.
২. হেডমাস্টারের নজরে সত্যবাদিতা
হেডমাস্টার বসন্ত বাবুর প্রিয় ছাত্র হই আমি এক আকস্মিক ঘটনায়। সেদিন আমাদের ক্লাসটিচার ছিলেন অনুপস্থিত। আমাদের ক্লাসের ছাত্রসংখ্যা ছিল চল্লিশের মত। এত বড় ক্লাসে ক্লাসটিচার না থাকিলে যা হওয়ার কথা তাই হইল। তুমুল হট্টগোল চলিতে লাগিল। হঠাৎ হেডমাস্টার বাবু আসিয়া ক্লাসের দরজায় দাঁড়াইলেন। ক্লাসের উপর যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হইল। হেডমাস্টার বাবুকে ছাত্ররা যমের মত ভয় করিত। কাজেই সারা ক্লাস একদম চুপ। নিঃশব্দে সকলে যার-তার সিটে দাঁড়াইয়া রহিলাম। হেডমাস্টার বাবু গম্ভীর মুখে একপা-দুপা করিয়া ক্লাসে ঢুকিলেন। ভাটার মত চোখ দুইটা সারা ক্লানের উপর দিয়া একবার ঘুরাইয়া নিয়া কঠোর আদেশের সুরে বলিলেন : “তোমরা সকলেই বসো। যন্ত্রচালিত-মত আমরা নিঃশব্দে বসিলাম। তিনি এইবার বজ্রনির্ঘোষে বলিলেন : “এইবার কও, গোলমাল করিয়াছে কে?’ ভয়ে সব ছাত্রেরই হাঁটু ঠকঠক করিতেছে। জিভ শুকাইয়া গিয়াছে। কেউ জবাব দিল না। হেডমাস্টার বাবু আবার গর্জন করিলেন : ‘কথার জবাব দাও। বলো, কে গোলমাল করিয়াছ?’
নিথর নিঃশব্দে ক্লাসের মধ্যে আমি অতি কষ্টে দাঁড়াইলাম। আমার হাঁটু ঠকঠক করিতেছিল। সারা গায় ঘাম ছুটিয়া গিয়াছিল। আমার জিভ শুকাইয়া গিয়াছিল। কোনো কথা বলিলাম না। শুধু, ফ্যালফ্যাল করিয়া হেডমাস্টার বাবুর দিকে তাকাইয়া রহিলাম। হেডমাস্টার বাবু আমার দিকে তাকাইলেন এবং বলিলেন : তুমি গোলমাল করিয়াছ?
আমার গলা দিয়া কথা আসিতে চাহিল না। কাজেই মাথা ঝুকাইলাম এবং ধরা গলায় বলিলাম : ‘জি, সার। হেডমাস্টার বাবুর মুখের গাম্ভীর্য বিস্ময় কৌতূহলে রূপান্তরিত হইল। তিনি কৌতূহলের সুরে বলিলেন : তুমি একাই গোলমাল করিয়াছ?
আমি আবার শির ঝুকাইয়া ধরা গলায় বলিলাম : ‘জি, সার।
এবার হেডমাস্টার বাবু লম্বা মোচের নিচে মুচকি হাসিলেন। বলিলেন : ‘এত বড় গোলমালটা তুমি একাই করিয়াছ? আর কেউ করে নাই?
আমি মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম।
হেডমাস্টার বাবু আবার গম্ভীর সুরে বলিলেন : ‘এক জনে গোলমাল করা যায় না। এই ছেলে সত্য কথা কহিয়াছে। আর তোমার কেউ সত্য কথা কও নাই। এই ছেলে সত্য কথা বলার পুরস্কার পাইবে। সে একা বসিবে। আর তোমরা সকলে স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়াইয়া থাকিবা।
বলিয়া হাসিমুখে আমার দিকে চাহিয়া স্নেহমাখা সুরে বলিলেন : তুমি বসো। তোমার নাম কী?
আমি নাম বলিলাম। তিনি আবার বলিলেন : তুমি বসো।’ আমি বসিলাম। হেডমাস্টার বাবু আর সকলের দিকে চাহিয়া বলিলেন : তোমরা দাঁড়াইয়া থাকো। সকলে দাঁড়াইল। হেডমাস্টার বাবু ক্লাস থনে বাহির হইয়া গেলেন।
হেডমাস্টার বাবুর এই শাস্তিতে সারা ক্লাস শান্তই ছিল। আর কেউ কোনও গোলমাল করে নাই। তবু কিছুক্ষণ পরে চুপে চুপে পা ফেলিয়া হেডমাস্টার বাবু আমাদের ক্লাসে উঁকি দিলেন। ছাত্ররা তার আদেশ পালন করিতেছে কি না, তা দেখিবার জন্যই বোধ হয় তিনি আসিয়াছিলেন। তিনি ক্লাসের দরজায় দাঁড়াইয়া দেখিলেন, সকলে তো দাঁড়াইয়া আছেই, আমিও দাঁড়াইয়া আছি।
তিনি তখন ক্লাসে ঢুকিলেন। আমার দিকে চাহিয়া তিরস্কারের সুরে বলিলেন : “তোমাকে ত আমি বসিতে বলিয়াছিলাম। তুমি দাঁড়াইয়া আছ। কেন?
