(সাত) আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব আমাদের স্কুলে আর একটি সংস্কার। প্রবর্তন করেন। সেটা হইল শুক্রবার মর্নিং স্কুল। স্কুলের আশপাশে প্রায় আধা মাইলের মধ্যে কোনো মসজিদ বা জুম্মাঘর ছিল না। কাজেই ছাত্রদের জুম্মার নামাজ পড়িবার সুবিধার জন্য তিনি শুক্রবারে সকাল ছয়টায় স্কুল বসাইবার ব্যবস্থা করিলেন। এর আগে পর্যন্ত আমরা দুই ভাই জগদীশ বাবুকে বলিয়াই শুক্রবারে অনুপস্থিত থাকিতাম। আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব এই নয়া ব্যবস্থা করায় আমাদের জুম্মার নামাজের জন্য আর পাঠশালা কামাই করার দরকার থাকল না। শুক্রবার আমাদের বাড়ির মাদ্রাসা বন্ধ থাকিত। কাজেই সকালে স্কুল হওয়ায় সেদিকেও কোনো অসুবিধা হইল না। ছয়টা হইতে এগারটা পর্যন্ত রীতিমত ক্লাস হইত। ছুটির পর আমরা সাড়ে এগারটায় বাড়ি পৌঁছিতাম এবং গোসল করিয়া জুম্মার নামাজে যোগ দিতে পারিতাম।
.
৮. মাস্টার সাহেবের ছাত্রপ্রীতি
এ অঞ্চলে কোনো বড় মেহমানি হইলে এবং সে মেহমানিতে মাস্টার সাহেবকে দাওয়াত করিলে তিনি শর্ত করিতেন, তাঁর সব ছাত্রকে দাওয়াত করিলে তিনি যাইবেন। প্রায় সবাই ছাত্র-সুদ্ধাই মাস্টার সাহেবকে দাওয়াত দিতেন। দাওয়াতের দিন যথাসাধ্য পরিষ্কার জামা-কাপড় পরিয়া টুপি মাথায় দিয়া আসিতে সব ছাত্রকে তিনি বিশেষ তাগিদ দিতেন। সম্ভব হইলে ছাত্রদের অভিভাবকদেরেও বলিয়া দিতেন। নিকট প্রতিবেশী ছাত্রদের বাড়িতে গিয়া কাপড়-চোপড় ধুইল কি না খোঁজখবর করিতেন। নির্দিষ্ট দিনে বারটা-একটার সময় স্কুল ছুটি দিয়া সদলবলে মেহমানিতে যাইতেন। একত্রে এক কাতারে তাঁর সব ছাত্রকে বসাইবার জন্য তদবির করিতেন। এমনটি প্রয়োজন হইলে দাওয়াতের মালিকের সাথে দরবার করিতেন। সকল ছাত্রকে ঠিকমত বসাইয়া তিনি স্বয়ং তাদের সাথে বসিতেন। সাকিদারির সময় কোন ছাত্রের পাতে ভাত নাই, কার ভাগে গোশত কম পড়িল, এসব ব্যাপার লইয়া সাকিদারদের সাথে। দর-কষাকষি করিতেন। ফলে মাস্টার সাহেবের সাথে মেহমানিতে গেলে বেশি গোশত ও আদর-যত্ন পাওয়া যায়, ছাত্রদের মধ্যে এ কথা মশহুর হইয়া গিয়াছিল। খাওয়া-দাওয়ার পর মাস্টার সাহেব হুইসেল দিয়া সব ছাত্রকে আবার একত্রে জমা করিতেন। ফলইন’, ‘এটেনশন’, রাইট টার্ন’, ‘সেলিউট ওয়ান-টু-থ্রি’ মার্চ’ বলিয়া তিনি যিয়াফতের মজলিস হইতে ছাত্রদেরে লইয়া বাহির হইতেন। দর্শকেরা প্রশংসমান এক দৃষ্টিতে সেদিকে চাইয়া থাকিতেন এবং ছাত্রসহ মাস্টার সাহেব দূরে চলিয়া গেলে সকলে মাস্টার সাহেবের শিক্ষকতার তারিফ করিতেন। হাঁ, মাস্টার বটে। ছাত্রদেরে কী সুন্দর শায়ের করিয়াছেন।
