.
৪. কেতাবি সাধুতা বনাম বিষয়ী সাধুতা
এতক্ষণে পাঠকেরা নিশ্চয়ই বুঝিয়াছেন, কেন আমি বন্ধুদের নাম উল্লেখ করিলাম না। ঐ বন্ধুদের দুইজন ছাড়া আর সবাই বাঁচিয়া আছেন। তারা সকলেই আজ সম্মানিত ব্যক্তি। কিছুদিন আগে পর্যন্ত উচ্চপদস্থ ছিলেন। স্বভাব-চরিত্রে তারা সে সম্মানের যোগ্যও ছিলেন। নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও পদমর্যাদার সুযোগ লইয়া এঁরা কেউ কখনও অন্যায়-অসৎ উপায়ে অন্যের সম্পত্তি বা টাকা-পয়সা হস্তগত করিয়াছেন, এমন বদনাম এঁদের একজনেরও নাই। এঁরাই যৌবনে ঐ মনোভাবের পরিচয় দিয়াছিলেন। নিজের সাধুতার ফুটানি করিবার উদ্দেশ্যে অথবা বন্ধুদের নীতি-বোধকে হেয় করিবার মতলবেও এ ঘটনার উল্লেখ করিতেছি না। ঘটনা যেরূপ ঘটিয়াছে, অবিকল তাই বলিতেছি। বরঞ্চ সাধুতার ফুটানি করিবার মুখ আর আমার নিজেরই নাই। যখন এটা লিখিতেছি তখন আমার ঐ বন্ধুদের সকলেরই সুনাম অক্ষুণ্ণ ও চরিত্র নিষ্কলঙ্ক রহিয়াছে। আমি কয়েক মাস মন্ত্রিত্ব করিয়াই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও নিম্ন আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হইয়াছিলাম। মাত্র উচ্চ আদালত হইতেই খালাস পাইয়াছিলাম। এ অবস্থায় নীতিবোধে আমি বন্ধুদের থনে শ্রেষ্ঠ, এ কথা বলিবার আমার অধিকারও নাই। বলিলে কেউ বিশ্বাসও করিবেন না। তবু এই ঘটনার উল্লেখের যদি কোনও মতলব ধরা যায় তবে সেটা সাধুতার ফুটানি করিবার জন্য নয়, বরং তেমন ফুটানির নিন্দা করিবার জন্যই।
পথে টাকা-পয়সা বা কোনও মূল্যবান চিজ পড়িয়া পাইলে এ ব্যাপারে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব কী? পড়িয়া-পাওয়া টাকার পরিমাণ বা জিনিসের মূল্যভেদ, প্রাপকের অবস্থা বিশেষ, হারানো বস্তুর মালিকের আনুমানিক অবস্থা ইত্যাদিতে আমাদের নাগরিক কর্তব্যের ইতর-বিশেষ হইবে কিনা, এসব প্রশ্নের বিচার নিশ্চয়ই খুব সোজা নয়। অবস্থাভেদে ব্যক্তির ত বটেই, সমাজেরও নীতিবোধের প্রখরতার বেশ-কম হইতে পারে। ইউরোপ আমেরিকান দেশসমূহের লোকদের এদিককার নাগরিকতা-বোধ নাকি খুবই তীব্র। আমি শুনিয়াছি, সেখানে রাস্তার মোড়ে খবরের কাগজের স্তূপ ও একটা পাত্র পড়িয়া থাকে। বিক্রেতা থাকে না। খরিদ্দাররাই যার-তার ইচ্ছামত কাগজ নিয়া তার দাম ঐ পাত্রে ফেলিয়া যায়। কেউ এক পয়সা হেরফের করে না। দোকানেও নাকি জিনিসপত্রের গায় দাম লেখা থাকে। দরজায় বাক্স থাকে। খরিদ্দাররা ঐ বাক্সে দাম ফেলিয়া পছন্দমত জিনিস লইয়া যায়। কলেজজীবনে এক অধ্যাপকের মুখে শুনিয়াছিলাম, দ্রুতগামী চলন্ত বাসে জানালায় মুখ বাহির করায় তাঁর মাথার হ্যাট রাস্তায় পড়িয়া গিয়াছিল। মোটরসাইকেলওয়ালা পুলিশ দশ মাইল মোটর চালাইয়া পরবর্তী স্টেশনে সেই বাস ধরিয়াছিল এবং তার হ্যাট দিয়া গিয়াছিল। মন্ত্রিত্ব করিবার কালে এক রাষ্ট্রদূত বন্ধুর মুখে শুনিয়াছিলাম, এক বিমানবন্দরে তিনি রুমাল ফেলিয়া আসিয়াছিলেন। তিনটা দেশ ও দশটা বিমানবন্দর বাহিয়া হাওয়াই জাহাজে জাহাজে তাঁর রুমাল তার হাতে ফিরিয়া আসিয়াছিল। কিন্তু এটা ছবির একদিক মাত্র। ঐ দেশের অমন নাগরিক কর্তব্য-চেতন লোকেরাই আবার আফ্রো-এশিয়ান দেশসমূহের লোকদের ইনসানি হক ও মুখের বুলি কাড়িয়া লইতেছে। বাধা দিলে গুলির মুখে তাদের খুলি উড়াইয়া দিতেছে। মানুষের নীতিবোধ এত বিচিত্র।
