এমন মোলায়েম মিহিন বিলাতী ধুতি ফেলিয়া যেদিন মাস্টার মশায়ের হুকুমে এবং একরকম যবরদস্তিতে ঘবসা স্বদেশি ধুতি পরিতে বাধ্য হইলাম, সেটা ছিল আমাদের একটা দুঃখের দিন। কিন্তু দুইটা কারণে আমরা বিনা প্রতিবাদে এই দুঃখ বরণ করিলাম। প্রথমত, মাস্টার মশায় অত বড় ফিটবাবু হইয়াও নিজেও ঐ মোটা ঘবসা স্বদেশি ধুতি পরিতেন। দ্বিতীয়ত, তৎকালে উস্তাদকে আমরা বাপ-মার মতই মুরুব্বির গুরুজন মনে করিতাম। তাদের কাজ না পছন্দ করা বা তাদের কথায় ‘না’ বলা আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।
.
৫. পাঠ্য বিষয়
আগেই বলিয়াছি, পাঠশালায় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাদ্রাসার শিক্ষাও চলিতে লাগিল। সকালে উঠিয়া ফযরের নামাজ পড়িয়াই মাদ্রাসায় পড়িতে বসিতাম। ফাঁক পাইলে এই সময়ের মধ্যে তাড়াতাড়ি নাকে-মুখে চিড়া মুড়ি বা খই পিঠা পুঁজিয়া নাশতা করিয়া লইতাম। না হইলে বিনা নাশতাতেই মাদ্রাসায় বসিতাম। এক প্রহর বেলা হইতেই মাদ্রাসা ছুটি হইয়া যাইত। গোসল খাওয়া সারিয়া পাঠশালায় যাইতাম। বাড়িতে ঘড়ি ছিল না। কিন্তু বাড়ির মুরুব্বিদের সকলের, এমনকি মেয়েদেরও, এমন নিখুঁত সময়ের আন্দাজ ছিল যে ঠিক দশটার সময় পাঠশালায় হাজির হইতাম। অবশ্য পাঠশালাতেও ঘড়ি ছিল না। কিন্তু কাছারিতে বড় দেওয়াল ঘড়ি। ছিল। সেটা দেখিয়া দারওয়ান ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেল পিটাইয়া সারা গায়ে সময় ঘোষণা করিত। সাড়ে দশটা হইতে চারটা পর্যন্ত পাঠশালা বসিত। মাঝখানে আধঘণ্টা লেইজার বাদে মোট পাঁচ ঘণ্টা পড়া হইত। ১৯০৬ সালে যখন আমি প্রথম পাঠশালায় ভর্তি হই, তখন আমার বয়স আট বছর। বাড়ির মাদ্রাসায় আমি তখন মতন কোরআন শেষ করিয়া ফেকায়ে মোহাম্মদী, রাহেনাজাত, শেখ সাদীর পান্দেনামা ও গুলিস্তাঁ পড়িতেছি। যদিও আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় কোনো জমাত ছিল না, তথাপি চাচাজী ও মৌলবী সাহেবরা বলিতেন আমি জমাতে দহমের দরস পড়িতেছি। এই সময় পাঠশালায় ‘গ’ মিতি, ‘খ’-মিতি ও ‘ক’-মিতি এই তিনটা শিশু শ্রেণী ও তারপর ১ম ও ২য় শ্রেণী এই পাঁচ বছরের কোর্স ছিল। আমরা দুই ভাইকে প্রথমে ‘গ’-মিতিতে ভর্তি করা হইলেও বাড়িতে আমাদের বর্ণ পরিচয় হইয়াছিল বলিয়া তিন মাস পরে ‘খ’-মিতি এবং ছয় মাস পরে ‘ক’ মিতিতে আমাদের প্রমোশন দেওয়া হইল। ‘ক’-মিতিতে আমরা এক বছর পড়িলাম এবং এখানেই বাংলা সাহিত্য, অঙ্ক, শুভঙ্করী ও ‘ওয়ার্ডবুক’ পড়িলাম। সাহিত্য মানে বোধোদয় ও অঙ্কের নামতা, সরল যোগ-বিয়োগ এবং শুভঙ্করী আর্যা এই সব পড়িতাম। মাদ্রাসায় তিন ঘণ্টা সময়ে একটি হিন্দি মানে, উর্দু বই, দুইটা-দুইটা