আর কোনও সন্দেহ থাকিল না। হেডমাস্টার বাবু ব্যস্ত মানুষ। তাঁর অবসর খুবই কম। সেই ব্যস্ততার মধ্যে তিনি তাড়াতাড়িতে এই পত্র লিখিয়াছিলেন। বস্তুত ব্যাপারটা আমার চক্ষের সামনে এখন স্পষ্ট ভাসিয়া উঠিল। আমাকে দাঁড়াইতে বলিয়া তিনি এই চিঠিটা লিখিয়াছিলেন। তাড়াতাড়িতে লিখিবার ফলে নিশ্চয় নূতন সরু নিবেরই দোষে ‘এন’-এর বাম। দিকটার টানটা পুরাপুরি পড়ে নাই। আমি লেফাফাটা আরো চোখের কাছে আনিয়া দেখিতে পাইলাম যে, ‘এন’-এর বাম দিকটার টানটা না পড়িলেও নিবের একটা আঁচড় ওখানে স্পষ্টই দেখা যাইতেছে।
.
৫. ‘ভুল’ সংশোধন
সুতরাং আমি স্থির করিয়া ফেলিলাম, চিঠিটা ডাকে দিবার আগে ওটা সংশোধন করিতে হইবে। সাথীদেরে, এমনকি আমার বড় ভাইকে কিছু। বলিলাম না। তাদের সাথে কেন পরামর্শ করিব? আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয়। ইংরাজিতে আমি এক শ নম্বরের মধ্যে পঁচানব্বইর কম কখনও পাই না। আর আমার সাথীরা পঞ্চাশ-ষাটের বেশি কেউ কখনও পান নাই। ইংরাজি শব্দ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিতে যাইব ওদেরে? একটা ফন্দি করিয়া সাথীদের নিকট হইতে আমি আলগা হইয়া পড়িলাম।
বাজারে গেলাম, ঢুকিলাম এক পরিচিত বড় দোকানে। দোকানের ফরাশের কলমদানে দুইটা দোয়াত ও চার-পাঁচটা কলম রাখা ছিল। পরীক্ষা করিয়া তারই একটা বাছিয়া লইলাম। কালি মিলাইয়া অতি সাবধানে ‘এন’ এর বাম দিককার টানটা লম্বা করিয়া ভাইস চেয়ারম্যানকে ‘নাইস’ চেয়ারম্যান করিয়া ফেলিলাম। চুষ কাগজ দিয়া ওটাকে নিপিস করিয়া শুখাইলাম। দৌড়াইয়া পোস্টাফিসে গেলাম। বরাবরের চেয়ে অনেক বেশি সাবধানে চিঠিটা বাক্সে ফেলিলাম। সে উদ্দেশ্যে বাক্সের হাঁ-করা মুখে হাত যতটা ঢুকে ততটা ঢুকাইলাম। চিঠিটা সশব্দে যখন বাক্সের তলায় পড়িল, তখন নিশ্চিত হইয়া আরামের নিশ্বাস ফেলিলাম। আল্লার দরগায় হাজার হাজার শোকর। আমার প্রাণপ্রিয় গর্বের ব্যক্তি হেডমাস্টার বাবুকে নিশ্চিত অপমানের ও বদনামের হাত হইতে রক্ষা করিতে পারিলাম!
এর দিন দশেক পরে একদিন হেডমাস্টার বাবু আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাঁর কামরায় গিয়া দেখিলাম, তিনি একা গম্ভীর মুখে বসিয়া আছেন। আমি ‘আদাব’ দিয়া সামনে দাঁড়াইলাম। তিনি বিষণ্ণ মুখে বলিলেন : ‘কিছুদিন আগে তোমারে একটা বড় লেফাফা ডাকে দিতে দিছিলাম মনে আছে?’
আমি : মনে আছে, সার।
হেডমাস্টার : তুমি সেটা নিজ হাতে ডাকবাক্সে দিছিলা? না, আর কারো হাতে দিছিলা?
আমি : আমি নিজ হাতেই বাক্সে দিছিলাম সার। সেই দিনই স্কুল থনে ফিরবার পথেই দিছিলাম। কেন সার? কী হইছে?
হেডমাস্টার বাবু আমার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করিয়া নিজেই প্রশ্ন করিলেন : ডাকবাক্সে ফেলবার আগে চিঠিটা বরাবর তোমারই কাছে আছিল? না, আর কারো কাছে দিছিলা?
আমি সোৎসাহে বলিলাম : না সার, আর কারো হাতে দেই নাই। অনেকেই অত বড় চিঠিটা দেখতে চাইছিল। কিন্তু চিঠিটা আমি হাতছাড়া করছি না। আমার হাতে রাইখাই সকলরে দেখাইছি। কেউরেই ছুঁইবার ধরবার দেই নাই।’
হেডমাস্টার বাবু কী যেন চিন্তা করিলেন। পরে বলিলেন : তুমি চিঠিটা ডাকে দিবার আগে লেফাফার ঠিকানা লেখাটা পড়ছিলা?
