এই সব গুণে আমি অল্পদিনেই আতিকুল্লাহর শাগরিদ হইয়া গেলাম। তিনিও আমাকে অকাতরে তার বিদ্যা শিখাইলেন। আমি নিজ হাতে বিভিন্ন রঙের কালি বানাইয়া চিত্র ও তুগরা আঁকায় লাগিয়া গেলাম। অবশ্য এসব গুণে আমি আতিকুল্লাহ সাহেবের ধারে-কাছেও যাইতে পারিলাম না। কিন্তু এতে আমার হাতের লেখার অনেক উন্নতি হইল। আমার ছেলেবেলার উস্তাদ চাচাজী, জগদীশ বাবু ও আলিমুদ্দিন মাস্টার সকলেরই হাতের লেখা ভাল ছিল। বিশেষত চাচাজীর আরবি ও বাংলা লেখা তাঁর পাঠ্যজীবনের খাতা-পত্র আমরা অনেক দেখিয়াছি। হাতে-তৈরি মিসমিসা কালিতে তেরছাকাটা কলমে এসব লেখা অবিকল ছাপা হরফের মত দেখা যাইত। ত্রিশ-চল্লিশ বছরেও কালির চকচকাভাব কমে নাই। বাল্য শিক্ষকের হাতের লেখাই অধিকাংশ ছাত্রের হস্তাক্ষরে প্রভাবিত করে। আমারও করিয়াছিল। কিন্তু নকশি লেখায় আমাকে একমাত্র আতিকুল্লাহ সাহেবই যে প্রভাবিত করিয়াছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নাই। আতিকুল্লাহ সাহেব আমাকে সাহিত্য সাধনায়ও উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন, এ কথা আমি অন্য অধ্যায়ে বলিব। এখানে শুধু এইটুকু বলিতে চাই যে প্রায় সমবয়সী সহপাঠীও যে মানুষের জীবনে কত প্রভাব বিস্তার করিতে পারে, আতিকুল্লাহ আমার জীবনে তার একটা উজ্জ্বল প্রমাণ।
.
১৩. করোনেশনের পুরস্কার
১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি ক্লাস ফাইভ হইতে ক্লাস সিক্সে প্রমোশন পাই। ঠিক সেই সময়ে আমাদের সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড মারা যান। সে জন্য এক সপ্তাহ কাল আমরা ছাত্ররা হাতের বাহুতে কালো ফিতা বাধিয়া চলিতাম। সরকারি হুকুমে হেডমাস্টার বাবুই আমাদেরে এই কালো ফিতা পরিতে বাধ্য করিয়াছেন। কিন্তু ফিতা ও সেফটিপিন স্কুল হইতেই সরবরাহ করা হইয়াছিল বলিয়া এতে আমাদের কোনও আপত্তি হয় নাই। বরঞ্চ একটা নয়া অভিজ্ঞতা হিসাবে এটা আমি উপভোগ করিয়াছিলাম।
ঐ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক উৎসব দিল্লি দরবার উপলক্ষে সরকারি টাকায় আমাদের স্কুলে উৎসব হয় এবং পুরস্কার বিতরণ করা হয়। স্কুলের সবচেয়ে ভাল ছাত্র হিসাবে, সত্যবাদী ছাত্র হিসাবে এবং নিয়মিতভাবে স্কুলে হাজির থাকার দরুন আমি তিন দফা পুরস্কার পাই। তিন দফায় বাংলা-ইংরাজি মিলাইয়া আমি দশ কি বারখানা ভাল ভাল বাঁধানো বই পুরস্কার পাইয়াছিলাম। ইংরাজি বইয়ের মধ্যে রবিনসন ক্রুসো, আইভানহো, ইভনিংস অ্যাট হোম, গ্রিমস ফেয়ারি টেলস এর নাম এবং বাংলা বইয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী ও নৌকাডুবি এবং জলধর সেনের বিশু দাদার নাম মনে আছে। এই সব বইয়ের দুই-একটি বাদে আর সবগুলিই লাল-নীল-সবুজ রঙের কাপড়ে বাঁধাই ছিল। অনেকগুলিতেই সুন্দর ছবি ছিল। এই সব পুস্তক বগলে লইয়া যেদিন বাড়ি ফিরিলাম এবং আমার বড় ভাই সগর্বে আমার সবচেয়ে বেশি ও সবচেয়ে দামি বই পুরস্কার পাওয়ার কথা বর্ণনা করিতে লাগিলেন, তখন বাড়ির সকলে আনন্দ-উল্লাস করিতে লাগিলেন। আমি লজ্জা-শরমে খানিকক্ষণ লুকাইয়া থাকিলাম। তারপর পুস্তকের মধ্যে মানুষের ছবি দেখিয়া কেউ কেউ আপত্তি তুলিলেন বটে কিন্তু কিছুদিন আগে চাচাজীর নিজের কেনা আমির হামযা ও জংগনামার মধ্যেও ঘোড়সওয়ার আমির হামযা ও হানিফার পাতা-জোড়া ছবি আছে বলিয়া ছবির আপত্তি বেশি দিন টিকিল না। ১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি দরিরামপুর মাইনর স্কুলের বিদ্যা শেষ করিয়া ময়মনসিংহ শহরে আসিলাম। এই বছরই দরিরামপুর মাইনর স্কুলকে হাইস্কুলে উন্নীত করা হয়। কাজেই স্কুল কমিটির মেম্বর-সেক্রেটারি সকলে আমাদের দুই ভাইকেই ঐ স্কুলে থাকিয়া যাইতে বলেন এবং দাদাজীকে ধরেন। দাদাজী কিছুটা নরম হইলেন বটে কিন্তু আমি শহরে যাইবার জন্য জিদ ধরিলাম। শেষে আপসরফা হিসাবে অন্তত এক ভাই ঐ স্কুলে থাকা ঠিক হইল। ফলে মিঞা ভাই দরিরামপুর নয়া হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হইলেন। আমি ময়মনসিংহ চলিয়া আসিলাম।.
