কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য উচ্চারণগত এই সব সূক্ষ্ম পার্থক্যের কোনও মূল্য নাই। তাদের কাছে মাত্র দুইটি হরফে এই পার্থক্য পালন সীমাবদ্ধ হইয়াছে। ইংরাজি জে (‘জি’সহ) ও ‘যেডের পার্থক্য ও আরবি ‘জিম’ ও। ‘যে’র পার্থক্য। ইংরাজির ‘জে’ ও ‘জি’ (যে শব্দে ‘গ’ হয় না) এবং আরবির ‘জিম’ মূর্ধন্য বর্ণ। এগুলি আলাজিভের সঙ্গে জিভের স্পর্শ হইতে বাহির হয়। পক্ষান্তরে ইংরাজি ‘যেড’ ও আরবির ‘যে’ (যাল’সহ) দন্ত্য বর্ণ। আরবি যোয়াদ, যোয় যদিও দন্ত্য নয় ঔষ্ঠ্য, তবু তাদের নৈকট্য দন্ত্য ‘যে’ ‘যালের সাথে, মূর্ধন্য’ ‘জিমের সাথে নয়।
আরবিতে এই আঙ্গিক উৎপত্তিগত পার্থক্য মানিয়া চলাকেই মুখরেজ আদায় করা বলে। ইংরাজিতে এটাকে বলে ফনেটিকস।
পক্ষান্তরে তালাফুযও উচ্চারণ-ভঙ্গি বটে, কিন্তু সেটা হরফের আঙ্গিক বুৎপত্তির উপর নির্ভর করে না। শব্দকে হ্রস্ব, দীর্ঘ, লম্বা, খাটো করা, কোনও হরফ বা শব্দের উপর কম বা বেশি জোর একসেন্ট দেওয়া, বাক্যের কোন জায়গায় থামা বা না থামা, বেশি থামা বা কম থামা ইত্যাদি তালাফফুযের অন্তর্ভুক্ত। ইংরাজিতে যাকে একসেন্ট এ্যামফেসিস্ ও ফুলস্টপ বলা হয়, আরবিতে যাকে মদ্দ, তশদিদ, আয়াত, ওয়াকফা বলা হয়, বাংলায় যাকে পুত, বা দাড়ি বলা হয়, এই সবই তালাফুযের অংশ। একটা খুব সাধারণ দৃষ্টান্ত দিতেছি। ‘চ’ মূর্ধন্য হরফ। এটাকে দন্ত্য উচ্চারণ করিলে এটা হইবে মুখরেজের খেলাফ। কিন্তু ঠিকমত ‘চ’ মূর্ধন্য উচ্চারণ করিয়াও ‘চোর’ শব্দকে ‘চুর উচ্চারণ করিলে এটা হইবে তালাফুফের খেলাফ। সোজা কথায় ইংরাজিতে যাকে বলে ফনেটিকস, বাংলায় ধ্বনিতত্ত্ব, আরবিতে তাই মুখরেজ। তেমনি ইংরাজিতে যাকে বলে পাংচুয়েশন, বাংলায় যতি, আরবিতে তাই তালাফফুয। বিশেষ করিয়া কোরআন শরিফ তিলাওয়াতে পুরাপুরি মুখরেজ-তালাফুয আদায় করার দিকে বিশেষ তাগিদ আছে। কিন্তু আমার উস্তাদদের মধ্যে বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এমনকি স্থানীয় আলেম-ওলামার মধ্যেও কারো এ বিষয়ের তীক্ষ্ণ জ্ঞান ছিল না। বিশেষত, মুখরেজের গুরুত্ব তারা মোটেই বুঝিতেন না। চাচাজীসহ আমার অন্য উস্তাদরা কোরআন তিলাওয়াতে এবং নামাজের কেরাতে মিঠা গলায় খোশ এলহানে সুরা পাঠ করিতেন। শুনিতে অতি মধুর লাগিত। বিশেষত, চাচাজী যখন নামাজে লম্বা কেরাত পাঠ করিতেন তখন ভদ্রার মধুর গুঞ্জন কাপিয়া-কাপিয়া আমার কানে বাজিতে থাকিত। এমন যে চাচাজী তিনিও জাহান্নামকে কখনও ‘যাহান্নাম’ ইযা জাআকে’ নির্বিচারে কখনও ইজা যাআ’। কখনও ইজা জাআ কখনও বা ইযা-যাআ পড়িতেন জিম’ ও ‘যে’র পার্থক্য যেন তারা বুঝিতেনই না। অন্তত উচ্চারণে তা মানিয়া চলিতেন না। শুধু সে কালে