তাঁর আরবি-ফারসি লেখা এমনকি বাংলা লেখাও ছিল দেখিবার মত। এমন লেখা আনেক কাগজপত্র, ফর্দ ও সিলাই করা জুজ-গাঁথা অনেক খাতা আমরা ছেলেবেলা চাচাজীর কিতাবের বস্তানি ও বাক্সে অনেক দেখিয়াছি। সেগুলি ছিল আরবি-ফারসি-উর্দু ও বাংলা বর্ণমালা, বয়েত-কবিতা অথবা অনেক গদ্য বাক্য। ওসবই তিনি লিখিয়াছিলেন বহু আগে। কিন্তু তখনও সেগুলি ছিল ঝলমলা চকচকা। তৎকালে আজকালের মত বুব্ল্যাকের বোতল বা বড়ি পাওয়া যাইত না। পড়ুয়ারার নিজের হাতে ‘ছিয়াই’ বা কালি বানাইয়া লইতে হইত। চাচাজীরে নিজ হাতে ‘ছিয়াই’ বানাইতে আমরা দেখিয়াছি। নিজেরাও চেষ্টা করিয়াছি। চাউল পুড়া-ভাজার গুড়া, ডেকচি-পাতিলের চুলার কালি ইত্যাদি একসাথে পিষিয়া লাউ-কুমড়ার পাতার রসের সঙ্গে মিশাইয়া এই কালি তৈয়ার করা হইত।
.
২. ইয়াকুব মুনশীর নিকট
চাচাজীর এই সব গুণ ছিল বলিয়াই বোধ হয় তার মক্তবে পড়া ও লেখা দুইটাই ছিল। তবে লেখাটা বাধ্যতামূলক ছিল না। চাচাজীর মাদ্রাসার ছাত্ররাও ছিল যেমন অনিয়মিত, স্বয়ং চাচাজীও ছিলেন তেমনি অনিয়মিত। তিনি আত্মীয় বাড়িতে বা শহরে বেড়াইতে গেলে তিনি না ফিরা পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ থাকিত। তাতে অনেক সময় একনাগাড়ে দুই-তিন দিন পড়াশোনা হইত না। পড়াশোনায় আমার যেহান ভাল এ কথা সবাই বলিতেন। স্বয়ং চাচাজী। ত বলিতেনই। আমাদের বাড়িতে আগন্তুক আলেম-ফাযেলও সকলেই এক বাক্যে–ই বলিতেন। বোধ হয়, এতেই উৎসাহিত হইয়া দাদাজী চাচাজীর মাদ্রাসায় একজন বেতন করা মৌলবী রাখিবার ব্যবস্থা করিলেন। মুনশী ইয়াকুব আলী সুধারামী নামে একজন নোয়াখালীর মৌলবী সাহেব এই সময় আমাদের বাড়ির মাদ্রাসার শিক্ষক নিযুক্ত হন। আজকাল যেমন সবাইকে যাহা তাহা মৌলবী-মওলানা বলা হয়, তৎকালে তা হইত না। আরবি-ফারসিতে সর্বোচ্চ শিক্ষা লাভ করিয়া সনদ না পাইলে কাউকে মৌলবী বলা হইত না। তৎকালে আরবি-ফারসিতে এমন সব পণ্ডিত লোককে মুনশী বলা হইত, যাদের সমান জ্ঞান আজকাল অনেক তথাকথিত মওলানারও দেখা যায় না। এই কারণে মৌলবী ইয়াকুব আলী সুধারামী আমাদের অঞ্চলে ইয়াকুব মুনশী নামেই পরিচিত ছিলেন। উভয়েই মুনশী হইলেও সুধারামী সাহেব চাচাজীর চেয়ে সকল দিকেই লায়েক ছিলেন। তার মাহিনা নির্ধারিত হইল পাঁচ টাকা। এই পাঁচ টাকা বাড়াইয়া কোনো দিন ছয় টাকা করা হয় নাই। কিন্তু মৌলবী সাহেব ঐ বেতনেই তিন বছরকাল আমাদের মাদ্রাসায় পড়াইয়াছিলেন। কারণ তার মাসিক আয় ঐ পাঁচ টাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক বেশি ছিল। আমার এক নানা মুনশী ওয়ালি মাহমুদ মির্যা আমাদের বাড়ির মসজিদের স্থায়ী ইমাম ও সারা গায়ের মোল্লা ছিলেন। আঞ্চলিক মোল্লার কাজ ছিল বিয়া পড়ানো, সদকা-আকিকা-কোরবানির