পাঁচ-সাতটা মাথা একটানে একখানে করা কম শক্তির কাম নয়। কাজেই পণ্ডিত মহাশয় নিজেও নিশ্চয়ই ক্লান্ত হইয়া পড়িতেন। কিন্তু সেভাব না দেখাইয়া শুধু ছাত্রদের উপর দয়া পরবশ হইয়াই’ সেদিনকার মত ছাড়িয়া দিতেন।
এমন শাস্তি পণ্ডিত মশায় প্রায়ই দিতেন। আমাদের ক্লাসেও হইত। একত্রে অন্তত তিনটা অপরাধী পাওয়া না গেলে নারিকেলের ঝোকা ভাল জমে না বলিয়াই যা কয়েক দিন বাদ পড়িত। এমন শাস্তির প্রতি আমার একটা ভয়ানক ভীতি ছিল। কাজেই রাজার মহিষ না হওয়ার কোনও কারণ খুঁজিয়া না পাইলেও শুধু নারিকেলের ঝোকা হওয়ার ভয়ে রাজাকে মহিষ বলা হইতে বিরত হইলাম।
.
৮. স্কুলে যাতায়াত
দরিরামপুর স্কুলে আমি চার বছর পড়িয়াছি। এই চার বছরে আমার অনেক জ্ঞান লাভ হইয়াছিল। তার মধ্যে বিপজ্জনক কায়িক পরিশ্রমই ছিল প্রধান। আমাদের বাড়ি হইতে বৈলর-ধানীখোলা বাজার-ঘাট আঁকাবাঁকা পথে এক মাইল। নদী পার হইয়া ডিবি রোডে আসিতে আরো এক মাইল। ডিবি রোড স্কুল পর্যন্ত তিন মাইল। এই পাঁচ মাইল রাস্তা চার বছর ধরিয়া দৈনিক দুইবার হাঁটিয়াছি। এই দূরত্ব পাঁচ মাইল শুকনা দিনে। বর্ষাকালে এই দূরত্ব অনেক বাড়িয়া যাইত। কারণ ধান-পাট ক্ষেতের আইল-বিল-বাতর ও খাল-বিলে কিনার ঘুরিয়া যাইতে হইত। শুকনা দিনের মত ক্ষেত-পাথালি বা বিল পাথালি চলিবার উপায় ছিল না। ঝড়-বৃষ্টির দিনেও স্কুল কামাই করার সাধ্য ছিল না। তবে বৃষ্টিতে কাপড়চোপড় নিতান্তই ভিজিয়া ডুবডুবা হইয়া গেলে ‘রেইনি ডে’ পাওয়া যাইত। অর্থাৎ নাম ডাকিয়া হাজিরা বইয়ে হাজির গরহাজির লিখিয়া স্কুল ছুটি দেওয়া হইত। এমন ‘সৌভাগ্য’ বছরে দুই দিনের বেশি আমার দরিরামপুর জীবনে হয় নাই।
বর্ষাকালে আরেকটা বড় অসুবিধা ছিল। সুতোয়া নদীতে কোনও পোল তো ছিলই না, গোদারাও ছিল না। ধানীখোলা-বৈলর ঘাটে হাটুরিয়াদের পারাপারের সুবিধার জন্য জমিদার পক্ষ হইতে যে নৌকার ব্যবস্থা ছিল, তা সব দিন বা সব সময় পাওয়া যাইত না। পুরা বর্ষাতে থমথমা ভরা নদী সাঁতরাইয়া পার হইবার সাহস বা মুরুব্বিদের অনুমতি ছিল না। অবশ্য অন্যান্য সময় নদী কম-ভরা অবস্থায় কোনও কোনও দিন সাতরাইয়া পার হইয়াছি। এতেও বই-পুস্তক, কালি-কলম, পেনসিল লইয়া আমাদের কোনও অসুবিধা হইত না। তবে এত দূরের রাস্তায় অতগুলি বই-পুস্তক ও খাতাপত্র লইয়া যাতায়াত বাস্তবিকই কঠিন হইত।
.