নয়, আজকালও আমি এমন অনেক পণ্ডিত লোক দেখিয়াছি, যারা জে’ ‘যেড’ ‘জিম’ ‘যের পার্থক্য বুঝেন না এবং বেদেরেগ একটার জায়গায় আরেকটা উচ্চারণ করিয়া থাকেন। বহু অধ্যাপককে ‘যিরো’র স্থলে ‘জিরো’, ‘যেনিথের’ জায়গায় ‘জেনিথ’, ‘এলিযাবেথের জায়গায় ‘এলিজাবেথ’, ‘জজ’-এর জায়গায় যর্জ’ এবং বহু উকিলকে জজকোর্টকে য কোর্ট উচ্চারণ করিতে শুনিয়াছি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়িতেছে। একবার নুরুযযামান নামক আরবিতে এমএ পাশ একটি যুবক চাকরিপ্রার্থী অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সহিত দেখা করিতে গিয়া নিজের নাম বলিয়াছিলেন, নুরুজ্জামান। সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রথমে ক্রুদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত বিস্মিত হইয়াছিলেন। কারণ দেখা গেল, নিজের নাম। আরবিতে এমলা করিবার সময় যে’কে ঠিক ‘যে’ই উচ্চারণ করেন, কিন্তু নামের উচ্চারণের সময় দুই ‘যে’কে সংযুক্ত করিয়া ‘জে’ করিয়া ফেলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও আমি অনেক চেষ্টা করিয়াও তাকে ঠিক করিতে পারি। নাই। আমাদের প্রিয় সহকর্মী তরুণ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ পর্যন্ত নিজের নাম মুযিবুর রহমান বলেন। অপর বন্ধু রাজশাহীর উলিক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান নিজের নাম অসংকোচে যেড’ দিয়া লিখিয়া উচ্চারণ করিয়া থাকেন। বহুকাল সংশোধনের চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হইয়া অবশেষে এই দুইজনকেই শহীদ সাহেব প্রকাশ্যভাবে খুব জোরে জোরে মুযিবুর রহমান ডাকিতেন। শৈশবে এই স্বরধ্বনিবোধ জাগ্রত না হইলে বয়সকালে যে এটা আর হইয়া উঠে না, তার প্রমাণ এই সেদিনও পাইয়াছি। আমার পরম স্নেহের পাত্রী এমএ পাশ একটি মেয়েকে এক ঘণ্টার বেশি সময় যেড’ ও ‘জে’র পার্থক্য বুঝাইতে ফনেটিকসের অনেক গূঢ় তত্ত্ব বুঝাইলাম। অবশেষে মহিলা সগৌরবে বলিলেন : ‘এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝিতে পারিলাম। ‘জেড’টার উচ্চারণটা সত্যই ঐরূপ। বাংলা বর্ণমালায় এই পার্থক্য নাই বলিয়াই বোধ হয় শিক্ষিত বাঙ্গালীদের জিভের এই অবস্থা।
যা হোক আমার ছেলেবেলায় দেশের অবস্থা এই রূপই ছিল। আমি নিজেও তেমনি শিক্ষা পাইতেছিলাম। এমন সময় স্বপ্নে-দেখা এই সুফি দরবেশ সাহেব আমাকে মুখরেজ-তালাফুয সম্পর্কে খাবেই সবক দিতে লাগিলেন। এক দিন নয়, দুই দিন নয়, পরপর কয়েক দিনই তিনি আমাকে মুখরেজ সম্বন্ধে সবক দিলেন। তিন দিনের খাবের কথা আমার আজিও স্পষ্ট মনে আছে। একদিন তিনি এক বড় জমাতে ইমামতি করিবার সময় সহি