ছাত্রসংখ্যার দিক দিয়া মৃত্যুঞ্জয় স্কুল যেমন ছিল জিলা স্কুলের পাঁচ গুণ বড়, জগন্নাথ কলেজও তেমনি ঢাকা কলেজের তুলনায় পাঁচ না হইলেও তিন গুণ বড়। অধ্যাপকের দিক দিয়াও তৎকালে ঢাকা কলেজের তুলনায় জগন্নাথ কলেজ হীন ছিল না। ঢাকা কলেজে যদিও তৎকালে মি. টার্নারের মত ইংরাজ প্রিন্সিপাল ছিলেন তবু জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপালও কম ছিলেন না। প্রফেসর ললিত কুমার চ্যাটার্জির মত দেশবিখ্যাত শিক্ষাবিদ জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল। ইনি আবার স্যার আশুতোষের জামাই। এটাও জগন্নাথ কলেজের একটা গৌরবের বিষয়। তৎকালে স্যার আশুতোষ মুখার্জি কলিকাতা হাইকোর্টের জজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। আমি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হইবার কয়েক মাস পরেই স্যাডলার কমিশন (মানে, ঢাকা ইউনিভার্সিটি কমিশন) ঢাকায় আসে। এই কমিশনের অন্যতম মেম্বর ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখার্জি। তিনি কমিশনের মেম্বর হিসাবে জগন্নাথ কলেজ পরিদর্শন করিলেন। আমাদের ক্লাসে গেলেন। জামাইর বাসায় খাওয়া-দাওয়া ও কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিলেন। এই সুযোগে আমরা স্যার আশুতোষের মত দেশবিখ্যাত বড়লোককে কাছে দাঁড়াইয়া দেখিবার সৌভাগ্য লাভ করিলাম। তা ছাড়া স্যার আশুতোষের পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি আমাদের সঙ্গে একই সময়ে ম্যাট্রিক পাশ করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিছুদিন পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভগিনীর বাড়িতে বেড়াইতে আসেন এবং কয়েক দিন থাকেন। এই উপলক্ষে তিনি তার ভাগিনা মনোরঞ্জন চ্যাটার্জির সাথে আমাদের কলেজে মাঝে মাঝে বেড়াইতে আসিতেন। প্রিন্সিপাল ললিত চ্যাটার্জির ছেলে মনোরঞ্জন চ্যাটার্জিও আমাদের ক্লাসের নামকরা ছাত্র ছিলেন। তার দৌলতে আমরা এই সময় শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে পরিচিত হইবার সৌভাগ্য লাভ করি। আমাদের প্রিন্সিপালের শালা আর আশুতোষ মুখার্জির পুত্র এবং ম্যাট্রিকে ফার্স্ট স্ট্যান্ড করা ছাত্র শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং তার সাথে মুখোমুখি আলাপ করা তৎকালে পরম। সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। ঢাকা কলেজের আমার যেসব বন্ধু তাদের কলেজের। তুলনায় জগন্নাথ কলেজকে হেয়প্রতিপন্ন করিতে চাহিত, তাদেরে এই সব দৃষ্টান্ত দিয়া জব্দ করিতাম। তা ছাড়া জগন্নাথ কলেজে ভাল ভাল প্রফেসারও পাইয়াছিলাম। তাঁদের মধ্যে ইংরাজির অধ্যাপক বাবু সতীশ চন্দ্র সরকার ও দর্শনের অধ্যাপক বাবু উমেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য আমার জীবনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন। যথাস্থানে তাদের কথা বলিব।
.
২. যায়গীর–হাকিম সাহেবের বাড়িতে
আগেই বলিয়াছি কিছুদিন আগে হইতেই আমাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ। হইয়া যায়। পনের-বিশ টাকা স্কলারশিপ পাইয়া আইএ পড়িব বলিয়া যে স্বপ্ন দেখিতেছিলাম পাঁচ টাকা স্কলারশিপ পাওয়ায় সে স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল। কাজেই হোস্টেলে থাকিয়া লেখাপড়ার আশা ত্যাগ করিলাম। শামসুদ্দিনের পিতা জনাব সাহেদুল্লাহ মণ্ডল সাহেব ও গাঁয়ের অন্যতম প্রধান মাতব্বর জনাব ওসমান আলী সরকার সাহেবের মধ্যস্থতায় ঢাকা চকবাজার চুড়িহাট্টার হাকিম আরশাদ আলী সাহেবের বাড়িতে আমার যায়গীরের ব্যবস্থা হইল। হাকিম সাহেবের বাড়িতে আমার থাকিবার মত অতিরিক্ত ঘর ছিল না। কাজেই