এরপর আমার সিদ্ধান্ত দুর্নিবার হইয়া উঠিল। রানীকে সম্মান দেখাইয়া যদি মহিষী বলা যায়, তবে রাজাকে সম্মান দেখাইয়া নিশ্চয়ই মহিষ বলা যায়। যাহা চিন্তা, তাহা কাজ। পাঠ্যপুস্তকের ঐ পাতাটি বাহির করিয়া সপ্তম এডওয়ার্ডের ছবির নিচের লেখাটা বাম দিকে ‘সম্রাট’ কথাটা সাফ কাটিয়া সে স্থলে যথাসাধ্য ছাপার হরফের মত সুন্দর করিয়া গুট-গুট হরফে মহিষ লিখিয়া রাখিলাম। সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে, এমনকি বড় ভাইয়ের কাছে, খুব জোরের সঙ্গে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলাম, বড় বড় রাজাকে মহিষ বলা হয়। আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলিয়া কেউ আমার কথায় সন্দেহ করিল না। এসব ব্যাপারে আমার মত কেউ মাথা ঘামাইতেন না। আধুনিক ভাষায়, গবেষণা করিতেন না।
পণ্ডিত মশায়ের একটা বরাবরের অভ্যাস ছিল তিনি ক্লাসে ঘুরিয়া ঘুরিয়া পড়াইতেন। তিনি চেয়ারে বসিলেই তার ঘুম পায়। ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবার সময় তিনি এক-এক সময় যাকে সামনে পাইতেন, তার হাত হইতেই খপ করিয়া পড়ার বইটা টানিয়া নিতেন এবং বই দেখিয়াই তিনি ছাত্রদেরে প্রশ্ন করিতেন। তিনি বলিতেন, এতে তার দুইটা উদ্দেশ্য সাধিত হইত। অনেকে দুষ্ট ছেলে আসল পড়ার বইটা হাতে না লইয়া যে কোনও একটা বই খুলিয়া মুখের সামনে ধরিয়া রাখিত এবং পাঠ্যবই পড়িতেছে বলিয়া মাস্টার মশায়কে ফাঁকি দিত। হেডপণ্ডিত মশায়ের ক্লাসে অমন চালাকি করিবার উপায় ছিল না। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, কোন ছেলে তার পড়ার বই কত পরিচ্ছন্ন রাখিয়াছে, তা দেখা। সেদিন তিনি এমন করিয়া আমার সাহিত্য বইটা টানিয়া নিলেন। পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে তাঁর নজর পড়বি-ত-পড় একেবারে রাজা-রানীর পৃষ্ঠায়। তিনি চোখ বড় করিয়াই কপালে তুলিলেন। তারপর আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : “এটা কে করেছে?
বলিয়া তিনি আমার সামনে আঙুল দিয়া ছবিটার কাটা জায়গা দেখাইলেন।
আমি ব্যাপার বুঝিলাম। নির্ভয়ে বলিলাম : আমি।’
পণ্ডিত মহাশয় আমার স্থিরভাব দেখিয়া রুষ্ট হইলেন। কঠোর সুরে বলিলেন : “এটা তোমারে কে শিখাইছে?”
আমি সপ্রতিভভাবে বলিলাম : আপনে সার।’
পণ্ডিত মহাশয় বিস্ময়-ক্রোধে গর্জিয়া উঠিলেন। বলিলেন : আমি?
তাঁর বাঁ হাতটা আমার ডান কানের দিকে আসিতে আসিতে ফিরিয়া গেল। বলিলেন : তুমিও শেষ পর্যন্ত “বাজাইরা” হৈতছ?
‘বাজাইরা’ হেডপণ্ডিত মহাশয়ের মুখে সবচেয়ে অপমানকর গাল। যেসব দুষ্ট ছাত্র স্কুল ছুটির পর সোজা বাড়ি মুখে রওয়ানা না হইয়া বাজারের দোকানে দোকানে আড্ডা মারিয়া বেড়ায়, তাদেরই হেডপণ্ডিত মশায় ‘বাজাইরা’ বলিতেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ছেলে জীবনে উন্নতি করিতে পারিবে না। লেখাপড়া তাদের হইবে না। পিতা-মাতার অবাধ্য হইবে এবং শেষ জীবনে তাদের অনেক কষ্ট-লাঞ্ছনা হইবে। হেডপণ্ডিত মহাশয়ের এক ‘বাজাইরা’ কথার মধ্যে এত এত সুদূরপ্রসারী অর্থ নিহিত ছিল। কাজেই খুব অপমান বোধ করিলাম। ঘাড় হেঁট করিয়া বলিলাম : রানী মহিষী হৈলে রাজা মহিষ হইব না কেন, সার?