ফারসি বই পড়িতাম ও দুপুরে পাঠশালায় পাঁচ ঘণ্টা পড়া হইত। বাড়িতে পড়িবার সময় ছিল মগরেবের ও এশার নামাজের মধ্যেকার দুই ঘণ্টা সময়। এশার নামাজের পরই খাইয়া-দাইয়া ঘুমাইয়া পড়িতাম। পরের বছর যখন আমি পাঠশালায় ১ম শ্রেণীতে উঠিলাম, তখন মাদ্রাসায় জমাতে নহমে উঠিলাম। জমাতে নহমে সাদীর বুস্তা, ফরিদুদ্দিন আত্তারের পান্দেনামা ও ফেকায়ে মোহাম্মদীর বৃহত্তর অংশ ছাড়াও নহু সরফ ও মুসদার ফাইউস নামে দুইখানা আরবি ব্যাকরণের বই (উর্দুতে লেখা) পড়িতে হইত। পাঠশালায় প্রথম শ্রেণীতে কঠিনতম সাহিত্য, জটিলতর অঙ্ক ও শুভঙ্করী ছাড়া এই সময় বিজ্ঞান প্রবেশ নামক একখানা বিজ্ঞানের বই এবং শরীর পালন নামক একখানা স্বাস্থ্য বইও আমাদের পাঠ্য হয়। এর উপর ড্রিল-ড্রইং ত ছিলই। তৎকালে আমার মত আট-নয় বছরের শিশুর পক্ষে এতগুলি ভাষা ও বিষয় শিক্ষা খুব ভারী বোধ। হয় নাই।
আমি ‘ক’-মিতি হইতে প্রথম শ্রেণীতে উঠিবার অল্প দিন পরেই মাস্টার। মশায় জগদীশ বাবু ছুটি নেন। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা দীনেশ চন্দ্র সরকার বড় ভাইর স্থলে একটিনি (এ্যাটিং) করিতে আসেন। জগদীশ বাবু তৎকালে আমাদের অঞ্চলে শ্রেষ্ঠ গায়ক ছিলেন। তাঁর গলা অপূর্ব রকম মিঠা ছিল। কলের গানে গান গাইবার জন্য (গ্রামোফোনে রেকর্ড করাইবার জন্য) তিনি কলিকাতা না কোথায় চলিয়া যান, আর মাস্টারিতে যোগ দেন নাই। দীনেশ বাবুও এন্ট্রেন্স ফেল করিয়া হোমিওপ্যাথিক পড়িতে যান। আমাদের গ্রামের যশস্বী শিক্ষক এতদঞ্চলে প্রায় সকল লোকের উস্তাদ আলিমুদ্দিন মাস্টার সাহেব এই সময় আমাদের শিক্ষক হইয়া আসেন। ইতিপূর্বে পাশের গ্রাম। বৈলরের পাঠশালায় তিনি বহুকাল ধরিয়া শিক্ষকতা করিয়া আসিতেছিলেন। নিচে লেখা ঘটনাসমূহের কারণে বাধ্য হইয়াই তিনি বৈলর পাঠশালা ছাড়িয়া ধানীখোলার শিক্ষক হইয়া আসেন।
.
৬. ধানীখোলা-বৈলর বিরোধ
বৈলর ও ধানীখোলা পাশাপাশি দুইটি বড় গ্রাম। মাঝখানে সুতোয়া নদী। নদীর একপারে বৈলরের জমিদারবাড়ি ও তৎসংলগ্ন বৈলরের বাজার। নদীর অপর পারে মুক্তগাছার জমিদারদের তিন হিস্যার কাছারি এবং তৎসংলগ্ন বাজার। দুই বাজারই যথেষ্ট সমৃদ্ধিশালী। তৎকালে সুতোয়া নদীর অবস্থা বর্তমানের মত শোচনীয় ছিল না। বার মাস নৌকা চলাচল করিত। বিশেষত, বর্ষাকালে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বর্মী, ভৈরব ও চানপুর হইতে মালপত্র লইয়া বড় বড় নৌকা এই নদী দিয়া চলাচল করিত। আমরা ছেলেবেলা বৈলর ও ধানীখোলা বাজারের ঘাটে বড় বড় নৌকা বাঁধা দেখিয়াছি। বাজারের মহাজনদের দোকানের মাল : লোহা, টিন, ধান, চাউল, হাঁড়ি, পাতিল, কড়াই এই সমস্ত নৌকা হইতে ওঠা-নামা করিতে দেখিয়াছি।