আমাদের দেশের ও সমাজের অবস্থা তা নয়, এটাই বড় কথা নয়। আমার নিজেরই মধ্যে নৈতিক কাপুরুষতা ও দ্বিধা-সন্দেহ আছে। আমি আজ তা বেশ বুঝিতেছি। কলেজজীবনে এক হোস্টেল-মেট একবার আমার কাছ থনে পাঁচটা টাকা ধার নেন। কথা থাকে বাড়ি থনে মনি অর্ডার আসিলেই শোধ করিবেন। কতবার তার মনি অর্ডার আসিল। আমার টাকা শোধ করিলেন। যথেষ্ট তাগাদা করিলাম। বন্ধু-বান্ধব সালিস-সুপারিশ করিলেন। তবুও। বছর-দুই বছর কাটিয়া গেল। টাকা পাওয়ার আশা ছাড়িয়া দিলাম। এমন সময় একদিন দল বাঁধিয়া মার্কেটে যাইতেছি। আমার ঐ দেনাদার বন্ধুর পকেট থনে দশ টাকার একখানা নোট তার ও সকলের অজ্ঞাতে মেঝেয় পড়িয়া গেল। আমি সকলের অজ্ঞাতে আলগোছে তা তুলিয়া নিলাম। ভাবিলাম আল্লাহ সুদসহ আমার টাকা পাওয়াইয়া দিলেন। বাজারে গিয়া জিনিস পছন্দ করিয়া দাম দিতে গিয়া পকেটে হাত দিয়া বন্ধু বুঝিলেন তাঁর টাকা হারাইয়াছে। কত হায়-আফসোস করিলেন। আমি অন্যদের সাথে প্রচুর সহানুভূতি জানাইলাম। কিন্তু আসল কথা বলিলাম না।
ফাইনাল পরীক্ষার পর যেদিন সমপাঠীরা সকলে হোস্টেল হইতে বিদায় লইতেছিলাম, সেদিন ঐ বন্ধু পাঁচটা টাকা আমার হাতে জিয়া দিলেন এবং এতদিন দেনা শোধ না করার জন্য মাফ চাহিলেন। আমার হাত কাঁপিতেছিল। বুক ধড়ফড় করিতেছিল। কিন্তু মুখ ফুটিয়া সত্য কথা বলিতে এবং সে টাকা ফেরত দিতে সাহস পাইলাম না। বরং পরে মনকে প্রবোধ দিবার জন্য দুই বছরের অধিককাল আমাকে জ্বালাইবার প্রতিশোধের কথা এমনকি ইনসাফের মালিক আল্লাহর সুবিচারের কথাও ভাবিয়াছিলাম।
কেতাবি সাধুতা ও রাস্তার সাধুতায় সে পার্থক্য আছে এঁরা তার প্রমাণ। অথচ সাধারণ লোক এটা বুঝিতে পারে না। সাধুতার ভন্ডামি বা ফুটানিরিয়াকারীই যে আসল সাধুতা নয়, বিষয়ী সাধু লোকদের ধারণা তাই। এঁরা আসলে খারাপ লোক নন। সমাজের অবাঞ্ছিত অঙ্গ ও রাষ্ট্রের অবাঞ্ছিত নাগরিকও এঁরা নন। বরঞ্চ শুধু এই শ্রেণীর বিষয়ী ও বাস্তববাদী সাধু লোক যারা সাধুতাকে শুধু পলিসি মনে করেন, তাদের লইয়াই একটা দেশ একটা সমাজ সুখী-সমৃদ্ধিশালী হইতে পারে। পক্ষান্তরে পান হইতে চুন খসিয়া পড়িলেই যাঁরা হায়-হায় করিয়া উঠেন, কেতাবি সাধুতার সেই ভণ্ড ও রিয়াকারদেরে লইয়া একটা সমাজ বা দেশ সুখী হইতে পারে না। আজ পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও আমি মনে করি, আমি ঐদিন আহাম্মকি করি নাই। কিন্তু যেসব বন্ধু ঐদিন আমাকে আহাম্মক বলিয়াছিলেন তাঁরা অসাধু, এ কথাও আমি বলিতে পারি না। বিশেষত এ কথাও আমি ভুলিতে পারি না যে বাইশ টাকা হজম করিতে আমার বিবেকে বাধিয়াছিল বটে কিন্তু ঐ টাকার ভগ্নাবশেষ চার টাকা হজম করিতে আমার আপত্তি হয় নাই। কিন্তু জনমত ব্যক্তির মতের বা যুক্তির তোয়াক্কা করে না। জনগণ ব্যক্তিগত সাধুতার খুব কমই মূল্য দিয়া থাকে। জনগণের বিশ্বাস, সুযোগ পাইলেই মানুষ চোর হয় ‘এভরিওয়ান হ্যাঁজ হিজ ভ্যালু, টাকা দিয়া সবাইকে কেনা যায়। জনগণের এই বিশ্বাস আছে বলিয়াই তাদের কথা : তৃণ হরণ করে না ব্রহ্মচারী; টাকা চুরি করে লক্ষ চারি। সারা জীবন যে লোকটা সাধুতার জন্য চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করিল, সেও যদি মওকামত ভাল সুযোগ পায় তবে টাকা মারিতে দ্বিধা করিবে না। যে সময়ে এ টাকাটা আমি রাস্তায় কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম ঠিক সেই সময়ে কলেজের বকেয়া পাওনার জন্য আমার নাম কাটা যাওয়া আসন্ন হইয়া পড়িয়াছিল। তবু এ টাকা দিয়া কলেজের বকেয়া বেতন শোধ করার কল্পনার একটা উঁকিতেই আমার বিবেক তার দিকে বাঘা কুত্তার মত ঘেউ-ঘেউ করিয়া উঠিয়াছিল। অথচ দুই ঘণ্টা পরে আমার বন্ধুরা যখন ঐ টাকার সব শেষ করিয়া বাকি চার টাকা দিয়া আমাকে একটা রেডিমেড কোট কিনিয়া দিলেন, তখন আমার সেই বিবেকই ক্লান্তি-অবসাদে অন্ধকার কোণে ঘুমাইতেছিল।
