হেডমাস্টার বাবু যখন জানিতে পারিলেন যে, স্কুলে যাতায়াত করিতে আমরা কয়জন বৈলর পোস্টাফিসের সামনে দিয়াই যাওয়া-আসা করিয়া থাকি, তখন তিনি এক সহজ উপায় বাহির করিলেন। তিনি স্কুলের সমস্ত চিঠিপত্র আমাকে দিয়া পোস্ট করাইতে লাগিলেন। তাতে আমার কোনোই অসুবিধা হইত না। স্কুল হইতে ফিরিবার পথে চিঠিগুলি পোস্টাফিস ঘরের বেড়ায় মুখ হাঁ-করা ডাকবাক্সে ফেলিয়া দিয়া যাইতাম।
ফলে যেদিন হেডমাস্টার বাবুর চিঠি থাকিত, সেদিন পোস্টাফিস হইয়া যাওয়া আমার উপর বাধ্যতামূলক হইয়া পড়িত। আমাদের বাড়ি হইতে দরিরামপুর যাতায়াত করিবার একাধিক রাস্তা ছিল। পোস্টাফিসের সামনের রাস্তা তার মধ্যে একটি। কবে কোন রাস্তায় যাইব, সেটা নির্ভর করিত সাথীদের উপর। স্কুল হইতে বাহির হইবার সময় এক রাস্তার একই দিকে অনেক ছাত্র চলিতাম। তারপর আগ বাড়িতে-বাড়িতে সাথীসংখ্যা কমিতে থাকিত। একজন-দুইজন করিয়া ভিন্ন রাস্তায় আমরা ভাগ হইয়া পড়িতাম। পোস্টাফিসের কাছে আসিতে আসিতে আমরা চার-পাঁচজনে পরিণত হইতাম। এদের অধিকাংশের মত অন্য রাস্তায় যাইবার পক্ষে হইলে সাধারণত আমি ও মিঞা ভাই তা মানিয়া লইতাম। কিন্তু হেডমাস্টার বাবুর চিঠি ডাকে দেওয়া থাকিলে কিছুতেই আমি অন্য রাস্তায় যাইতে পারিতাম না। সাথীরা রাগ করিয়া আমাকে একা ত্যাগ করিও না। সে অবস্থায় আমার বড় ভাইই আমার একমাত্র সাথী হইতেন। এইটুকু অসুবিধা আমি সহজেই অগ্রাহ্য করিতাম। কারণ হেডমাস্টার বাবু জরুরি চিঠিপত্র আমার হাতে দিয়া বিশ্বাস করেন, এটা কম গৌরবের কথা নয়। বস্তুত এ জন্য আমার অনেক বন্ধু ঈর্ষাপরায়ণ হইয়াছে। আমার উপরের ক্লাসের কয়েকজন বয়স্ক ছাত্র হেডমাস্টার বাবুর চিঠি ডাকে দেওয়ার ভার লইতে চাহিয়াছেন, কিন্তু হেডমাস্টার বাবু রাজি হন নাই।
নিয়মিতভাবে পরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমি এই দায়িত্ব পালন করিয়া চলিলাম। ছয় মাস চলিয়া গেল। কোনও ত্রুটি বা অসুবিধা হইল না। কিন্তু ছয় মাস পরে একটা গোলমাল হইয়া গেল।
ব্যাপারটা এই :
.
৪. হেডমাস্টারের ‘ভুল’
তৎকালে দরিরামপুর স্কুল লোকাল বোর্ড হইতে মাসিক অর্থ সাহায্য পাইত। সে জন্য আইন অনুসারে স্কুলের হেডমাস্টারকে লোকাল বোর্ড অফিসে একটি ষান্মাসিক রিপোর্ট পাঠাইতে হইত। এ বছরের ষান্মাসিক রিপোর্টও যথারীতি তিনি আমাকেই পোস্ট করিতে দিলেন। এটা ছিল একটা লম্বা ইনভেলাপ। অত বড় চিঠি এর আগে আমরা কেউ দেখি নাই। কাজেই পথে আসিতে সাথীরা সবাই এটা দেখিতে চাইল। আমি এক্সারসাইয বুকের মলাটের ফাঁক হইতে বাহির করিয়া সকলকেই দেখাইলাম। কিন্তু কাউকে ছুঁইতে দিলাম না। সাথীদের দেখাইতে গিয়া আমারও কৌতূহল হইল। আমি নিজে পথ চলিতে চলিতে চিঠিটা দেখিতে থাকিলাম। স্পেলিং করিয়া করিয়া ঠিকানাটা পড়িবার চেষ্টাও করিলাম। চিঠিটার ঠিকানা ছিল ‘টু দি ভাইস চেয়ারম্যান লোকাল বোর্ড সদর ময়মনসিংহ।’ কারণ তৎকালে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের এবং এসডিওরা মহকুমার লোকাল বোর্ডের এক্স-অফিশিও চেয়ারম্যান থাকিতেন। ঐ সব প্রতিষ্ঠানেই নির্বাচিত মেম্বরদের মধ্য হইতে একজন ভাইস চেয়ারম্যান হইতেন। কার্যত এই ভাইস চেয়ারম্যানই ঐ প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। সে জন্য সাধারণত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের লেখা সমস্ত চিঠিপত্র ভাইস চেয়ারম্যানের নামেই পাঠাইবার নিয়ম ছিল। কিন্তু আমি দশ বছরের শিশু। অতশত কি জানি? আমি ক্লাস ফোরের ভাল ছাত্র। ওয়ার্ডবুক আমার মুখস্থ। ম্যান’ মানে মানুষ, চেয়ার’ মানে কুরসি, এটা তো সোজা কথা। কাজেই চেয়ারম্যান। মানে কুরসি বানাইবার সুতারমিস্ত্রী, এটাও আমার মত ভাল ছাত্রের পক্ষে বুঝা কঠিন হইল না। কিন্তু চিন্তায় পড়িলাম আগের শব্দটা লইয়া। এটা কী? একটা খাড়া টান দিয়া তার গোড়া হইতে ডান দিকে একটা তেরছা টান বেশ লম্বা করিয়া যে হরফটা লেখা হইয়াছে তাতে শব্দটা হয় ভাইস’। কিন্তু এখানে সে শব্দের কোনও মানে হয় না। ভাইস মানে পাপ’। পাপের সাথে চেয়ার বা সুতারমিস্ত্রীর কোনও সম্পর্ক থাকিতে পারে না। কাজেই একটা কিছু ভুল এখানেই হইয়াছে। তাতে সন্দেহ নাই। হেডমাস্টার বাবুকে আমি শুধু শ্রদ্ধা করিতাম না, ভালবাসিতাম। তার মত পণ্ডিত লোক খুব কমই আছে। এই ছিল আমার বিশ্বাস। তাঁরই নিজ হাতে লেখা একটা চিঠি এমন বড় একটা ভুল লইয়া শহরে চলিয়া যাইবে, আর শহরের সরকারি লোকের নিকট আমার প্রিয় হেডমাস্টারের দুর্নাম হইবে, এটা আমার কিছুতেই সহ্য হইতেছিল না। আমি আমার সমস্ত বিদ্যা-বুদ্ধি খাটাইয়া এই ভুল সংশোধনের উপায় চিন্তা করিতে লাগিলাম। অনেক গবেষণা করিলাম। আমাকে চিন্তিত দেখিয়া এবং সাথীদের হৈ হল্লা ও অট্টহাসিতে বরাবরের মত যোগ দিতেছি না দেখিয়া অনেকেই কারণ জিজ্ঞাসা করিল। আমি সবচেয়ে ভাল ছাত্র। এ ব্যাপারে তাদেরে জিগাইবার কী আছে? আমি কিছু না বলিয়া তাদেরে এড়াইয়া চলিলাম এবং চিন্তা ও গবেষণা চালাইয়া গেলাম। ক্রমে সাথী-সংখ্যা কমিতে লাগিল। আমিও অধিকতর সূক্ষ্মভাবে ভাইস কথাটার উপর চোখ বুলাইতে লাগিলাম। এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে একটা বস্তু আমার নজরে পড়িল। দেখিলাম, “ভি’র খাড়া টান-টান মাথার পিছন দিকে অর্থাৎ বাম দিকে সূক্ষ্ম ও অতি ক্ষুদ্র একটি টান নিচ মুখে হেলিয়া রহিয়াছে। এই টানটি আরো একটু লম্বা হইলেই হরফটা ভি’ না হইয়া এন’ হইয়া যাইত। বিদ্যুতের বেগে আমার মাথায় একটা অনুপ্রেরণা নাজিল হইল। হাঁ, এটা ‘এন’-ই বটে। শব্দটা তবে ভাইস’ নয় নাইস’। এবার ব্যাপারটা আমার কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হইয়া গেল। নাইস’ মানে সুন্দর। ঠিক, হেডমাস্টার বাবুর সুন্দর চেয়ারের জন্য শহরে অর্ডার দিয়াছেন। চিঠিতে চেয়ারের সাইয মাপ ও কাঠ ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা দিয়াছেন নিশ্চয়ই। কাজেই অত বড় চিঠি। এইবার আমার মনে পড়িয়া গেল, মাত্র কয়েক দিন আগে হেডমাস্টার বাবু সেক্রেটারি জনাব মানিক হাজী সাহেবের সঙ্গে স্কুলের এবং টিচারদের কমনরুমের চেয়ারের অভাবের কথা এবং শীঘ্রই কতকগুলি ভাল চেয়ার আনিবার কথা আলোচনা করিয়াছিলেন। সেই আলোচনায় হেডমাস্টার বাবু স্কুলের সেক্রেটারি মানিক হাজী সাহেবকে এমন কথাও বলিয়াছিলেন যে ভাঙা চেয়ারে বসিতে গিয়া অনেক শিক্ষকের জামাকাপড়ও দু-একবার ছিঁড়িয়া গিয়াছে।
