.
৫. হোস্টেল-জীবন বনাম যায়গীর-জীবন
হোস্টেল-জীবনের কথা শুরু করিবার আগে যায়গীর-জীবন সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার। এই দেড় বছরের যায়গীর-জীবন একাধিক কারণে একাধিক দিক হইতে আমার নয়া অভিজ্ঞতার উৎস হইয়াছিল। ভবিষ্যৎ জীবনে সে অভিজ্ঞতা খুবই কাজে লাগিয়াছিল। প্রথম ও সর্বাপেক্ষা মূল্যবান যে শিক্ষালাভ করি, তা ছিল ছাত্র হিসাবে আভিজাত্য-বোধের অবসান। স্কুলজীবনের চার বছর হোস্টেলে কাটাইবার সময় নিজের অজ্ঞাতেই যায়গীরবাসী ও হোস্টেলবাসী ছাত্রদের মধ্যে একটা আভিজাত্যের সীমারেখা টানিতে শিখিয়াছিলাম। হোস্টেলবাসী ছাত্ররা সুপিরিয়র ও যায়গীরবাসী ছাত্ররা ইনফেরিয়র। হোস্টেলবাসীরা নিজের টাকায় খায় আর যায়গীরবাসীরা পরের খায়। এই কারণে হোস্টেলবাসীরা ধনী বাপের ছেলে আর যায়গীরবাসীরা গরীব বাপের ছেলে; পার্থক্যটা শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কারণ শহরতলী ও অদূরবর্তী পাড়াগাঁয়ে যেসব ছাত্র নিজের বাড়ি হইতে স্কুলে পড়িতে আসিত, আমরা হোস্টেলবাসীরা তাদেরেও কিছুটা অবজ্ঞা চোখে দেখিতাম। আমরা হোস্টেলবাসী ছাত্ররা অন্য সব ছাত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর, কিছুটা অভিজাত শ্রেণীর মনে করিতাম। আজকালকার ক্যাডেট কলেজের ছাত্ররা যেমন সাধারণ স্কুল-কলেজের ছাত্রদের থনে নিজেদেরে কিছুটা শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া থাকে, এমনি একটা মনোভাব আর কি?
আমার যায়গীর-জীবনে এই অহমিকা ভাঙ্গে। ভাঙ্গা কথাটা ব্যবহার করিলাম এই জন্য যে হোস্টেল-জীবন হইতে যায়গীর-জীবনে আমার এই পরিবর্তনটা প্রথম-প্রথম আমার মনঃপীড়ার কারণ হইয়াছিল। এটাকে একটা পতন মনে হইয়াছিল। বাপের দারিদ্র্যের ফলেই আমার এই পতন ঘটিয়াছিল। সুতরাং আমি আর অভিজাত শ্রেণীর ছাত্র নই। এটাই ছিল আমার মনঃপীড়ার কারণ।
এই মনঃপীড়ার যখন অবসান হইল, তখন নিজের দুর্ভাগ্যের সহিত আপস করার মত নিগেটিভ মনোভাব এটা ছিল না। যায়গীর-জীবনের একাধিক উপকারী দিকের সন্ধান লাভের মত পজিটিভ দিকও আমার চোখে উদ্ভাসিত হইল। প্রথমত, যায়গীর-জীবনে ছাত্ররা জনগণের মধ্যে বাস করিয়াই শিক্ষা লাভ করে; হোস্টেলবাসীর মত গণ-সমাজ-জীবন হইতে বিচ্ছিন্ন তারা হয় না। এই দিক হইতে যায়গীরবাসী ছাত্র হোস্টেলবাসীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয়ত যায়গীরবাসী ছাত্র পরের ভাত খায় এটাও ঠিক না। যায়গীর বাড়ির দু-চারজন ছেলেমেয়েকে তাদের পড়াইতে হয় বলিয়া তারা নিজের রোযগারী খানাই খায়। এই দিক হইতে শিক্ষাজীবনের আধুনিক বৈজ্ঞানিক নীতি আর্ন হোয়াইল ইউ লার্ন’, প্রয়োগ করিয়া থাকে এরাই। তৃতীয়ত, গণ সমাজ-জীবনে বাস করিয়া এরা শিক্ষা লাভ করে বলিয়া এরা সমাজের আচার-আচরণ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং মানবজীবনের সহিত ব্যাপকতর ক্ষেত্রে পরিচিত হয়। হোস্টেলবাসীর চেয়ে এদের শিক্ষা অধিকতর বাস্তববাদী, অতএব পরিপূর্ণ হইয়া থাকে। হোস্টেলবাসীর মত অসামাজিক অবাস্তব ও অপূর্ণ থাকে না। চতুর্থত, যায়গীরবাসী ছাত্র হোস্টেলবাসীর চেয়ে আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর মিতব্যয়ী ও বিষয়জ্ঞানী হইতে শিখে। পরিস্থিতি ও পরিবেশই এমন হইতে তাদেরে শিক্ষা দেয়। পরবর্তী জীবনের জন্য এ সবই অত্যাবশ্যক গুণ।
.
