মোটকথা, নদীর দুই পারের দুইটা বাজারই সরগরম অথচ নদী। পারাপারের ব্যবস্থা নাই। জিলা বোর্ডের বা লোক্যাল বোর্ডের তরফ হইতে কোনো পোল বা গোদারা নাই। জমিদারদের তরফ হইতেও না। শুধু হাটবারে জমিদারপক্ষ হইতে হাটুরিয়াদের পারাপারের জন্য সাময়িক ব্যবস্থা হইত। বৈলর বাজারের হাট বসিত শনি ও বুধবারে। ধানীখোলার হাট বসিত শুক্রবার ও মঙ্গলবারে। কাজেই সপ্তাহের মধ্যে চার দিনই জমিদারপক্ষ হইতে নৌকার ব্যবস্থা থাকিত। কিন্তু তাতেও পাবলিকের দুর্দশা দূর হইত না। কারণ অ-হাটের তিন দিন রবি, সোম ও বিষুদবার নদী পারাপারের কোনোই ব্যবস্থা। ছিল না। হাটবারের চার দিনও শুধু বিকাল ও সন্ধ্যাবেলা জমিদারদের নৌকা পারাপার হইত।
কিন্তু নৌকাগুলি ভাড়াটিয়া নৌকা ছিল না। জমিদারদের কিনা নিজস্ব। নৌকা। তাতে পারাপারে পয়সা-কড়ি লাগিত না। জমিদারদের নিজের নৌকা বলিয়া অ-হাটবারেও নৌকাগুলি ঘাটের আশেপাশেই বাঁধা থাকিত। কিন্তু মাল্লারা জমিদারদের লোক বলিয়া তারা নৌকায় থাকিত না। অন্য কাজে যাইত। তবে নদীর পাশের সমান লম্বা দুইটা মযবুত রশি নৌকার দুই গলুইর গোড়ায় বাঁধিয়া দুই পাড়ে দুইটা খুঁটিতে বাঁধিয়া রাখিত। রশি ধরিয়া টানিয়া লগি ছাড়াই এক পাড়ের নৌকা অপর পাড়ে নেওয়া চলিত। এই অবস্থা চলিবার সময় হাটবার লইয়া দুই বাজারের মালিকদের মধ্যে বিরোধ বাধে। এই বিরোধ ফৌজদারি কোর্টে পর্যন্ত গড়ায়। আগেকার জমিদাররা অতি সহজেই প্রজা-সাধারণকে দিয়া নিজেদের স্বার্থে ও পক্ষে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করাইতে পারিতেন। জমিদারদের সীমা ও চর জমির দখল লইয়া দুই জমিদারের বিরোধ প্রজাদের নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি করিতে আমি ছেলেবেলা একাধিকবার দেখিয়াছি। তদুপরি এই বাজার-বিরোধটার মধ্যে প্রজা, সাধারণের স্বার্থ সোজাসুজি জড়িত ছিল। কাজেই জমিদারদের বিরোধ অতি সহজেই বৈলর-ধানীখোলাবাসীর বিরোধে পরিণত হইল। দুই গ্রামের লাঠিওয়ালারা নদীর পাড়ে দাঁড়াইয়া লাঠি ঘুরাইতে লাগিল। এক গ্রামের পক্ষে অন্য গ্রামের ভিতর দিয়া চলাচল বিপজ্জনক হইয়া উঠিল।
.
৭. আলিমুদ্দিন মাস্টার
এই বিপদ আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেবকেও ছাড়িল না। তিনি ধানীখোলার লোক। কাজেই বৈলর যাওয়া তার পক্ষে বিপজ্জনক হইল। তিনি একাই মাস্টারি করিতে যাইতেন না। তাঁর প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের কয়েকজন ছাত্রও স্বভাবতই তার পাঠশালায় যাইত। এই সময় আমাদের মাস্টারের অভাব হইয়াছিল। সুতরাং, আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব অতি সহজেই ধানীখোলা পাঠশালার মাস্টারি পাইলেন। ছাত্ররা এবং তাহাদের অভিভাবকেরা আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেবকে পাইয়া খুশি। কারণ, তিনি দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসাবে খুব নাম করিয়াছিলেন। তিনি আমাদের স্কুলের মাস্টারি নিবার পর আমাদের স্কুলের ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়া গেল। বাজার লইয়া গন্ডগোল মিটিবার পরে বৈলর গ্রাম হইতেও অনেক অনেক ছাত্র আমাদের স্কুলে চলিয়া আসিল।
আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব আমাদের পাঠশালার শিক্ষক হইবার পর তিনি এই স্কুলে কতকগুলি সংস্কার প্রবর্তন করিলেন। (এক) পাঠশালার বার্ষিক পুরস্কার-বিতরণী সভার আয়োজন হইল। গ্রামের ছুটির প্রাক্কালে সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে এই বার্ষিক সভা হইত। তাতে পর্দাঘেরা মঞ্চ করা হইত। মাস্টার সাহেব নিজে মঞ্চের ডিরেক্টর হইতেন। নিজ মুখে হুইসেল মারিয়া, নিজ হাতে রশি টানিয়া তিনি মঞ্চের পর্দা খুলিতেন ও বন্ধ করিতেন। ছাত্ররা এক মাস ধরিয়া শিখানো আবৃত্তি ঠিকমত করিতেছে কি না পর্দার পিছন হইতে তিনি দেখিতেন এবং প্রক্ট করিতেন। সভার শুরুতে তিনিই সমাগত অতিথিদিগকে স্বাগত জানাইতেন। সভা শেষে তিনিই সকলকে ধন্যবাদ দিতেন। মোটকথা, আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব ছিলেন উৎসাহ-উদ্যমের প্রতিমূর্তি। (দুই) তিনি স্কুল গৃহ বদলাইলেন। আগে স্কুলঘর ছিল কাছারির পূর্ব প্রান্তে একেবারে বাজারসংলগ্ন। বাজারের এত নিকটে স্কুল থাকা ভাল নয় বলিয়া তিনি স্কুল সরাইয়া নিয়া গেলেন কাছারির অনেক পশ্চিমে পুকুরেরও পশ্চিম পাড়ে। আগের ঘরটি ছিল টিনের চৌচালা। নূতন ঘরটি হইল ছনের দুচালা। এতে বরঞ্চ ভাল হইল। গরমের দিনে টিনের ঘরে খুব অসুবিধা হইত। এখন ছনের ঘরে আরাম হইল। আরেক কারণে মাস্টার সাহেব বাজারের অত নিকট হইতে স্কুল সরাইয়া নিয়াছিলেন। সেটি তখন বুঝি নাই। বড় হইয়া। বুঝিয়াছিলাম। সে কারণ এই যে অন্যান্য বাজারের মত ধানীখোলা বাজারেও বেশ্যাপল্লি ছিল। তৎকালে বেশ্যাপাড়া ছাড়া বাজার করা যাইত না। (৩) আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব স্কুলগৃহের মধ্যভাগকে তিন ক্লাসে বিভক্ত করিয়াছিলেন। কোনো পার্টিশন বা বেড়া-টাট্টি দিয়া নয়, শুধু বেঞ্চি পাতিয়া। একদিকে দ্বিতীয় শ্রেণী, মধ্যভাগে প্রথম শ্রেণী, আরেক পাশে ‘ক’-মিতি, ‘খ’ মিতি ইত্যাদি নিম্ন শ্ৰেণী। মাস্টার সাহেব একাই শিক্ষক ছিলেন এবং মাঝখানের ক্লাসে বসিয়া তিন ক্লাসই এক জায়গা হইতে পড়াইতেন। তবু দেখিতে স্কুলটির অভ্যন্তর ভাগ তিনটি আলাদা ক্লাস দেখাইত। (চার) মাস্টার সাহেব তত্ত্বালে ইংরাজি জানিতেন না বলিয়া জগদীশ বাবুর প্রচলিত নিয়ম বজায় রাখিবার জন্য কার্ত্তিক বাবু নামে কাছারির জনৈক আমলাকে সপ্তাহে দুই ঘণ্টা করিয়া ইংরাজি ক্লাস লইতে রাজি করেন। কার্তিক বাবু এ জন্য কোনো পয়সা-কড়ি নিতেন না। (পাঁচ) তিনি সব সময় টুপি পরিয়া স্কুলে আসিতেন। কখনও খালি মাথায় আসিতেন না। ছাত্রদেরেও টুপি পরিয়া আসিতে বলিতেন। তবে কেউ টুপি পরায় গাফলতি করিলে শাস্তি দিতেন না। তিনি নিজে ধুতি ও তহবন্দ উভয় পোশাকেই স্কুলে আসিতেন। তবে সাব ইন্সপেক্টর স্কুল পরিদর্শনে আসিবার দিন তিনি ধুতি পরিয়াই আসিতেন। তিনি নিজে তহবন্দ পরিলেও ছাত্রদের তিনি তহবন্দ পরিতে তাকিদ দিতেন না। স্কুলঘরের সামনে খানিকটা জায়গা বেড়া দিয়া তিনি নামাজের জায়গা করেন। এই বেড়ার চারদিকে পাতাবাহারের গাছ লাগাইয়া জায়গাটি সুন্দর রাখিতেন। নামাজের জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিবার জন্যে তিনি নিজে আমাদিগকে লইয়া ঝাড় দিতেন