তার দাওয়াখানা ছিল। বন্ধুবান্ধবসহ বাজারে সওদা করিতে বা বেড়াইতে গেলে হাকিম সাহেবের দোকানের সামনে দিয়া যাইতে হইত। সুযোগ পাইলেই দাওয়াখানায় ঢুকিতাম। দেখিতাম তার রোগী সংখ্যা অনেক। আমাদেরে দেখিলে তিনি বসিতে বলিতেন। সুবিধা হইলে বসিতামও। অবসর পাইলে তিনিও আমাদেরে আগের দিনের এবং হিন্দুস্থানে (মানে দিল্লি-লাখনৌসহ উত্তর-ভারতে) বর্তমানেও হাকিমি বিদ্যার আদর ও মর্যাদা বর্ণনা করিতেন। আমি তাতে এ বিষয়ে বেশ কিছু জ্ঞান লাভও করিয়াছিলাম।
হাকিম সাহেবের নিকট আমি উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতাও শিখিয়াছিলাম। তিনি অনেকবার আমাদের গ্রামে গিয়াছেন। কাজেই জানিতেন আমরা গোড়া মোহাম্মদী। গোর-পীর পূজার আমরা ভয়ানক বিরোধী। মহল্লার লোকেরা এবং সহপাঠী ছাত্ররা প্রায় সবাই ছিলেন হানাফী। এই লইয়া সহপাঠীদের সাথে আমার যে তর্ক ও বাদ-বিতণ্ডা হইত, তাতে অনেক সময় অপ্রিয়তারও সৃষ্টি হইত। এই ধরনের ঘটনায় হাকিম সাহেব প্রকাশ্যে আমার পক্ষ লইতেন, গোপনে আমাকে উদার হইতে উপদেশ দিতেন। এমন একটি ঘটনার কথাই বইয়ের অন্যত্র উল্লেখ করিয়াছি।
প্রায় দেড় বছর হাকিম সাহেবের বাড়িতে যায়গীর থাকিয়া আইএ ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বাদামতলী ঘাটের এক মেসে যাই। এটা ছিল ছাত্র ও অফিসারদের একটি মিশ্রিত মেস।
এই মেসে আমি মাত্র মাস কয়েক ছিলাম। এখান হইতেই আইএ ফাইনাল দেই। ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করি। কিন্তু কোনও স্কলারশিপ পাই না। এই মেসে আমিন সাহেব নামে একজন কেরানি থাকিতেন। তিনি খুব ভাল ফুট বাজাইতেন। আমার পরীক্ষার পড়ায় ব্যাঘাত হইবে বলিয়া তিনি বেশি রাত্রে মেসের খোলা সেহানে বসিয়া বাঁশি বাজাইতেন। বাঁশির সে মিঠা আওয়াজে আমার ও মেসের আরো অনেকের ঘুম ভাঙ্গিয়া যাইত। আমরা আর বিছানায় শুইয়া থাকিতে পারিতাম না। সেহানে আসিয়া আমি তার পা ঘেঁষিয়া বসিতাম। এই আমিন সাহেবের নিকট আমি ফুট বাজানো শিখিয়াছিলাম এবং পরবর্তী ছাত্রজীবনে বাঁশিবাদক হিসাবে নাম করিয়াছিলাম।
দুই বছরের জগন্নাথ কলেজ-জীবন আমার মোটামুটি সুখেই কাটিয়াছিল। ভাল-ভাল প্রফেসারের কাছে পড়িবার আনন্দ পাওয়া ছাড়াও জগন্নাথ কলেজে আমার একটা নূতন অভিজ্ঞতা লাভ হয়। স্কুল-কলেজের এত বড় লাইব্রেরি থাকিতে পারে, জগন্নাথ কলেজেই প্রথম এই জ্ঞান লাভ করি। লাইব্রেরির বিশালতায়, বইয়ের সংখ্যায় ও নাম না-শোনা ও চোখে না-দেখা বহু বড় বড় আকারের বই দেখিয়া আমি লাইব্রেরিটার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়ি। ক্লাসে পড়া না থাকিলে অথবা অন্যভাবে অবসর পাইলেই আমি লাইব্রেরিতে ঢুকিতাম। অল্পক্ষণেই লাইব্রেরিতে ডুবিয়া পড়িতাম। সবচেয়ে বেশি ডুবিতাম ইতিহাসের বইয়ে। ইতিহাস মানে আরব জাতি ও মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাস। খলিফা ওমরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিটি পোড়াইবার গল্পটি যে সম্পূর্ণ বানোয়াট, ঐতিহাসিক বাটলারের বই হইতে এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখি এই সময়ে। এগুলি আল-ইসলাম-এ ছাপা হয়। এইভাবে ইতিহাসের আউট বুকে এতটা মাতিয়া উঠি যে ইতিহাসের টেক্সট বুকগুলির প্রতি অবহেলা করি। ফলে অন্যান্য বিষয়ে ৮০-এর উপর নম্বর পাইয়াও ইতিহাসে মাত্র ৩৬ নম্বর পাইয়া কোনও মতে ফার্স্ট ডিভিশনে আইএ পাশ করি।
খেলাধুলায় শখ ছিল ছেলেবেলা হইতেই। কিন্তু জগন্নাথ কলেজের দুই বছর ফুটবল-ক্রিকেট হইতে বঞ্চিত থাকি। জগন্নাথ কলেজের নিজস্ব কোনও খেলার মাঠ ছিল না। কলেজের পিছন দিকে যে খানিকটা খোলা জায়গা ছিল, তাতে ফুটবল-ক্রিকেট খেলা চলিত না। তবু তার মধ্যে আমরা কোনো রকমে খেলা চালাইতাম। বল ক্যাচিং-এ অর্থাৎ গায়ের জোরে খুব উঁচায় ক্রিকেট বল ছুড়িয়া তা ধরায়, এই সময়ে আমার নাম ছিল। এমনি খেলায় একবার বল ধরিতে গিয়া আমি আহত হই। অসমান মাঠে উপর দিকে চাহিয়া দৌড়াইতে গিয়া হোঁচট খাইয়াছিলাম। ফলে বল পড়ার সম্ভাব্য স্থান হইতে বেশি আগাইয়া গিয়াছিলাম। তাই পিছন দিকে কাত হইয়া হাত বাড়াইয়া বল ধরিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। বল হাত হইতে পিছল-ফসকিয়া চোখের নিচ দিকে গালে পড়ে। মুহূর্তে গাল-চোখ ফুলিয়া বাম চোখ একদম বন্ধ হইয়া যায়। এটা ছিল একটা অ্যানুয়েল স্পোর্টসের দিন। অধ্যাপকেরাও অনেকে দর্শকরূপে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের ও বন্ধুদের সমবেত উদ্যমে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা হইয়াছিল।
