যা হোক, পাঁচ বছর বয়সে আমি চাচাজীর মক্তবে ভর্তি হইলাম, মানে অযু করিয়া পাকসাফ হইয়া তহবন্দ পরা অবস্থায় তালেবিলিমদের কাতারের এক কোণে বসিয়া পড়িলাম। আমার বড় দুই ভাই আগে হইতেই মক্তবের তালেবিলিম ছিলেন। কিন্তু আমি অল্প দিনেই তাঁদের সমান পড়া পড়িয়া ফেলিলাম। আমি প্রতিদিন একটার বদলে দুইটা নয়া সবক লইতাম। অল্প দিনেই আমি বগদাদি কায়দা শেষ করিয়া ফেলিলাম। তেলকা ও হালকা উভয় রকম ত্যদিকে আমি উত্তীর্ণ হইলাম। তেলকা মানে তীরের ফলার অর্ধেকের আকারে ভাঁজ করা চার পরত কাগজের একটি টুকরা। এর এক দিক মোটা, অপর দিক সুইয়ের মত ধারালো। ডান হাতের বুড়া ও শাহাদত আঙুলের ফাঁকে তেলকার মোটা অংশটা ধরিয়া চোখা অংশ দিয়া হরফ দেখানোই তেলকার কাজ। আরবি হরফ সংযুক্ত হইলে একটিমাত্র রেখার মধ্যে তিন চারটি হরফ লুকাইয়া থাকিতে পারে। শুধু নোকতা দেখিয়া সেই হরফগুলিকে চিনিতে হয়। আঙুলের মাথা দিয়া সে অক্ষর দেখানো যায় না। কারণ আঙুলের মাথা হরফের চেয়ে অনেক বেশি মোটা। এ কাজ করিতে হয় তেলকার সূচ্যগ্র মাথা দিয়া। এটা করিতে পারিলেই তালেবিলিম তেলকা পাশ করিয়াছে বলিতে হইবে। আর হালকা হইলে একটি কাগজের টুকরা, তার মাঝখানে একটা ছিদ্র। সকলেরই বোধ হয় মনে আছে, শিশুকালে বর্ণমালা পড়িবার সময় তারা আলিফ, বে, তে, ক-খ-গ বা এ-বি-সি গোড়া হইতে পড়িয়াও যাইতে পারিতেন। হরফও চিনিতেন। কিন্তু মাঝখান হইতে কোনো হরফ দেখাইয়া তার নাম পুছ করিলেই ঠেকিয়া যাইতেন। আগের পিছের হরফ না দেখিয়া যেকোনোও হরফ চিনিতে পারিলেই বুঝা গেল এইবার তালেবিলিমের অক্ষরজ্ঞান পাকা হইয়াছে। এই পরীক্ষাই হালকার কাজ। কেতাবের পৃষ্ঠায় হালকা নামক কাগজের টুকরাটি স্থাপন করিলে একটিমাত্র হরফ দেখা যাইত, ডাইনে বাঁয়ের উপর নিচের আর কোনও হরফ দেখা যাইত না। এ অবস্থায় যে এ হরফটি চিনিতে পারিত, কেবল সেই ছাত্রের হরফজ্ঞান পূর্ণ হইয়াছে।
আমি সমবয়সী এবং সহপাঠীদের সকলের আগে তেলকা ও হালকা পাশ করিয়া আম সেপারার সবক লইলাম। কয়েক মাসের মধ্যে আমি কোরআন শরিফে সবক লইলাম। আমপারাও কোরআন শরিফের অংশ বটে, কিন্তু ওটা কোরআন শরিফের সর্বশেষ পারা। উহার সুরাগুলি ছোট ছোট বলিয়া আলাদা করিয়া ছাপা হইয়াছে। এবং নাম দেওয়া হইয়াছে আমপারা। স্পষ্টতই এটা করা হইয়াছে কোরআন শরিফ পড়ার প্রথম পাঠ হিসাবে। কোরআন শরিফের ত্রিশটা পারার মধ্যে একমাত্র শেষ পারাটিরই বিশেষ নাম রাখা হইয়াছে। ‘আমপারা। অর্থ করা যায় সাধারণ পাঠ। ইংরাজিতে বলা যায় জেনারেল লেসন। অপর উনত্রিশটি পারার কোনোটারই বিশেষ নাম নাই। প্রথম পাঠ হিসাবে সুরাটির শুধু বিশেষ নামকরণই