আমার এই অকাট্য যুক্তির কোনও জবাব পণ্ডিত মহাশয় দিতে পারিলেন। তাই তিনি আরো বেশি রাগিয়া বলিলেন: ফের ‘যদি’ ‘বাজাইরার মত তর্ক করো তবে তোমারেও একদিন নারিকেলের ঝোকা’ বানাইয়া ছাড়ম। ক্লাসের ফার্স্ট বয় বৈলা খাতির করুম না।’
.
৭. পণ্ডিত মশায়ের অভিনব দণ্ড
নারিকেলের ঝোকার কথা শুনিয়া আমার পিলা চমকিয়া গেল। কারণ হেডপণ্ডিত মশায়ের এটা নিজস্ব মৌলিক আবিষ্কার। পণ্ডিত মশায় ছিলেন বিশুদ্ধ ব্রাহ্মণ। খুবই শুচিবাইগ্রস্ত লোক। ছাত্রদের কানের ময়লায় তার হাত ময়লা হয় বলিয়া বেশ কিছুদিন ধরিয়া কান মলা ছাড়িয়া দিয়াছেন। কিন্তু বাধ্য হইয়া কোনও ভয়ানক দুষ্ট ছাত্রের কান যদি তাকে মলিতেই হয়, তবে হাতে কাপড় লইয়া কান ধরিয়া থাকেন। সে কাপড়টাও ঐ দুষ্ট ছেলেরই গায়ের চাদর। অথবা শার্টের আঁচল। পারতপক্ষে তিনি আজকাল কারো কান মলেন না। তবু বরাবরের অভ্যাসমত রাগ হইলেই তাঁর বাঁ হাতটা ছাত্রদের কানের দিকে ছোটে। খানিক আগে আমারই কানের দিকে তার হাত ছুটিয়াছিল। আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয় বলিয়াই তার হাতটা ফিরিয়া গিয়াছে, তা নয়। তার আঙুলে আমার কানের ফিটের ময়লা লাগিবে বলিয়া। কানমলা ছাড়িয়া তিনি। ইদানীং ছিটকি অর্থাৎ লকলকা বাঁশের কঞ্চি ধরিয়াছেন। কিন্তু কিছুদিন আগে এক দুষ্ট ছেলেকে ছিটকির বাড়ি কশিতেই সে এমন গলা ফাটাইয়া ও মাগো, বাবাগো বলিয়া চিৎকার করে যে সারা স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্র দৌড়াদৌড়ি করিয়া সেই ক্লাসের সামনে ভিড় করেন। এমনকি থানা হইতে ছোট বা বড় কোনো দারোগা বাবুও আসিয়া পড়েন।
এরপর হইতে হেডপণ্ডিত মহাশয় ছিটকি ফেলিয়া নারিকেলের ঝোকা’র প্রবর্তন করেন। এই দণ্ডের কৌশলটা এই : তিনজন হইতে পাঁচ-ছয়-সাতজন ছেলেকে একত্রে দাঁড় করানো হইত। তাদের সকলের গলা বেড়িয়া একটা চাদরে দুই মাথা একত্র করিয়া পণ্ডিত মহাশয় নিজ হাতে লইতেন। তারপর দড়ির গিরো কশার মত করিয়া চাদরের দুই মাথায় আতেক্কা হেঁচকা টান মারিতেন। তাতে চাদর-বেড়া সব ছাত্রের মাথা ঠুকঠাক ঠুসঠাস ও ঘটাঘট শব্দ করিয়া পরস্পরের সঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাত করিত। তাতে নারিকেলের ঝোকার আওয়াজ পাওয়া যাইত। তিন-চারবার এরূপ করিলেই ছাত্ররা কান্নাকাটি ও কাকুতি-মিনতি শুরু করিত আর দুষ্টামি করিব না সার, কাল পড়া শিখিয়া আসিব, আজ মাফ করিয়া দেন স্যার ইত্যাদি।