গরু-খাসি যবেহ করা, মউতার জানাযা পড়া এবং খতম পড়া। জানাযার মোল্লাকি ছাড়া সদকা-আকিকা-কোরবানির গরু-খাসির চামড়া মোল্লার প্রাপ্য ছিল। এতে মোল্লাজির বার্ষিক আয় খুব মোটা রকমের ছিল। আমার নানা মির্যা সাহেব অতিবৃদ্ধ হওয়ায় এক ইমামতি ছাড়া তার আর সব কাজ ও তাদের পাওনা মৌ. ইয়াকুব আলীর অনুকূলে ছাড়িয়া দেন। তাতে মৌলবী সাহেব যথেষ্ট রোযগার করিয়া মাসে মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাইতে পারিতেন। একাদিক্রমে তিন বছর আমাদের বাড়িতে শিক্ষকতা করিয়া অবশেষে তিনি দেশে চলিয়া যান। শিক্ষকতা ছাড়িয়া দিলেও যত দিন তিনি বাঁচিয়াছিলেন, তত দিন প্রতিবছর রমযান মাসে তিনি আমাদের বাড়ি আসিতেন এবং মাসাবধি থাকিয়া গ্রামময় দাওয়াত খাইয়া বেশ টাকা পয়সা লইয়া দেশে ফিরিতেন। ফলত, এ গ্রামের শিক্ষিত লোকেরা প্রায় সকলেই সুধারামী মুনশী সাহেবের ছাত্র ছিলেন। কাজেই আমাদের গ্রামে তাঁর কদর ও দাওয়াতের কোনো অভাব ছিল না।
‘সুধারামী মুনশী’ সাহেব আমাদের মক্তবের ভার নেওয়ার পর সেখানে নিয়মমত হাজিরা বই করা হইল। দহম, নহম হাতম, হাতম এই চারিটি শ্রেণীর ছাত্রদের আলাদা করিয়া বসানো হইল। সুধারামী উপরের দুই ক্লাস এবং চাচাজী নিচের দুই ক্লাস পড়াইতেন। আমরা কাজেই উপরের শ্রেণীর ছাত্র হইলাম। সুধারামী সাহেব যত দিন আমাদেরে আরবি-ফারসি পড়াইয়াছেন, তত দিন চাচাজীর নিকট আর পড়ি নাই। কিন্তু ঐ সময় রাত্রে চাচাজীর কাছে বাংলা পড়িতাম। তিনি বর্ণ বানান শিক্ষানামক একখানি চটি বই আমাদের জন্য কিনিয়াছিলেন। চাচাজী মাদ্রাসার জমাতে চাহারম পড়ার পর উচ্চ প্রাইমারি পাশ করিয়াছিলেন। ছেলেবেলা তার বাক্সে পি ঘোষের পাটিগণিত, গোরীশংকরের বীজগণিত মলাটছেঁড়া ত্রিকোণমিতি বই দেখিয়াছি। পরে আমরা স্কুলে ইংরাজি পড়াশোনা শুরু করিলে চাচাজী নিজে রাজভাষা নামে একখানি বাংলা বই কিনিয়া কিছু কিছু ইংরাজি শিখাইয়াছিলেন। বাংলা ভাষার মাধ্যমে ইংরাজি শিক্ষার জন্য তৎকালে ইহা নামকরা পুস্তক ছিল।
সুধারামী সাহেবের পরে পরপর দুইজন মৌলবী আমাদের বাড়ির মাদ্রাসায় মুদাররেসি করিয়াছিলেন। কিন্তু এঁদের দুইজনের একজনও আমাদের বাড়িতে থাকিতেন না। এঁদের প্রথমজন ছিলেন মৌলবী মমতাযুদ্দিন। তিনি থাকিতেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন সাহেবদের বাড়িতে। ভোরের বেলা তিনি শামসুদ্দিন, তাঁর ভাই সদরুদ্দিন ও পাড়ার সমস্ত তালেবিলিমসহ দল বাঁধিয়া আসিতেন এবং ছাত্রদের দশটার সময় পাঠশালায় পড়িতে যাওয়ার সুবিধার জন্য যথাসময়ে মাদ্রাসা ছুটি দিয়া দল-বলে চলিয়া যাইতেন। ইতিমধ্যে ধানীখোলা জমিদার কাছারিতে যে একটি পাঠশালা স্থাপিত হইয়াছিল, সে কথা একটু পরেই বলিতেছি।