৯. বই-পুস্তকের থলি
কিন্তু দরিরামপুর ভর্তি হইবার পর মা আমাদের দুই ভাইকে দুটি জুযদানের মত থলি সিলাই করিয়া দিয়াছিলেন। প্রথমে এটা পুরাতন কাপড়ের মযবুত, পরে নয়া মার্কিনের টুকরা দিয়া তৈরি হইত। দশীর তাগা দিয়া জুযদানের মত এসব বড় থলি সিলাই করিতেন। দশী’ ও ‘তাগা’ শব্দ দুইটা আমাদের ছেলেবেলায় খুব চালু ছিল। আজকালের তরুণরা হয়তো এদের কথা শোনেই নাই। তাই এ সম্পর্কে কিছু বলা ভাল। তাগা’ মানে সুতা। মোটা সুতাকেই তাগা’ বলা হইত। ‘দশী’ হইল কাপড় বুনিবার সুতার (ইয়ান) ছোট ঘোট বান্ডিল। তৎকালে সুতার বান্ডিল আসিত বিলাত হইতে। এক এক বান্ডিল এক পাউন্ডের (আধসের) হইত। তাঁতি ও জোলারা বাজার হইতে এই বান্ডিল কিনিয়া গামছা, মেয়েদের মোটা রঙ্গিন শাড়ি ও পুরুষদের মোটা লুঙ্গি বুনিত। এক-এক বান্ডিল সুতার দাম ছিল দশ-বার আনা। সুতার দোকানদাররা এক পাউন্ডের বান্ডিল ভাঙ্গিয়া আধপোয়ার (এক আউন্স) ছোট ছোট বান্ডিল বানাইয়া বিক্রয় করিত। গিরস্তরা এই ছোট ছোট বান্ডিলকেই দশী’ বলিত। গিরস্তরা বাড়ির মেয়েদের জন্য এই ‘দশী কিনিত। মেয়েরা এই ‘দশী’র দুই-তিন নাল সুতায় তাগা পাকাইত। এই তাগায় মেয়েরা কথা সিলাই করিত। ছেলেবেলায় মা, ফুফু ও চাচিজানকে এই তাগা দিয়া কাঁথা সিলাই করিতে দেখিয়াছি। দশী’র সুতাগুলি ছিল সাদা। কথায় নকশি করিবার জন্য তাঁরা লাল-নীল-কালো রঙের সুতা ব্যবহার করিতেন। এই রঙ্গিন সুতা কিনিতে হইত না। মেয়েরা চওড়া পাড়ের যেসব বিলাতী শাড়ি পরিতেন, সেসব পাড়ের রং ছিল যেমন পাকা, সুতাও ছিল তেমনি মযবুত। ‘দশীর’ মোটা তাগায় সিলাই করিবার সময় মেয়েরা দুই নম্বর সুই ব্যবহার করিতেন। আর নকশি তুলিবার, তহবন্দ সিলাই করিবার এবং জামা-কোর্তা রিপু করিবার সময় পাঁচ নম্বর সুই ব্যবহার করিতেন। ফলে মেয়েদের কাছে দুই নম্বর ও পাঁচ নম্বর সুইই আমি দেখিয়াছি। আমাদের বাড়িতে শুধু চাচিজিকে দশ নম্বর সুই ব্যবহার করিতে দেখিয়াছি। এই দশ নম্বর সুই ও আলেকান্দ্রা মার্কা গুটি সুতা দিয়া তিনি নিজের জন্য কল্লিদার লম্বা কোর্তা সিলাই করিতেন।
.
১০. থলির সুবিধা
যা হোক, এই দশী তাগা দিয়াই মা আমাদের জন্য থলি তৈয়ার করিতেন। এই থলি বগলেও নেওয়া যাইত, আবার কাঁধে ঝুলাইয়াও নেওয়া যাইত। কাঁধে ঝুলাইবার জন্য কাপড়ের শক্ত পাড় দিয়া কাঁধ-প্যাচা বনাত লাগানো হইত। এই থলিতে পেনসিল, রবার ও কলম-তারাশের (ছোট চাকু) জন্য পৃথক পৃথক জেব থাকিত। প্রথম প্রথম আমরা কাঁধ-পঁাচা থলিতে করিয়া বই-পুস্তক নিতে আপত্তি করিতাম। কারণ এটা দেখিতে আদালত পোস্টাফিসের পিয়ন-পিয়াদার মত দেখাইত। কিন্তু কিছুদিনেই আমাদের এই শরম কাটিয়া গেল। দূরের রাস্তায় এইভাবে বই-পুস্তক বহনের সুবিধাও আমরা বুঝিলাম। দু-একজন শিক্ষক আমাদের তারিফও করিলেন। কোনও ছাত্র কিছু একটা হারাইবার অজুহাত দিলেই মাস্টার সাহেবেরা আমাদের নজির দিতেন। এই থলির দরুনই দরিরামপুরে আমরা ছাত্রজীবনের চারটা বছরে আমি কোনও দিন বই-পুস্তক, খাতা-দোয়াত, কলম-পেনসিল, রবার চুষকাগজ-কলম-তারাশ, কিছুই হারাই নাই। যখন যেটার দরকার হাত দিয়াই পাইয়াছি। অথচ অনেক বেশি বইয়ের ভারী বোঝা বহন করিতে আমাদের কোনও কষ্ট হইত না। কাধ-প্যাচা বনাতটা সাধারণত ডান কাঁধের উপর থাকিত এবং থলিটা বাম কাকালে ঝুলিয়া থাকিত। ক্কচিৎ-কদাচিৎ কাঁধ বদলাইয়া বনাতটা ডান কাঁধ হইতে বাম কাঁধে আনিতাম। তাতে থলিটা বাম কাকাল হইতে ডান কাকালে আসিত।
