.
১১. বিপজ্জনক রাস্তা
এই থলি কাঁধে করিয়া আমরা বাড়ি হইতে বাহির হইতাম স্কুলের নির্ধারিত সময়ের দুই আড়াই ঘণ্টা আগে। অর্থাৎ দশটার সময় ক্লাস বসিলে আমরা সাড়ে সাতটায় বাড়ি হইতে বাহির হইয়া উঁচা-উঁচা পাটের ক্ষেতের সরু-সরু আইল-বাতর দিয়া পানিতে-ডুবা ধান ক্ষেতের আইল হাঁটিয়া নদী পার হইতাম এবং আরো মাইলখানেক হাঁটিয়া বড়দিঘির’ নিকটে আসিয়া ডিবি রাস্তায় উঠিতাম। বৈলর, কানহর, কাঁঠাল, ভরাডুবা ইত্যাদি গ্রামের সহপাঠীরা এই বড়দিঘির পাড়ে আসিয়া জমা হইত। ক্লাস আওয়ারের এক ঘণ্টা বাকি থাকিতে এখান হইতে সকলে মিলিয়া রওয়ানা হইতাম। রাস্তার দুই পাশে আরো ছাত্ররা অপেক্ষা করিতে থাকিত। তারা আমাদের সাথে শামিল হইত।
কিন্তু যদি নৌকার অভাবে আমরা সুতোয়া নদী পার হইতে না পারিতাম তবে নদীর কূল বাহিয়া দক্ষিণ দিকে যাইতে থাকিতাম। বর্তমানে ধানীখোলা বাজার হইতে ত্রিশাল বাজার পর্যন্ত গাড়ি, ঘোড়া মটর চলিবার উপযোগী যে ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তা আছে, এমন কোনও রাস্তা তৎকালে ছিল না। তবে দুপায়া একটি রাস্তা ছিল। কিন্তু সে রাস্তা ছিল প্রায় অন্ধকার বিশাল জঙ্গলের ভিতর দিয়া। তাতে আবার কিছু দূর পরপর পনের-বিশ হাত গভীর নদীর ভাঙতি ছিল। দিনের বেলায়ও ঐ রাস্তায় কেউ একা চলিতে সাহস পাইত না। আমাদের মত আট-দশ বছরের শিশুর তো কথাই নাই। কিন্তু আমরা সাহস করিতাম। আমরা দুই ভাই ছাড়াও আমাদের প্রতিবেশী আরো দুইজন ছাত্র দরিরামপুর স্কুলে পড়িত। আমরা এই চারিজন নদীর পাড়ের এই পথে। দক্ষিণ দিকে চলিতাম। নদীর পাড়ে বহু অবস্থাশালী গৃহস্থের বাড়ি ছিল। তাদের বাড়ির ঘাটে পারাপারের সুবিধার জন্য কলাগাছের ভোরা (ভেলা) থাকিত। আমরা বহুদিন এই রকম ভোরায় নদী পার হইয়াছি। নদী পার হইয়া একবার বৈলর গ্রামে যে কোনও মৌযায় পৌঁছিতে পারিলেই আমরা নিশ্চিন্ত হইতাম। আইল-বাতর ভাঙ্গিয়া কোনও এক উপায়ে আমরা ডিবি রাস্তা ধরিতে পারিতামই।
এত করিয়াও আমরা প্রায় ঠিক সময়েই স্কুলে পৌঁছিতাম। চার বছরে আমরা দুই এক দিনের বেশি লেইট হইয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না।
রাস্তাঘাটের এই বিপজ্জনক অবস্থার জন্য আমার মুরুব্বিরা সারা দিন উদ্বিগ্ন থাকিতেন। আমার মা সারা দিন আমাদের নিরাপদে ফিরিয়া আসিবার জন্য দমে-দমে আল্লা-আল্লা করিতেন। আসরের নামাজ পড়িয়াই দেউড়ির কাছে। আসিয়া উঁকিঝুঁকি শুরু করিতেন। বাপজী ও চাচাজী সাংসারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকিতেন বটে, কিন্তু দাদাজী তৎকালে সব কাজ হইতে অবসর নিয়াছেন। কাজেই আসরের নামাজ পড়িয়াই তিনি বাড়ি হইতে বাহির হইতেন এবং নদীর ঘাটের কাছে কোনও দোকান ঘরে বা কাঁচারিতে বসিয়া ঘাটের দিকে চাহিয়া থাকিতেন। আমরা ফিরিয়া আসিলে আমাদেরে সঙ্গে নিয়া বাড়ি ফিরিতেন। কোনও কোনও দিন ফিরিতে আমাদের এত দেরি হইত যে নদীর পাড়েই দাদাজীকে মগরেবের নামাজ পড়িতে হইয়াছে। লোকজনের মুখে শুনিয়াছি সেদিন দাদাজী নদীর পাড় দিয়া প্রায় এক মাইল রাস্তায় উত্তর-দক্ষিণ করিয়া টহল দিয়াছেন। এবং রাস্তায় যাকে পাইয়াছেন তাকেই জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।
.
