বাহির হইয়া আসিলাম। হঠাৎ একটু রিলিফ বোধ করিলাম। বুকের উপর হইতে একটা পাথর নামিয়া গেল। দারোগা বেটাদের যে বদনাম শুনি তাতে ওদের হাতে এ টাকাটা পড়িলে নির্ঘাত খাইয়া ফেলিবে। দারোগারা যে কেউ থানায় ছিলেন না এটা আল্লারই ইচ্ছা। তিনি যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আল্লার এই মেহেরবানির কথা ভাবিয়া আসমানের দিকে চাইতেই দেখিলাম, সামনেই চকবাজার পোস্টাফিসের সাইনবোর্ড। আল্লার ইশারা এতক্ষণে বুঝিলাম। পোস্টাফিসে টাকাটা জমা দিয়া ঢোল-শহরতের কিম্বা ছাপা বিজ্ঞাপনের একটা কিছু ব্যবস্থা করা যাইবে। অতএব পোস্টাফিসে ঢুকিলাম। একটি কাউন্টার, বিকাল বেলা তাতেও খুব ভিড়। পোস্টাফিসে এ যাবকালে শুধু কার্ড ও স্ট্যাম্প কিনিয়াছি। টাকা জমাও দেই নাই, মনি অর্ডারও করি নাই। তবু এটা যে মনি অর্ডার হইবে না, তা বুঝিলাম। পোস্টাফিসের সেভিং ব্যাংকের নাম শুনিয়াছি। কিন্তু কীভাবে টাকা জমা দিতে হয়, তা জানি না। ভিড়ের পিছনে দাঁড়াইয়া এসব কথাই ভাবিতে লাগিলাম। যতক্ষণে সামনের ভিড় কমিল, ততক্ষণে আমার সন্দেহের উদ্রেক হইয়া গিয়াছে। পোস্টাফিসে টাকা জমা দিলে সেটাও থানার মতই গায়েব হইয়া যাইবে কিনা? একটু ভাবিয়া-চিন্তিয়া বন্ধু-বান্ধবের সাথে পরামর্শ করিয়াই কাজ করা উচিৎ। অতগুলি টাকা। আবার পরের টাকা। কাজেই সামনের ভিড় শূন্য হইয়া যাওয়ার পরও যখন আমি দাঁড়াইয়াই আছি, কিছু চাইতেছি না, তখন কাউন্টারের কর্মচারীই আমাকে বলিলেন: আপনি কি চান? আমি থতমত খাইলাম। তাড়াতাড়ি মুখ হইতে বাহির হইয়া গেল : একটা পোস্টকার্ড দেন।
সে সময় আমার পোস্টকার্ডের দরকার ছিল না। কিন্তু ওটা এমন জিনিস যার দরকার একদিন হইবেই। কাজেই ওটাকে অপব্যয় মনে না করিয়াই বাসায় ফিরিলাম। হাত-মুখ ধুইয়া নাশতা করিয়া ঢাকা কলেজের মুসলিম হোস্টেলে গেলাম। এটা আমার রোজকার অভ্যাস। বর্তমানে যেখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এটাই তখন ঢাকা কলেজের মুসলিম হোস্টেল। এর নাম ছিল তখন সেক্রেটারিয়েট মুসলিম হোস্টেল, সংক্ষেপে এসএম হোস্টেল। পূর্বপরিচিতদের মধ্যে শুধু শামসুদ্দিনই এই হোস্টেলে থাকিত। প্রথম-প্রথম তারই খাতিরে যাইতাম। কিছু দিনে অনেক বন্ধু জুটিয়া গেল। তাতে সেখানে যাওয়া আমার একটা বৈকালিক নেশা হইয়া গিয়াছিল।
.
৩. পথে-পাওয়া টাকার সদ্ব্যবহার
আমি হোস্টেলে পৌঁছিয়া দেখিলাম আমার বন্ধুরা সাজিয়া-গুঁজিয়া বাজারে যাইবার জন্য প্রস্তুত। অন্যদিন তাদেরে টেনিস বা ব্যাডমিন্টন খেলায় পাই। আমিও ওদের র্যাকেটে, ওদের বলে ও শাটলককে দুই-এক হাত খেলিতাম। কিন্তু সেই দিন ওরা বাজারে যাইবে বলিয়া অনেক আগেই খেলা ছাড়িয়া দিয়াছিল। সকলকে একত্রে পাইয়া খুশিই হইলাম। আমার টাকা পাওয়া, থানা-পোস্টাফিসে যাওয়া সব কথা বিস্তারিত বলিয়া তাদের উপদেশ চাইলাম। আমার কথা শুনিয়া সকলে একসঙ্গে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। একজন বলিল : তুমি বিলাইর কাছে গোশতের পাহারাদারি দিতে চাইছিলা। যাক আল্লার মাল আল্লাই বাঁচাইছেন। আমিও মনে-মনে আল্লাকে ধন্যবাদ দিলাম। পরের টাকা লইয়া কী আহাম্মকিই না করিতে যাইতেছিলাম। নিজের এই গাধামির জন্য লজ্জা-ভারী চোখ তুলিয়া বলিলাম: এখন তবে করি কী?