করা হয় নাই, তার সুরাগুলির স্থানিক মানও একদম পাল্টাইয়া দেওয়া হইয়াছে। কোরআন শরিফের শেষ পারা শুরু হইয়াছে সুরা নাবা’ দিয়া। শেষ হইয়াছে সুরা নাস দিয়া। কিন্তু আমপারা শুরু হইয়াছে সুরা নাস’ দিয়া। শেষ হইয়াছে সুরা নাবা’ দিয়া। কোরআন শরিফে সুরাসমূহের স্থানিক মান বড় হইতে ছোট। আমপারায় ছোট হইতে বড়। প্রাইমারি ছাত্রদের সুবিধার জন্যই এটা করা হইয়াছে। তারা ছোট ছোট সুরা পড়িয়া ক্রমে ক্রমে বড় বড় সুরা পড়িতে শুরু করিবে। আমপারার এই স্বাতন্ত্রের জন্যই এটি পড়া শুরু করাকেই কোরআন শরিফে সবক লওয়া বলা। হয় না। শুধু ‘আলিফ-লাম-মিম’, অর্থাৎ সুরা বাকারা পড়িতে শুরু করার নামই কোরআন শরিফ পড়া আরম্ভ করা। আমার বয়স সাত বছর পূর্ণ হইবার অনেক আগেই আমি কোরআন শরিফ মতন পড়া শেষ করিলাম। মতন পড়া’ মানে অর্থ না বুঝিয়া কোরআন পড়া। আমি যেদিন কোরআন শরিফে প্রথম সবক লইলাম এবং যেদিন খতম করিলাম, উভয় দিনই আমাদের বাড়িতে ছোটখাটো মেবানি হইয়াছিল। ভাইদের বেলাও তা-ই হইয়াছিল। মেহমান খাওয়ানোকেই মেবানি বলা হইত। তৎকালে অবস্থাপন্ন সকলেই তা করিতেন। আমার বড় দুই ভাইয়ের বেলা সেটা আগে হইয়াছিল। তৎকালে লেখা ও পড়া ছিল দুইটা আলাদা কাজ। বই-পুস্তক হাতে পড়ুয়ারারে পথেঘাটে দেখিলেই বুড়ারা পুছ করিতেন, ‘তুমি লেখো, না পড়ো? এ প্রশ্নের কারণ ছিল। মক্তবে শুধু পড়া হইত। লেখা হইত পাঠশালায়। তার মানে বাংলা পড়াইতে লেখার দরকার হইত। আরবি-ফারসি-উর্দু পড়ায় লেখার দরকার হইত না। মানে, লেখা কাজে লাগিত না অথচ মাদ্রাসায় আরবি ফারসি লেখা ও শিখানো হইত। মতন’ কোরআন শরিফ, মসলা-মাসায়েলের রাহে নাজাত বয়াতের গুলো-বুস্তা পড়িতে লেখার কোনো দরকার হয় না। তৎকালে আমাদের বাড়িতে ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে এমন পড়ুয়া অনেক ছিলেন, যারা লিখিতে জানিতেন না বাড়ির মেয়েলোকেরাও অনেকে কোরআন তেলাওয়াত করিতে পারিতেন। বস্তুত আমাদের বাড়ির মুরুব্বিদের মধ্যে একমাত্র চাচাজীই পড়া ও লেখা দুটোই জানিতেন। শুধু লেখা জানিতেন না, স্থানীয় মাদ্রাসায় আরবি-ফারসি পড়িয়া মুনশী’ হওয়া ছাড়াও চাচাজী তত্ত্বালের উচ্চ-প্রাইমারি পাশ করিয়াছিলেন। তাঁর বাংলা ও আরবি হাতের লেখা ছিল অতি চমৎকার, একদম ছাপার হরফ। চিঠিপত্র, জমা খরচ, বছরিয়া চাকররার হিসাবের খাতা তিনি সাধারণ ভাঙা হাতেই লিখিতেন। সে লেখাও তার খুবই সুন্দর ছিল। সে জন্য লোকেরা তাঁকে দিয়া জোরাজুরি করিয়া তমসুক ইত্যাদি লেখাইত। কিন্তু ওসব দলিলে সুদের কথা থাকে। বলিয়া তিনি পরে দলিল তমসুক লেখা ছাড়িয়া দেন।