ধানীখোলা পাঠশালায় আমার ছাত্রজীবনের শেষ বছর, অর্থাৎ ১৯০৮ সালের খুব সম্ভব ডিসেম্বর মাসে বৈলর বাজারে মুসলমানদের এক বিরাট সভা হয়। এত বড় সভা আমি জীবনের প্রথম এই দেখি। উভয় গ্রামের মাতব্বররা মিলিয়াই এই সভার আয়োজন করিয়াছিলেন। জিলা সদর হইতে এবং বিদেশ হইতে বড়-বড় বক্তা এই সভায় যোগ দিয়াছিলেন। তাদের মধ্যে সিরাজগঞ্জের মুনশী মেহেরুল্লাহ, মৌ. মোহাম্মদ ইসমাইল (পরে খান বাহাদুর) ও মৌ. আবদুর হাকিম নামে একজন স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর আমার মনে স্থায়ী দাগ কাটিয়াছিলেন। এই বিরাট সভায় অনেক ভলান্টিয়ারের দরকার হইয়াছিল। উদ্যোক্তারা আশপাশের সমস্ত স্কুল-মাদ্রাসার কাছে ভলান্টিয়ার চাহিয়াছিলেন। কর্মবীর আলিমুদ্দিন মাস্টার এ ব্যাপারে সমস্ত স্কুল-মাদ্রাসাকে হারাইয়া দিয়াছিলেন। এক মাস ধরিয়া তিনি আমাদেরে ভলান্টিয়ারি কুচকাওয়াজ ও ফুট-ফরমাস সম্পর্কে এমন সুন্দর ট্রেনিং দিয়াছিলেন যে সম্মিলনীতে সমাগত মেহমানরা মাস্টার সাহেবকে ডাকিয়া নিয়া তারিফ করিয়াছিলেন। আমরা ছাত্ররাও এ সভা হইতে জীবনের খুব মূল্যবান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলাম।
আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেবের কাছে মোটমাট দুই বছর পড়িয়াছিলাম। এই দুই বছরে আমার অনেক শিক্ষালাভ ঘটিয়াছিল। এই সময়ে আমি আট-নয় বছরের শিশু হইয়াও বুড়া প্রবীণের চেয়েও বেশি নফল এবাদত করিতাম। সে কথা আমি অন্যত্র বর্ণনা করিব। এখানে ঐ ব্যাপার উল্লেখ করা দরকার এই জন্য যে, হযরত পয়গম্বর সাহেবকে খাবে দেখা ঐ সময় আমার এবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু পয়গম্বর সাহেবকে খাবে কখনও দেখি নাই। তার বদলে সাদা জুব্বা-জাব্বা পাগড়ি-পরা খড়ম-পায়ে তসবি-হাতে একজন সুফি দরবেশকে খাবে দেখিতে পাইতাম। এই সুফি দরবেশের মুখের অবয়ব তখনও মনে পড়িত না। এখন ত পড়িবেই না কিন্তু এই দরবেশকে খাবে দেখিয়া আমার একটা অসাধারণ লাভ হইয়াছিল। তা এই :
.
৯. স্বপ্নে মুখরেজ-তালাফ্ফুয
চাচাজী ছমিরুদ্দিন মুনশী, ইয়াকুব, মৌলবী প্রভৃতি আমার শৈশবের উস্তাদরা কেই কারি ছিলেন না। তাঁদের মুখরেজ-তালাফুয সব আরবি হরফের বেলা নির্ভুল নিখুঁত ছিল না। মুখরেজ মানে হরফ উচ্চারণে অরগান-অব-স্পিচ ঠিক রাখা। হরফগুলির মধ্যে কতকগুলি মূর্ধা বা আলাজিভ হইতে, কতকগুলি তালু হইতে, কতকগুলি দাঁত হইতে, আর কতকগুলি ঠোঁট হইতে জিভের সংস্পর্শে বাহির হয়। অন্যান্য ভাষার চেয়ে আরবিতেই এই দিককার অর্থাৎ মুখরেজ উচ্চারণ খুব কড়াকড়িভাবে পালিত হয়। ইংরাজি একটা ‘এ’ ও বাংলা একটা স’ (ছ)-এর জায়গায় আরবিতে ‘সে’ ‘সিন’ ‘সোআদ’ এই তিনটা হরফ আছে। অথচ এই তিনটার মধ্যে দুইটা হরফই দন্ত্য হইলেও দুইটা উচ্চারণে দাঁত-জিভের দুইটা পৃথক জায়গা স্পর্শ করে এবং অপরটা ঠোঁট হইতে উচ্চারিত হয়। ঠিক তেমনি ইংরাজি একমাত্র ‘যেড’ হরফের স্থলে আরবিতে যাল, যে, যোআদ ও যোয়–এই চারিটি হরফ আছে। অথচ ঐ চারিটি হরফের নিজেদের মধ্যে প্রচুর উচ্চারণ-ভেদ রহিয়াছে। এই চারিটি হরফের প্রথম দুইটি হরফের মধ্যে যাল’-এর উচ্চারণের সময় দাঁত জিভের আগা স্পর্শ করে এবং যে উচ্চারণের সময় দাঁত জিভের মধ্যভাগ স্পর্শ করে। অর্থাৎ যে’র উচ্চারণ বাংলা য’র, উচ্চারণ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। তেমনি বাংলা ‘হ’ বা ইংরাজি ‘এইচ’-এর উচ্চারণের সঙ্গে আরবি ‘হায়হুত্তি’র কোনও মিল নাই। বাংলা-ইংরাজি হ’ উচ্চারণের সঙ্গে আরবি ‘হায় হাওওয়াজ’-এর মিল রহিয়াছে।
