এই সব স্বপ্নের বিস্ময়কর ফল হইল। আমি মুখরেজ ও তালাফুয এমন রত করিয়া ফেলিলাম যে মাদ্রাসায় সবক লইবার সময় উস্তাদজিদের ভুল ধরিতে লাগিলাম।
অধ্যায় চার – নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষা–দরিরামপুরে
১. ত্রিশাল-দরিরামপুর–বনাম ও বেনাম
১৯০৯ সালের জানুয়ারি মাসে আমি ও আমার বড় ভাই মোহাম্মদ মকিম আলী দরিরামপুর মাইনর স্কুলের ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হই। শামসুদ্দিন ও সদরুদ্দিন দুই ভাইও আমাদের সাথে নিম্ন-প্রাথমিক পাশ করিয়া ময়মনসিংহ শহরে গিয়া জিলা স্কুলে ভর্তি হয়।
দরিরামপুর মাইনর স্কুল ছিল একেবারে নূতন। আমরা যে বৎসর সেখানে ভর্তি হইলাম, সেই বারই উহা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম প্রতিষ্ঠিত হইলেও সে নয়া স্কুলে আমাদের উপরের ক্লাসে অর্থাৎ ক্লাস ফোর-ফাইভে এবং সম্ভবত সিক্সেও ছাত্র ভর্তি হইয়াছিল। কাজেই এক মাইনর স্কুলেই ছাত্রসংখ্যা ছিল দেড় শর কাছাকাছি। তার উপর স্কুলঘরের লাগাই ছিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি ছিল পুরান নেসাবের। তাতে ছাত্র ছিল পঞ্চাশের উপর। ফলে মোট প্রায় দুই শ ছাত্র একই জায়গায় পড়াশোনা করিতাম।
স্কুল-মাদ্রাসার সামনেই ত্রিশাল থানা। ত্রিশাল গ্রাম আসলে সুতোয়া নদীর পশ্চিম পারে। থানাটি অবস্থিত নদীর পূর্ব পারের দরিরামপুর গ্রামে। এর কারণ, থানার অবস্থিতি লইয়া দুই গ্রামের মধ্যে বিরোধ হইয়াছিল। নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যস্থতায় এই আপস হইয়াছিল যে, থানার অবস্থান হইবে দরিরামপুর গ্রামে, কিন্তু থানার নাম হইবে ত্রিশাল। ইহার ফল এই হইয়াছিল যে থানা প্রতিষ্ঠিত হইবার অল্পদিন পরই সাবরেজিস্টারি অফিসও স্থাপিত হইয়াছে। থানার অনুকরণে সাবরেজিস্টারি অফিসেরও নাম হইয়াছে। ত্রিশাল। কিন্তু তার অবস্থান হইয়াছে দরিরামপুরে। এই নিয়ম আজও চলিতেছে। এর কয়েক বছর পরে পোস্টাফিস হইয়াছে দরিরামপুরে। নাম তার ত্রিশাল। সম্প্রতি রেভিনিউ, কৃষি, পল্লি উন্নয়ন ও টেলিগ্রাফ অফিস ইত্যাদি যতগুলি সরকারি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হইয়াছে; সবগুলির অবস্থান হইয়াছে দরিরামপুরে কিন্তু নাম হইয়াছে ত্রিশাল। সুতরাং এত দিনে দেখা যাইতেছে যে গোড়ার এ আপসরফায় ত্রিশালেরই জয় হইয়াছিল। সব প্রতিষ্ঠানই ত্রিশালের নাম বহন করিতেছে; কিন্তু সন্তান উদরে ধরিতেছে দরিরামপুর। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এই নিয়ম চলে নাই। হাইস্কুলের অবস্থান ও নাম দরিরামপুরই রহিয়াছে। সম্প্রতি যে কলেজ স্থাপিত হইয়াছে তারও নাম দরিরামপুর। আমি যখন দরিরামপুর মাইনর স্কুলে ভর্তি হইলাম, তখন সাবরেজিস্টারি অফিসও মাত্র কয়েক দিন আগে স্থাপিত হইয়াছে। থানা ও সাবরেজিস্টারি অফিসে কার্যোপলক্ষে প্রতিদিন বহু লোক যাতায়াত করিতেছে। দুই শ ছাত্র, প্রায় পনের জন মাস্টার-মোদাররেস। ছাত্রদের অভিভাবকদেরও অনেকে যাতায়াত করিতেন। এই সব লোকজনের নিত্যপ্রয়োজন