এবং ঘাস লম্বা হইয়া গেলে কাটিয়া ফেলিতেন। প্রতিদিন যোহরের ওয়াক্তে ছাত্রদের লইয়া তিনি নামাজ পড়িতেন। যারা অযু নামাজ জানিত না বা সুরা তকবির পড়িতে পারিত না, তাদেরেও তিনি তার সাথে সাথে উঠবসা করিতে হুকুম দিতেন। একটু একটু করিয়া সকলকেই তিনি নামাজ শিখাইতে চেষ্টা করিতেন। নামাজের জায়গায় বিছাইবার জন্য তিনি ছাত্রদের নিকট হইতে চাঁদা তুলিয়া চট কিনিয়াছিলেন। এই চট স্কুলের বাক্সে সযত্নে রাখিয়া দিতেন এবং তার চাবি নিজের কাছে রাখিতেন। এইসব চাদা ও ছাত্র-বেতন সম্পর্কে মাস্টার সাহেব সুবিচারি লোক ছিলেন। গরীব ছাত্রদের বেতন ছিল অবস্থাভেদে এক আনা, দুই আনা, চারি আনা। অনেকে ছিল ফ্রি। কিন্তু আমরা দুই ভাই, শামসুদ্দিনরা দুই ভাই ও ওসমান আলী সরকার সাহেবের এক ভাই সাদত আলী এই ধরনের অবস্থাশালী ছাত্রদের বেতন ছিল আট আনা করিয়া। এছাড়া তিনি অভিভাবকদের নিকট হইতে পাটের মওসুমে পাট ও ধানের মওসুমে ধান তুলিয়া স্কুলগৃহের সাজসরঞ্জাম, যথা টেবিল, চেয়ার, বেঞ্চি, ব্ল্যাকবোর্ড, ভূচিত্রাবলি, গ্লোব, ঘড়ি ও ঘণ্টা কিনিয়াছিলেন এবং এইসব রাখার জন্য প্রথমে বাক্স এবং শেষে আলমারি তৈয়ার করিয়াছিলেন। (ছয়) হাতে-কলমে। বিজ্ঞান পড়াইবার উদ্দেশ্যে তিনি আমাদের হাতে স্কুল ঘরের পাশে ও পিছনে নানাবিধ ফল-ফুলের গাছ লাগাইতেন। আমরা সকলেই ছিলাম কৃষকশ্রেণির লোক। কাজেই হাতে-কলমে কৃষি-কার্য শিখাইবার উদ্দেশ্যে তিনি একবার পানি-কাদার মধ্যে রোয়া ধান লাগাইতে আমাদের কামলা লইয়াছিলেন, অর্থাৎ স্কুলের সকল ছাত্রকে তিনি একদিন নিজের বাড়িতে দাওয়াত করিলেন। আমরা প্রায় সকলেই মাস্টার সাহেবের বাড়ি গেলাম। তিনি আমাদিগকে চিড়া ভাজা নাশতা খাওয়াইয়া ক্ষেতে নিয়া গেলেন। আমাদের সকলের হাতে এক এক মুঠা জালা (চারাধান গাছ) দিয়া এবং নিজে এক মুঠা লইয়া কাতার বাঁধিয়া রোয়া লাগাইতে শুরু করিলেন। আমাদের সহপাঠীরা প্রায় সকলেই নিজের হাতে কম-বেশি এ কাজ আগেই করিয়াছিল। আমরা দুই ভাই এবং শামসুদ্দিনরা দুই ভাই এবং সাদত আলী আমরা কেউ কোনো দিন নিজ হাতে রোয়া লাগাই নাই। কিন্তু সে কথা স্বীকার করিয়া বোকা বনিতে কেউ রাজি হইলাম না। আমরা মাস্টার সাহেবের এবং অন্য ছাত্রদের দেখাদেখি রোয়া লাগাইয়া পুরা ক্ষেত শেষ করিয়া ফেলিলাম। মাস্টার সাহেব আমাদের দক্ষতায় খুব খুশি হইলেন। বেলা পশ্চিম দিকে হেলিয়া পড়িলে সবাই মাস্টার সাহেবের বাড়ি ফিরিলাম। বাড়ির পাশের নদীতে গোসল করিয়া শরীরে মাস্টার সাহেবের দেওয়া প্রচুর সরিষার তেল মাখিয়া খাইতে বসিলাম। মাস্টার সাহেব আমাদের খাওয়ার জন্য মাছ-গোশত ও দুধ-কলা চিনিতে প্রচুর আয়োজন করিয়াছিলেন। আমরা তকালেই হিসাব করিয়া দেখিয়াছি, রোজানা বেতন দিয়া তিনি যদি কৃষিশ্রমিক নিযুক্ত করিতেন, তবে তাদের বেতন ও খোরাকিতে তার অত টাকা লাগিত না। দুই-তিন দিন পরে মাস্টার সাহেব আমাদেরে জানাইয়াছিলেন যে আমাদের রোয়া লাগানো ক্ষেতের বেশির ভাগ চারা মরিয়া গিয়াছে। তিনি চারাগুলি উখাড়িয়া দেখিয়াছেন যে আমরা অনেকেই জালার গোড়া ভাঙ্গিয়া মাটিতে পুঁতিয়া রাখিয়াছি। অতঃপর আর কোনো দিন মাস্টার সাহেব আমাদের নিয়া কোনো চাষের কাজ করান নাই।