১২. দুইটি ব্যক্তিত্বের প্রভাব
দরিরামপুর স্কুলে ছাত্রজীবনে আমি দুইটি লোকের দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হইয়াছিলাম। তার একজন আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার কৈলাস বাবু। আরেকজন স্কুল-সংলগ্ন মাদ্রাসার ছাত্র মোহাম্মদ আতিকুল্লাহ। কৈলাস বাবু আমাকে সাহিত্য সাধনার অনুপ্রেরণা দিয়াছিলেন। সে কথা আমি অন্য অধ্যায়ে বর্ণনা করিব। এখানে শুধু এইটুকু বলা দরকার যে কৈলাস বাবু আমার মনে উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগাইয়াছিলেন। পড়া-শোনায়, আদব-কায়দায়, স্বভাব-চরিত্রে আমার মত ছেলে তিনি জীবনে আর দুইটি দেখেন নাই, সব সময় সবার কাছে তিনি এই কথা বলিয়া বেড়াইতেন। তিনি ছাত্রদের উপযোগী শিক্ষামূলক নাটক লিখিয়া ছাত্রদের দিয়া অভিনয় করাইতেন। তাতে সব সময় আমাকে নায়কের পাট দিতেন। সব সময় নায়কটি আদর্শ চরিত্রবান যুবক থাকিত। উপসংহারে তার জয় দেখানো হইত। আমি আগে সত্য সত্যই ভাল ছিলাম কিনা দ্বিমত হইতে পারিত। কিন্তু কৈলাস বাবু ভাল বলিতে-বলিতে আমি সত্যই ভাল হইয়া গেলাম।
আতিকুল্লাহ মাদ্রাসার ছাত্র হইলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গায়ক ও চিত্রকর। জীব-জন্তুর ছবি আঁকা নিষেধ আছে বলিয়া আতিকুল্লাহ শুধু লতা পাতা-গাছ-বৃক্ষ ও নদী-নালার ছবি আঁকিতেন। গান না গাহিয়া তিনি বাংলা গজল গাইতেন। লতা-পাতা আঁকা ছাড়া তিনি আরবি ও বাংলা হরফে অতি চমৎকার ‘তুগরা’ আঁকিতেন। আরবি হরফের তুগরা অনেক কেতাবে পাওয়া যাইত, কাজেই আতিকুল্লাহর আরবি তুগরাতে বড় কেউ আশ্চর্য হইতেন না। কিন্তু বাংলা হরফে তিনি যে তুগরা আঁকিতেন সেটা ছিল সত্যই মৌলিক। চিত্র করা ও তুগরা লেখার কাজে যে সব বিভিন্ন রঙের কালি লাগিত, আতিকুল্লাহ সবই নিজের হাতে তৈয়ার করিতেন। চিত্র ও তুগরা ছাড়াও তিনি সাধারণ চিঠিপত্র ও খাতার কাগজেও এমন সুন্দর হরফে সব লেখা লিখিতেন যে ছাপার হরফ বলিয়া ভুল হইত। তিনি একদিকে তেরছাকাটা খাগের কলম দিয়া বড়-বড় হরফে বহু পোস্টার লিখিয়া ঘরের বেড়ায়, মসজিদের দেওয়ালে লটকাইয়া দিতেন। না বলিয়া দিলে কেউ এগুলিকে হাতের লেখা বলিয়া ধরিতে পারিতেন না। পক্ষান্তরে সরু মিহিন লেখাতেও তিনি উস্তাদ ছিলেন। একদা তিনি ছাপার হরফের মত গুট-গুট পরিচ্ছন্ন ও সুস্পষ্ট অক্ষরে একটি পোস্টকার্ডে একাশি লাইনের একটি পত্র লিখিয়াছিলেন। ছাপার হরফের মত প্রতিটি হরফ এমন স্পষ্ট ও আলগ ছিল যে কোনও অল্প শিক্ষিত লোকও তা পড়িতে পারিত।