অধ্যায় পাঁচ – মাধ্যমিক শিক্ষা–নাসিরাবাদে
১. মৃত্যুঞ্জয় স্কুল
১৯১৩ সালের জানুয়ারি মাসে আমি নাসিরাবাদ শহরে পড়িবার জন্য আসিলাম। ময়মনসিংহ শহরকে তৎকালে পাড়াগাঁয়ের লোকেরা নাসিরাবাদ বলিত। আমার মুরুব্বিরাও বলিতেন। কিন্তু শহরে আসিয়া দেখিলাম, সবাই এটাকে ময়মনসিংহ বলে, নাসিরাবাদ কেউ বলে না।
শামসুদ্দিন আগে হইতে ময়মনসিংহ শহরে থাকিতেন। সুতরাং তার সাথে একত্রে থাকিবার জন্য তাঁদের মেসেই উঠিলাম। ঐ মেসে আমাদের প্রতিবেশী মাতবর ওসমান আলী সরকার সাহেবের ছোট ভাই সাঈদ আলী সাহেবও থাকিতেন। কাজেই মুরুব্বিদের কথামত বাড়ি হইতে আগেই ঠিক করিয়াই আসিয়াছিলাম, এদের সঙ্গেই থাকিব। সাঈদ আলী সাহেব ও শামসুদ্দিন উভয়েই জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কাজেই জিলা স্কুলেই ভর্তি হইব, ঠিক করিয়াছিলাম। কিন্তু গিয়া দেখিলাম জিলা স্কুলে সিট নাই। সাঈদ আলী সাহেব ও শামসুদ্দিন অবশ্য আমার একটা সিটের জন্য অনেক ধরাধরি করিলেন। কিন্তু কোনও ফল হইল না। এতে আমি খুবই নিরাশ হইলাম। আমার আত্মীয়-বন্ধুরা। জিলা স্কুলে পড়েন, সে জন্য জিলা স্কুলের প্রতি একটা স্বাভাবিক টান ছিল। তা ছাড়া জিলা স্কুলের প্রতি আকৃষ্ট হইবার আরেকটা সাম্প্রতিক কারণ ঘটিয়াছিল। সেই বছরই জিলা স্কুল তার পুরাতন বাড়ি। হইতে নূতন দালানে উঠিয়া আসিয়াছে। বর্তমানে জিলা স্কুল যে বাড়িতে আছে, এটাই সেই নূতন দালান। এর আগে জিলা স্কুল ছিল জজকোর্টের দক্ষিণ দিকের লম্বা বড় টিনের ঘরটায়। বর্তমানে এই ঘরটা সেটেলমেন্ট বিভাগের রেকর্ড রুমরূপে ব্যবহৃত হইতেছে, জিলা স্কুলের নূতন বাড়িতে সেই বারই প্রথম স্কুল উঠিয়া আসিয়াছে। নূতন স্কুল দালানের ভিতর-বাইর সবই তকতকা সুন্দর। চারিদিকে সব দেওয়াল নূতন। বিশেষত মাঝখানের হল ঘরটা একটা বিস্ময়ের বস্তু। মাঝখানে দাঁড়াইয়া কথা বলিলে সারা। হলটায় গম গম করিয়া আওয়াজ ওঠে। এমন সুন্দর স্কুলে পড়িতে পারিব না বলিয়া মনটা এমন খারাপ হইয়া গেল যে রাগে ঠিক করিলাম আবার আমার প্রিয় দরিরামপুরে ফিরিয়া যাইব।