আমি মাথা হেঁট করিয়া রহিলাম। কোনও জবাব দিলাম না। হেডমাস্টার বাবু এবার কঠোর হইয়া বলিলেন : ‘কেন তুমি বসো নাই? কেন আমার আদেশ অমান্য করিলা?’
আমি ফোৎ ফোৎ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিলাম। হেডমাস্টার বাবু অবাক হইয়া আগ বাড়িলেন। আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিলেন : ‘কাঁদো কেন? কী হইয়াছে?’
হেডমাস্টার বাবুর স্নেহমাখা সুরে আমার সাহস বাড়িল। তখন কান্না রুখিয়া অতি কষ্টে বলিলাম : আমার মিঞা ভাই এই ক্লাসেই আছে। তারে খাড়া রাইখা আমি বসি কেমনে?
হেডমাস্টার বাবু হাসিমুখে বলিলেন : ‘তোমার মিঞা ভাই কে?’
আমি আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিলাম। হেডমাস্টার বাবু তাঁকে বলিলেন : ‘তোমার ছোট ভাই-এর খাতিরে তোমাকেও বসিতে দিলাম। তোমরা দুই ভাই বসো। আর সকলে দাঁড়াইয়া থাকো।’
আমরা দুই ভাই এতক্ষণ দুই জায়গায় ছিলাম। এইবার দুজন একত্র হইয়া আরামসে বসিয়া রহিলাম। আর দাঁড়ানো সহপাঠীদের দুর্দশা হাসিমুখে উপভোগ করিতে লাগিলাম।
এতে আমরা দুই ভাই কিছুদিনের জন্য সহপাঠীদের চক্ষুশূল হইলাম বটে, কিন্তু অল্পদিনেই সে ভাব কাটিয়া গিয়াছিল। তবে এই ঘটনায় আমি হেডমাস্টার বাবুর সুনজরে পড়িলাম। তিনি ঐ গল্প সারা স্কুলে ছড়াইয়া। দেওয়ায় অন্য মাস্টাররা এবং অপর ক্লাসের ছাত্ররা আমাকে খুব ভালবাসিতে লাগিলেন। আমি ছাত্রও ভাল ছিলাম। ষান্মাসিক ও বার্ষিক পরীক্ষায় প্রায় সকল সাবজেকটেই ফার্স্ট হইতাম। এটাও আমার জনপ্রিয়তার কারণ ছিল।
এইভাবে হেডমাস্টার বাবুর স্নেহাদরের মধ্যে ক্লাস ফোরে উঠিবার পর হেডমাস্টার বাবুর সাথে আবার আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটিয়া যায়। সে ঘটনাটি ঘটে এইভাবে :
.
৩. হেডমাস্টারের ডাক-হরকরা
তখনও ত্রিশাল পোস্টাফিস হয় নাই। বৈলরের পোস্টাফিস মারফতই তখনও এই স্কুলের চিঠিপত্র যাতায়াত হয়। বৈলর পোস্টাফিস আমাদের বাড়ির কাছে। স্কুলে যাতায়াত করিতে আমাদের এই পোস্টাফিসের সামনে দিয়াই যাইতে হয়। দরিরামপুর অঞ্চলে সপ্তাহে একবার মাত্র চিঠিপত্র বিলি হইত। বৃহস্পতিবার দিন ত্রিশাল বাজারের হাট বার। বিরাট হাট। পঞ্চাশ হাজার হইতে প্রায় এক লক্ষ লোক এই হাটে জমায়েত হইত। বৈলর পোস্টাফিসের পিয়ন ত্রিশালের বাজারে এই হাটের দিন এক নির্দিষ্ট জায়গায় বসিতেন। স্কুল, মাদ্রাসা, থানা, সাবরেজিস্টারি আফিস ও এতদঞ্চলের সমস্ত চিঠিপত্র এইখান থনেই বিলি হইত। পিয়ন ঐ দিন প্রচুর পোস্টকার্ড, স্ট্যাম্প, ইনভেলাপ নিয়া আসিতেন। ওখানে বসিয়াই বিক্রি করিতেন। বাজারের এক দোকানের বারান্দায় একটি চিঠির বাক্স টানানো ছিল। ঐ দিন পিয়ন ঐ বাক্স খুলিয়া চিঠিপত্র লইয়া যাইতেন। তা ছাড়া পিয়নের হাতে হাতে চিঠি দিয়া দিলেও ডাকে দেওয়া হইয়া যাইত। অবশ্য ত্রিশাল বাজারে প্রবেশ করিবার আগে পিয়নকে দরিরামপুর হইয়া আসিতে হইত। সে জন্য থানা সাবরেজিস্টারি আফিস ও স্কুল-মাদ্রাসার পত্রগুলি অনেক সময় তিনি যার-তার আফিসেই দিয়া আসিতেন। তবু এদের সকলের অসুবিধা হইত।