মুখরেজ আদায় করিয়া কেরাত পাঠ করিলেন এবং নামাজ শেষে আমাকে একা একদিকে লইয়া গিয়া তিনি কেরাতে কোন হরফ কীভাবে কোন উচ্চারণ করিয়াছেন আমাকে তা বুঝাইলেন। প্রত্যেক হরফের উচ্চারণ তিনি এমন স্পষ্ট ও সহজভাবে করিলেন যে, ঘুম ভাঙার পরেও ঐসব উচ্চারণ সুফি সাহেবের গলার সুরেই আমার কানে সারা দিন ঝংকৃত হইতে থাকিল। এই সুফি সাহেব নিজের পরিচয় দিতেন না। সে কথা তাঁকে পুছ করিতেও আমার মনে থাকিত না। তবু তার চেহারা সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা হইয়া গিয়াছিল। বরাবর যে একই লোক আসিতেন, সে কথা জোর করিয়াই বলা যায়। কারণ দিনের বেলা অনেক খুঁজিয়া-চিন্তিয়াও অমন সুন্দর চেহারার কোনও আলেম আমার মনে পড়িত না। উনার গলার আওয়াজও কারো সাথে মিলিত না। উনি আর যে-ই হোন, আমাদের আত্মীয় কারী ময়েযুদ্দিন সাহেব যে নন, তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না। কারণ কারি সাহেব আমাদের বংশের আর সব মুরুব্বিদের মতই ঘোর কালো রঙের লোক ছিলেন। কাজেই এই সুফি সাহেবকে আবার স্বপ্নে দেখিবার জন্য সারা দিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতাম। দেখিতামও তাঁকে। একদিন খাবে দেখিলাম, তিনি আমাদের বাড়ির মসজিদেই খুব বুলন্দ আওয়াজে কোরআন তিলাওয়াত করিতেছেন। তিনি মসজিদের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়া বসিয়া তিলাওয়াত করিতেছিলেন। আমি মসজিদের বাহিরের আঙিনায় খেলিতেছিলাম। হঠাৎ তার চিনা মিঠা গলা আমার কানে গেল। আমি কান পাতিয়া তাঁর গলা শুনিলাম। আমি তাঁকে দেখিতেছিলাম বটে, কিন্তু তিনি আমাকে দেখিতে পান নাই। তবু আমার মনে হইল, তিনি আমাকে শুনাইয়া প্রতি হরফের সহি মুখরেজ আদায় করিতেছেন। তিলাওয়াত শেষ করিয়া তিনি কোরআন শরিফ জুযদানে বাঁধিয়া রেহালের উপর রাখিয়া মাথা তুলিলেন এবং আমাকে দেখিতে পাইলেন। নিঃশব্দে হাত উঁচা করিয়া আমি তাকে সালাম করিলাম। তিনি হাত ইশারায় আমাকে ডাকিলেন। আমার অযু ছিল। খুব তাজিমের। সাথে তাঁর কাছে গিয়া বসিলাম। তিনি তখন আমাকে আলেফ-বে-তে-সে পড়াইতে শুরু করিলেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরিয়া আমাকে জিম’ ‘যাল’ ‘যোআদ’ ‘যোয়’-এর উচ্চারণ শিখাইলেন। পাঠশালায় নামতা পড়িবার মত আমি সুফি সাহেবের প্রতি হরফ উচ্চারণে তার পুনরাবৃত্তি করিতে লাগিলাম। তৃতীয় দিনের স্বপ্নে আমি বাড়ির পশ্চিম দিকে নাগুয়া নদীর পাড় দিয়া বেড়াইতে ছিলাম। হঠাৎ ঐ সুফি সাহেব আমার সামনে পড়েন। আমি সালাম করি। তিনি কতদূর শিখিয়াছ?’ বলিলেন। আমি সবগুলি হরফ উচ্চারণ করিলাম। তিনি বলিলেন : শাবাশ, আর কয়েক দিন চেষ্টা করিলেই ঠিক হইয়া যাইবে।