এতক্ষণে সব ব্যাপারটা আমার চক্ষের সামনে পরিষ্কার হইয়া আসিয়া উঠিল। একটা অজানা অশুভ চিন্তায় আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল। আমি বলিলাম : ‘জি সার, পড়ছিলাম।’
হেডমাস্টার বাবু আড়চক্ষে আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : ‘ওতে কোনো রকম ভুল তোমার নজরে পড়ছিল কি?
আমার মনে অশুভ চিন্তা মুহূর্তে কাটিয়া গেল। আমি উৎসাহভরে বলিলাম : ‘হ সার। আপনার তাড়াতাড়ির জন্য একটা টান অস্পষ্ট হৈয়া গেছিল। তাতে ‘নাইস’ শব্দটা ভাইস’ হৈয়া গেছিল। আমি ওটা ঠিক কৈরা দিছিলাম।
মোচের নিচে অতিকষ্টে হাসি গোপন করিয়া গম্ভীর মুখে হেডমাস্টার বাবু বলিলেন : এ ভুল সংশোধনের জন্য স্কুলের সাহায্য কাটা যাবার এবং আমার চাকরি যাবার সম্ভাবনা হইছে। অমন সংশোধন আর কখনও কইর না। ময় মুরুব্বি গুরুজনের ভুল সংশোধন করবার আগে চিন্তাভাবনা কইর।
বলিয়া তিনি আরেকটা লম্বা লেফাফা দেখাইলেন। বলিলেন যে লোকাল বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান রাগ করিয়া ঐ পত্রটা পাঠাইয়াছেন। তিনি মনে করিয়াছেন হেডমাস্টার বাবু তাঁর সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরা করিয়াছেন। অতঃপর হেডমাস্টার বাবু আমাকে ভাইস চেয়ারম্যান শব্দের অর্থ বুঝাইয়া দিলেন। আমি লজ্জায় মাটির সাথে মিশিয়া যাইতে থাকিলাম। হেডমাস্টার বাবু আমার দুর্দশা দেখিয়া দয়াপরবশ হইলেন। আমাকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দিয়া ক্লাসে ফিরিয়া যাইতে বলিলেন।
হেডমাস্টার বাবুর কাছে অত সহজে রেহাই পাইয়া তাঁর প্রতি আমার ভক্তি আরো বাড়িয়া গেল। তিনি আমার এই এই লজ্জাজনক ব্যাপারটা কারো কাছে প্রকাশ করিলেন না। হেডপণ্ডিত ঈশান চন্দ্র রায় মশায়ের নিকট এই ব্যাপারটা ঘটিলে কী যে ঘটিত বলা যায় না। সারা গা কাঁটা দিয়া উঠিল। মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। ঘটনাটা এই:
.
৬. মহিষ ও মহিষী
আমাদের বাংলা সাহিত্যের বইয়ে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড ও রানী আলেকজান্দ্রার দুইটা ছবি ছিল। দুইটা ছবিই সমান সাইযের আন্ডার মত গোলাকার। দুইটা ছবিই একই পৃষ্ঠায় পাশাপাশি ছাপা। রাজার ছবির নিচে লেখা ছিল : সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড। আর রানীর ছবির নিচে লেখা ছিল মহিষী আলেকান্দ্রা’। সপ্তম এডওয়ার্ড তখন আমাদের রাজা। সকলেই তাঁর নাম জানিতাম। রাজা-সম্রাটদের ‘বউ’ থাকে, এ জ্ঞানও আমার ছিল। সুতরাং রাজার পাশের ছবির মেয়ে লোকটা রাজার বউ হইবেন, তাতে আমার সন্দেহ থাকিল না। কিন্তু তাঁকে মহিষী বলা হইবে কেন, এটা আমি বুঝিতে পারিলাম না। চাচাজীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, বড় বড় রাজা-বাদশার স্ত্রীকে সম্মান করিয়া মহিষী বলা হয়। চাচাজীর জবাবে সন্তুষ্ট না হইয়া হেডপণ্ডিত মশায়ের কাছে জিজ্ঞাসা করিলাম। বুঝিলাম, চাচাজী ঠিকই বলিয়াছেন। পণ্ডিত মহাশয় কিছু কিছু অবোধ্য সংস্কৃত আওড়াইয়া ধাতু প্রত্যয় বুঝাইবার। চেষ্টা করিয়া বলিলেন যে সংস্কৃত মহ+ইষ=মহিষ হইতে মহিষী হইয়াছে। আমি যাহা বুঝিবার বুঝিলাম।