৬. ঢাকার মহল্লা-জীবন
এটা ত গেল শিক্ষা-সুযোগের সাধারণ উপকারিতার দিক। দেড় বছরের যায়গীর-জীবনে চুড়িহাট্টা মহল্লা সাধারণভাবে এবং হাকিম সাহেব ও তার পরিবার-পরিজন হইতেও আমি ব্যক্তিগতভাবে যে জ্ঞান ও উপকার পাইয়াছি, তারও কিছু উল্লেখ করা প্রয়োজন।
চুড়িহাট্টা মহল্লাটি সে সময়ে ছিল একটি নিম্নমধ্যবিত্তের মহল্লা। ঢাকা শহরের অধিকাংশ গলিকুচার মহল্লাগুলি তখন এমনি ছিল। বাসেন্দাদের বেশির ভাগ ছিল নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর। তাদের অধিকাংশের বিশেষত তাদের মধ্যেকার আদি ঢাকাবাসীদের ভাষা ছিল ঢাকাইয়া উর্দু। এরা প্রায় সবাই ছিল স্বভাব-রসিক। সে রসিকতায় উপমা, শব্দবিন্যাস, বাক-রীতি, প্রকাশ ভঙ্গি ছিল অপূর্ব, মৌলিক ও প্রাসঙ্গিক। ঘটনা ও পরিস্থিতি যতই আকস্মিক ও অভাবনীয় হউক, তার উপযোগী মওকা-মাফিক অদ্ভুত কল্পনাপ্রসূত রসিকতা যেন তাদের ঠোঁটের আগায় সদা প্রস্তুত থাকিত। ঘটনার আকস্মিকতার মতই তাদের রসিকতার আকস্মিকতাও দর্শক ও শ্রোতাকে তাক লাগাইয়া দিত।
চুড়িহাট্টা মহল্লার জনসাধারণও ছিল এমন ঢাকাবাসীর এক অংশ। অন্যান্য মহল্লার মতই চুড়িহাট্টাতেও বাদ-মগরেব বিভিন্ন বাড়ির সেহানে আচ্ছা বসিত। এইসব আড্ডার রসে-ভরপুর বিতর্ক-আলোচনা ছিল বিচিত্র। আগে-আগে হাকিম সাহেবের সেহানেও ছিল আড্ডাখানা। কিন্তু হাকিম সাহেবের ছেলেমেয়েদের পড়ার ব্যাঘাত হয় বলিয়া ঐ আড্ডা ক্রমশ কমিয়া যায়। এবং আমি ছেলেমেয়েদের মাস্টার হওয়ার পর আজ্ঞা একদম উঠিয়া যায়। অবশ্য কিছু দূরের বাড়ি-সমূহের সেহানে আড্ডা চলিতে থাকে। আমার দরুন আড্ডা ভাঙ্গায় আড্ডাবাযরা অসন্তুষ্ট হইয়াছেন ভাবিয়া তাদেরে খুশি করিবার আশায় আমি মাঝে মাঝে তাঁদের আড্ডায় যাইতাম। কিন্তু লক্ষ্য করিতাম আমার উপস্থিতিতে আড্ডার স্বাভাবিক স্ফূর্তি বিঘ্নিত হইত। মন খুলিয়া তাঁরা হাসি-তামাশা করিতে পারিতেন না। ‘মাস্টার সাব’ বলিয়া তাঁরা আমাকে সম্বোধন করিতেন এবং উপযুক্ত সম্মান করিতেন বলিয়াই বোধ হয় এরূপ হইত। তাই আমিও আস্তে আস্তে তাঁদের আড্ডায় যাওয়া ছাড়িয়া দিলাম।