হাকিম সাহেবের বাড়ির কাছের চুড়িহাট্টা মসজিদের ইমাম সাহেবের হুজরা-সংলগ্ন রুমে আমার থাকার ব্যবস্থা হইল। তিনজনকে আমি পড়াইতাম। তিনটি ছেলেই অতিশয় ভদ্র, বিনয়ী ও ভাল ছাত্র ছিল। তাদেরে পড়াইতে আমার বিশেষ বেগ পাইতে হইত না। আমার নিজের পড়ারও কোনো অসুবিধা হইত না। ছেলেমেয়েরা আমার অতিশয় যত্ন নিত। বিবি সাহেব যদিও পর্দা করিতেন এবং কখনও আমার সামনে আসিতেন না, তথাপি আমার খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে সর্বদাই খবর নিতেন। ছেলেমেয়েরা না থাকিলে পর্দার আড়াল হইতে কথা বলিয়া আমার খোঁজখবর করিতেন। পরের বাড়িতে যায়গীর থাকার অভিজ্ঞতা আমার এই প্রথম এবং এই শেষ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বৃদ্ধ বয়সে ওদের কথা মনে পড়ে। খবর লইয়া জানিয়াছি, হাকিম সাহেব ও তাঁর বিবি সাহেবা এন্তেকাল করিয়াছেন। ছেলেদের একজন হাকিমি পাশ করিয়া হাকিম সাহেবের দাওয়াখানা চালাইতেছে। অন্যান্য ছেলেরা অন্য ব্যবসায় করে। অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও, ঢাকা থাকিয়াও, তাদের সাথে দেখা করিতে পারি নাই। সে জন্য মনে একটা ক্ষোভ আছে।
হাকিম সাহেবের বাড়ি চুড়িহাট্টা হইতে, আমি চকবাজার, মোগলটুলী, ইমামগঞ্জ, বাবুর বাজার, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী হইয়া কলেজে যাতায়াত করিতাম। রোজ এতটা পথ হাঁটিতে আমার মোটেই কষ্ট হইত না। কারণ এর চেয়ে অনেক লম্বা রাস্তা, এর চেয়ে হাজার গুণে খারাপ পথে, এর চেয়ে অনেক কম বয়সে হাঁটিয়া স্কুল করিবার অভ্যাস আমার ছিল দরিরামপুর স্কুলে পড়িবার সময়। তা ছাড়া শহরের রাস্তায় চলা আরো সোজা। বিভিন্ন রকমের নিত্য-নূতন দৃশ্য দেখিতে-দেখিতে কখন যে পথ ফুরাইয়া যাইত, তা টেরও পাইতাম না।
এই রাস্তায় কলেজে যাতায়াত করিবার সময় একটা ভারি মজার ঘটনা ঘটিয়াছিল। আমি কলেজ হইতে ফিরিবার পথে রাস্তায় একটি কাপড়ের টুকরার (ঠিক রুমাল নয়)। ছোট পুঁটলি পাইলাম। পুঁটলিটি তুলিয়া হাতে লইয়া পথ চলিতে-চলিতেই তার গিরো খুলিলাম। যে জায়গায় পুঁটলিটি পাইয়াছিলাম তা ইমামগঞ্জ-মৌলবী বাজারের মোড়ের কাছাকাছি হইবে। কিন্তু ওর গিরো খুলিতে খুলিতে আমি মোগলটুলী ছাড়াইয়া প্রায় চকে পৌঁছিলাম। দশ টাকার একটি, পাঁচ টাকার দুইটি ও দুই টাকার একটি নোটে মোট বাইশটি টাকা। যুদ্ধ মুদ্দতের জন্য ঐ সময় দুই টাকার নোট বাহির হইয়াছিল। তৎকালে ঐ বাইশ টাকার দাম আজকালকার দুই শ টাকারও বেশি। কারণ ঐ সময় দশ-বার টাকায় কলেজ হোস্টেলে স্বচ্ছন্দে থাকা চলিত। এক টাকা সিটরেন্ট, পাঁচ টাকা খোরাকি, এক টাকা টিফিন ও চার টাকা কলেজের বেতন, এই এগার টাকায় রাজপুত্রের হালে কলেজ হোস্টেলে অনেকেই থাকিত। আর আমার মত যায়গীর থাকা গরীব ছাত্রের জন্য বাইশ টাকা ছিল আলী বাবার মোহরের খনি। কাজেই টাকা গনিবার সময় আমার হাত কাপিতেছিল। এই টাকার কী করা যায়? যে ধরনের নেকড়ায় যেভাবে টাকাগুলি বাঁধা তাতে বুঝা যায়, মফস্বলের কোনও লোক কোনও জিনিস কিনিতেই শহরে আসিয়াছিল। ঐ টাকা হারাইয়া নিশ্চয়ই বেচারার খুবই ক্ষতি হইয়াছে। কিন্তু করা যায় কী? শহরে ঢোল-শহরত করিয়া দিলে ঐ লোকের সন্ধান পাওয়া যাইতে পারে। পয়সা খরচ করিয়া ঢোল-শহরত করিলে এই টাকা হইতেই কিছু টাকা খরচ হইয়া যাইবে। সুতরাং কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া ঠিক করিলাম থানায় এই টাকাটা জমা দিলে দারোগা বাবু সরকারি খরচেই ঢোল পিটাইয়া ঐ লোকের সন্ধান করিবেন। সামনেই চকবাজার থানা। তাতে ঢুকিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, ওসি আছেন কিনা? একজন বিহারি পুলিশ দাঁড়াইয়াছিল, সে বলিল : কুই নাহি হ্যায়।’