এক বন্ধু হাত বাড়াইয়া বলিলেন : এমন আহাম্মক কি আর গাছে ধরে? ঐ টাকা যথাস্থানে পৌঁছানো ত সোজা ব্যাপার। দাও আমার কাছে টাকাটা।
আমি বন্ধুর কাছে টাকা দিলাম। একটা বড় বোঝা ঘাড় হইতে নামিয়া গেল। আরাম পাইলাম। বন্ধুদের সাথে হাসি-খুশিতে বাজারে গেলাম। গেলাম একদম পাটুয়াটুলীতে। প্রথমেই কালাচাঁদ গন্ধবণিকের দোকানে ঢুকিয়া বন্ধু এক টাকার মিঠাইর অর্ডার দিলেন। তৎকালে এক টাকার মিঠাইয়ে দশজনের পেট ভরিত। আমরা পাঁচ বন্ধুতে সে মিঠাই খাইয়া গলা পর্যন্ত ভরিলাম। ঢেকুর তুলিয়া কালাচাঁদের দোকান হইতে বাহির হইলাম এবং পান-সিগারেট খাইলাম। তারপর আমরা গেলাম মজিদ চশমাওয়ালার দোকানে। সেখানে আমাদের নেতা বন্ধু এগার টাকায় একটি সোনার ফ্রেমের জিরো পাওয়ারের চশমা কিনিলেন। সেখানে হইতে বাহির হইয়া লতিফ খলিফার দোকানে প্রবেশ করিয়া সেখানে এক বন্ধুর গায়ের ছয় টাকা দামের একটা কোটের মাপ দিয়া পুরা টাকা আগাম দিয়া দিলেন।
লতিফ খলিফার দোকান হইতে বাহির হইয়া বন্ধুরা আমার দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিলেন : দেখলা এইবার পাওয়া-টাকার সদ্ব্যবহার কেমনে করতে হয়?
সকলে প্রাণ খুলিয়া গলা ফাটাইয়া হাসিলেন। হাসি থামিলে আরেক বন্ধু বলিলেন : কিন্তু যে বেচারা টাকাটা পাইল, তারে ত কিছু দিলা না।
যে বন্ধুর পকেটে টাকা, তিনি বলিলেন : তার কথা আমার মনে আছে। তার কথা ভুইলা যাবার মত অবিবেচক আমি নই। চারটা টাকা এখনও রাইখা দিছি।
আমি এতক্ষণে ব্যাপার বুঝিলাম। বন্ধুরা ঐ পথে-পাওয়া টাকা দিয়াই আমাদেরে মিঠাই খাওয়াইয়াছেন এবং চশমা-কোট কিনিয়াছেন! বন্ধুরা কেন এটা করিলেন? হাওলাত স্বরূপই টাকা খরচ করিতেছেন, পরে ভরিয়া দিবেন। নিশ্চয়ই। কিন্তু ও-টাকা খরচ করিয়া কাজটা কি তারা ভাল করিলেন, বুঝিলাম না। তবে এটা বুঝিলাম যে টাকাটা খরচ হইয়া যাইতেছে। ভাবনা-চিন্তা শেষ হইবার আগেই দেখিলাম, আমরা এক রেডিমেড কাপড়ের দোকানে ঢুকিয়াছি। বন্ধুরা সকলে পছন্দ করিয়া চার টাকা দিয়া আমার জন্য খয়েরি হলুদ রঙের তসরেটের একটা কোট কিনিলেন। সব টাকা খরচ হইয়া যাওয়ার চেয়ে চার টাকা বাঁচা ভাল, বোধ হয় এই নীতিতে আমি ঐ কোট নিলাম। বন্ধুরা চকবাজার পর্যন্ত আমাকে পৌঁছাইয়া দিয়া সেন্ট্রাল জেলের সামনে দিয়া নিজেদের হোস্টেল মুখে রওয়ানা হইলেন। যাইবার সময় বলিয়া গেলেন : তোমার মত বোকারামের এ চার টাকাও পাওয়া উচিৎ ছিল না।