মিটাইবার জন্য ডিবি রোডের পার্শ্বে বেশ কয়েকটি দোকানপাট খোলা হইয়াছে। কাপড় সিলাই করিবার জন্য একখানা খলিফার দোকান বসিয়াছে। এখানে বলিয়া রাখা দরকার, ময়মনসিংহ হইতে ডিবি রাস্তা থানা ও সাবরেজিস্টারি অফিসের সামনে দিয়া সুতোয়া নদী পার হইয়াছে এবং ত্রিশাল বাজার ভেদ করিয়া পুড়াবাড়ি পর্যন্ত গিয়াছে। বর্তমানে এই রাস্তা পাকা হইয়াছে এবং সুতোয়া নদীর উপর পাকা পোলও হইয়াছে। কিন্তু তৎকালে নদীতে পোল হয় নাই। রাস্তাটি ছিল কাঁচা।
যা হোক দুই শ ছাত্রের স্কুলেও পার্শ্ববর্তী স্থানে এত লোক সমাগমে আমি সম্পূর্ণ নূতন জীবনের স্বাদ পাইলাম। এত বড় স্কুল। এত সব ছাত্র। এত সব মাস্টার-মৌলবী। সারা দিন এত লোকের আসা-যাওয়া। দারোগা সাহেব পরেন খাকি হাফপ্যান্ট ও সাবরেজিস্টার বাবু সাদা কোট প্যান্টালুন। তাঁদের যাতায়াত সাইকেলে। অবাক বিস্ময়ে এসবের দিকে চাহিয়া থাকিতাম। রাস্তা ঘাটে অনবরত লোকজনের ডাক-চিৎকার তো শুনিতামই। খোদ স্কুলের মধ্যেও যেন পড়ুয়াদের আওয়াজ গমগম করিত। এই নয়া পরিবেশ আমার কাছে স্বপ্নের মত লাগিত। আমি যেন স্বপ্নে কোনো অজানা রাজ্যে আসিয়াছি। যেন শীঘ্রই স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া যাইবে।
কিন্তু স্বপ্ন ভাঙ্গিল না। আস্তে আস্তে পরিবেশে মিলিয়া গেলাম। সবই বাস্তব হইয়া আসিল। এবং ভালও লাগিল। স্কুলের মাস্টার ছিলেন মোট সাতজন। বাবু বসন্তকুমার সেন ছিলেন হেডমাস্টার। তার বাড়ি ছিল নেত্রকোনা। বাবু কৈলাস চন্দ্র দে ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। তাঁর বাড়ি ত্রিশাল থানার কাঁঠাল গ্রামে। হেডপণ্ডিত ছিলেন বাবু ঈশান চন্দ্র রায় তর্কালঙ্কার। তাঁর বাড়ির ঠিকানা মনে নাই। সেকেন্ড পণ্ডিত ছিলেন জনাব খিদির উদ্দিন খাঁ। বাড়ি ছিল ফুলবাড়িয়া থানার মাগুরজোড়া গ্রামে। হেডমৌলবী ছিলেন মৌ. যহুরুল হক। বাড়ি আমাদেরই পার্শ্ববর্তী গ্রাম বৈলরের কানহর নামক মৌযায়। এ ছাড়া আরো দুইজন শিক্ষক ছিলেন। একজনের নাম মোহাম্মদ শাহজাহান মিঞা। আরেকজনের নাম ছিল জনাব আব্বাস আলী।
শিক্ষকদের মধ্যে হেডমৌলবী মৌ, যহুরুল হক সাহেব আমার এক মামুর সম্বন্ধী। কাজেই তিনি আমাকে আগে হইতেই চিনিতেন। তা ছাড়া তিনি প্রতি শনিবার অবশ্যই এবং সপ্তাহের আরো দুই-এক দিন আমাদের সঙ্গেই বাড়ি আসিতেন। এবং ফিরিবার কালে প্রায় সবদিনই একই সঙ্গেই যাইতেন। কাজেই তার সঙ্গে স্বভাবতই ঘনিষ্ঠতা হয়। সেকেন্ড পণ্ডিত জনাব খিদির উদ্দিন খাঁ সাহেবের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। সেকেন্ড পণ্ডিত জনাব খিদির উদ্দিন খাঁ সাহেবের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয় অন্য কারণে। আমার চাচা জাফর সাহেব ছিলেন পণ্ডিত সাহেবের নিকট প্রতিবেশী। চাচাজীর প্রতি পণ্ডিত সাহেবের পরিবারের উচ্চ ধারণা ছিল। গাজী সাহেবের পুত্র বলিয়া চাচাজীকে তারা সম্মান করিতেন। প্রায়ই তিনি জাফর চাচার তারিফ করিতেন। সে জন্য মনে মনে পণ্ডিত সাহেবের প্রতি আমি একটা আত্মীয়তা অনুভব করিতাম।
